একসময় ধারণা করা হতো, নিঃসঙ্গতা বৃদ্ধ বয়সের সমস্যা। পেশাগত বা গৃহস্থালি কাজ থেকে অবসর নেয়ার পর বৃদ্ধ বয়সে মানুষ নিঃসঙ্গতায় ভোগে। এবং অনেক সমাজে একটা বয়সের পরে বয়স্করা নিজের পরিবার থেকে দূরে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতেন। তারা ধ্যান মোরাকাবা বা ধর্মকর্ম বা ধর্মীয় আচার-এর মধ্যে ডুবে যেতেন। এবং এর মধ্যেই তারা জীবনের একটা অন্য অর্থ, একটা আনন্দ খুঁজে পেতেন। কারণ নির্জন বাস করলেও তারা আপনজনের মায়া-মমতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। আসলে সেই অর্থে একা থাকলেও তারা নিঃসঙ্গ ছিলেন না।
কিন্তু এখন পরিবারের মাঝে থেকেও কিশোর-কিশোরী, যুবা, মাঝবয়সী এরা নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। একাকিত্বে ভোগেন। হতাশায় ভোগেন। কারণ কী? কারণ গত কয়েক দশকে পৃথিবীজুড়ে সমাজ ও অর্থনীতির এক আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। সমাজ ও পরিবারের বুননটাও বদলে গেছে। সোশাল মিডিয়া স্মার্টফোন ইন্টারনেট এগুলো দিয়ে একে অপরের সাথে কানেক্টেড থাকার যে প্রয়াসের কথা বেনিয়ারা বলছেন! আসলে তা মানুষকে অন্তরের কানেকশন দিতে পারছে না। কারণ আগের যে-কোনো কালের চেয়ে এখন মানুষ নিঃসঙ্গ বোধ করে সবচেয়ে বেশি। এবং এরও কারণ হচ্ছে বায়বীয় সংযোগ।
এই বায়বীয় সংযোগ কখনো মমতার স্পর্শ দিতে পারে না। প্রিয়জনের একটু স্পর্শ, হাতের একটু স্পর্শ, আঙুলের একটু স্পর্শ, মায়ের আদরের একটু স্পর্শ, বাবার আদরের একটু স্পর্শ যা মুহূর্তে একটা কানেকশন সৃষ্টি করে, একটা সংযোগ সৃষ্টি করে, একটা তরঙ্গের সৃষ্টি করে। তা বায়বীয় মাধ্যম কখনোই পারে না। যে কারণে একাকিত্বকে নিঃসঙ্গতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, আধুনিক মহামারি।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা সার্জন জেনারেল ডক্টর বিবেকমূর্তি হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ পত্রিকায় বিষয়টি নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি গভীর দুঃখের সাথে বলেন যে, একাকিত্ব ও দুর্বল সামাজিক যোগাযোগ মানুষের আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে। দিনে ১৫টি সিগারেট খেলে যে পরিমাণ আয়ু কমে, একাকিত্ব এবং দুর্বল সামাজিক যোগাযোগ সেই পরিমাণ আয়ু কমায়। স্থূলতা যতটা আয়ু কমায় একাকিত্ব ও দুর্বল সামাজিক যোগাযোগ তার চেয়ে বেশি আয়ু কমিয়ে দেয়।
আসলে আমরা যদি আমাদের বিবর্তনের ইতিহাস দেখি তাহলে আমরা দেখব, আমাদের মমতা এবং অন্যের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতা, সহযোগিতা করার ক্ষমতাই আমাদের খাবারের সরবরাহ এবং অতিকায় প্রাণী থেকে আমাদের সুরক্ষা দিয়েছে। এবং হাজার হাজার বছর ধরে এই সামাজিক যোগাযোগের যে গুরুত্ব, এটা আমাদের নার্ভাস সিস্টেমে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। তাই যখন এই সামাজিক যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়, তখন এই সামাজিক যোগাযোগের অনুপস্থিতি আমাদের দেহমনে একটা স্ট্রেস, চাপ সৃষ্টি করে। এবং এই স্ট্রেস, এই চাপ, আমাদের স্ট্রেস-হরমোন কর্টিসলের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। এবং শরীরে এক ধরনের প্রদাহ সৃষ্টি করে যা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, গিঁটে গিঁটে ব্যথা, ডিমেনশিয়া, ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন, স্থূলতা এবং অকাল মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আর কর্মস্থলে একাকিত্ব কমিয়ে দেয় সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা। এখন কী করতে হবে?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এক নম্বর করণীয় হচ্ছে, বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো। ২০১৭ সালে আমেরিকান জার্নাল অব এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, ফেসবুকে যত সময় কাটাবে মানসিক প্রশান্তি তত কমবে। দু-নম্বর করণীয় হচ্ছে, পরিচিত ও অপরিচিত নির্বিশেষে সালাম দিন। একাকিত্বের প্রতিষেধক হিসেবে কথাটি শুনে আপনি মুচকি হাসতে পারেন। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, একাকিত্ব মহামারি থেকে নাগরিকদের বাঁচাতে ধনী দেশগুলো অভিনব সব পদক্ষেপ নিচ্ছে। কোটি কোটি ডলার খরচ করছে। ইংল্যান্ড মিনিস্টার ফর লোনলিনেস নিয়োগ করেছে। মার্কিন সেনাবাহিনী ফিজিক্যাল ফিটনেসের পাশাপাশি সৈনিকদের সোশাল ফিটনেস বাড়াতে ওয়ার্কশপ করাচ্ছে। আমেরিকায় একটি মিডিয়া ক্যাম্পেইন সম্প্রতি জনপ্রিয় হয়েছে। মিডিয়া ক্যাম্পেইনটি হচ্ছে Just say Hello! কী সেটা? বন্ধু-অপরিচিত যার সাথেই দেখা হয় তাকে হ্যালো বলো।
অথচ এখন থেকে ১৪০০ বছর আগে নবীজী (স) বলে গেছেন, সর্বত্র সালামের প্রচলন করো। অর্থাৎ প্রথম সুযোগেই আগে সালাম দাও। তোমরা লাভ করবে শান্তি ও নিরাপত্তা। এটি হাদীস শরীফ বাংলা মর্মবাণীর ১৬০ নম্বর হাদীস। হাদীস শরীফ বাংলা মর্মবাণীর ১৬৫ নম্বর হাদীস হচ্ছে, ইসলামে সর্বোত্তম কাজ হচ্ছে, পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সবাইকে আগে সালাম দেয়া, আসসালামু আলাইকুম বলা অর্থাৎ আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, এই কথাটি বলা এবং অভুক্ত মানুষকে খাওয়ানো। আমরা ‘জাস্ট সে হ্যালো’ শব্দটির মাঝে নবীজীর এ হাদীসের শিক্ষারই ধ্বনি এবং প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। অর্থাৎ সালাম দেয়ার ক্ষেত্রে যত আপনি অগ্রগামী হবেন, যত আগে সালাম দেবেন, সামাজিক পেশি, সামাজিক শক্তি, সোশাল ফিটনেস তত আপনার বাড়বে।
আজকে আমরা সাদাকায়নে এসে অন্তত একবার হলেও কাউকে সালাম দিয়েছি বা কেউ আমাদেরকে সালাম দিয়েছেন। আজকের দিনের জন্যে, মাসের প্রতিটি শুক্রবারের জন্যে আমাদের তাহলে সবচেয়ে ভালো একটি কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ করে দিয়েছে সাদাকায়ন। এজন্যেই আমরা বলছি, সাদাকায়ন হোক আমাদের সংস্কৃতির অংশ। একটা সময় আর ‘হোক’ বলতে হবে না, ইনশাআল্লাহ, সংস্কৃতি হয়ে যাবে। তাই আজ শুক্রবার দিনটিতে এখানে সাদাকায়নে সমবেত হয়ে আমরা সবাই বলতে পারি যে, আমরা আজ সর্বোত্তম যে কাজটি করতে পারতাম, তা-ই করেছি সাদাকায়নে এসে। সাদাকায়ন শেষে আবার আমরা যার যার কর্মক্ষেত্রে, ওয়ার্ক স্টেশনে ফিরে যাব। সেখানেও আমাদের কাজ আছে নিঃসন্দেহে। কারণ আমাদের জীবনটা সময় ও কাজের যোগফল। সময়মতো যেন কাজগুলো করতে পারি সেজন্যেই আমাদের প্রত্যয়ন-আমি আজ যা করতে পারি তা আজই করব।
‘আজ’ মানে হচ্ছে বর্তমান। এর ইংরেজি হচ্ছে প্রেজেন্ট। প্রেজেন্টের আরেকটি অর্থ উপহার। বলা হয়-অতীত একটা ইতিহাস, ভবিষ্যৎ একটা রহস্য আর বর্তমান হলো সৃষ্টিকর্তার দেয়া উপহার। কত দামি উপহার জানেন? এর মূল্য ৮৬,৪০০ ইউনিট (২৪ ঘণ্টাকে ৬০ মিনিট ও ৬০ সেকেন্ড দিয়ে পূরণ করার ফলাফল)। প্রতিটি নতুন দিন এই মূল্যমানের উপহার আমাদের জন্যে নিয়ে আসে। এই উপহারের মর্যাদা তখনই দেয়া সম্ভব যখন আমরা শুধু বর্তমানকেই নিয়ে ভাবব। কারণ, আজকে যা বর্তমান, কালকে তা অতীত। আর বর্তমানে যে কাজ করব, তার ফলাফল নিয়েই ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে। আমরা যেহেতু বর্তমানে বাস করি, তাই বর্তমানের প্রতিটি কাজ সবচেয়ে ভালোভাবে করলেই তা খুব সম্ভব।
এজন্যে প্রথম পদক্ষেপ হলো-বর্তমানে নিজের কাজগুলো গুছিয়ে আনা। একটা তালিকা করা। এই হচ্ছে একটা নতুন দিন আর এগুলো হচ্ছে আমার কাজ। এখান থেকে কিছু কাজ আজকে করতে হবে। কিছু কাজ আগামীকাল করলে হবে। কিছু কাজ আগামী পরশু করলেই হবে। এখন আজকে যে কাজ তা যদি আজকে করি, তাহলে আগামীকাল কাজের চাপ কমবে। না করলে তো কাজের কাজা আদায় করতে হবে। কাজের লাইন বড় হবে। সময়ের ফিতা তো লম্বা হবে না। ২৪ ঘণ্টা = একদিন। এজন্যেই বুদ্ধিমান মানুষ আজ যা যা করতে পারেন, তা আজ তো করেনই। সেইসাথে আগামীকালের কাজ কিছুটা এগিয়ে রাখেন। আমাদের মায়েদের ক্ষেত্রেই দেখবেন যে, ঈদের আগের দিন সমস্ত মশলা গুড়া করে ফ্রিজে রাখেন, যাতে ঈদের দিন সকালে রান্নার কাজটা সহজ হয়। যে শিক্ষার্থী ক্লাসে প্রথম হয়, সে বছরের শুরুর দিন থেকে, প্রথম ক্লাস থেকেই প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করার চেষ্টা করেন বলেই পরীক্ষার আগে পড়ার পাহাড়ের নিচে চাপা পড়েন না। আর সময় যেহেতু প্রভুর নেয়ামত, উপহার, একে যদি ভালো কাজ দিয়ে বরাদ্দ করি, তাহলে সময়ের মহিমা আমাদের জীবনেই সত্য হয়ে ধরা দেবে।
আসলে জীবনে ছোট-বড় সবক্ষেত্রেই কাজের ফিলোসফি হওয়া উচিত এটি যে, যদি কাজটি আজকে করা সম্ভব হয়, তাহলে আজকেই করুন। আগামীকাল আসবে কিনা কে বলতে পারি! তবে দয়া করে সেই মাস্তিতে ভেসে যেন না যাই, ঐ যে একটা সিনেমার গান আছে না, দুনিয়াটা মস্ত বড়, খাও-দাও, ফূর্তি করো, আগামীকাল আসবে কিনা বলতে পারো! খাওয়া চলে যাবে পরদিন টয়লেটে, দাওয়া যত হবে ক্লান্তি বাড়তে থাকবে তত। কারণ কথায় বলে-আহার নিদ্রা ভয়, যত করে তত হয়। যত আরাম তত ব্যারাম। আর ফূর্তি করতে থাকলে একটা সময় সব ফুরিয়ে যাবে। আমাদের অবস্থান হতে হবে-এসেছি দুনিয়ায়, একে দেখব, জয় করব। কেন? যাতে মরিলে আমি কাঁদে ভুবন। কাঁদে মানেটা কী? যারা বেঁচে থাকবেন, তাদের চোখ ভিজে যাবে আমার অনুপস্থিতির জন্যে। তারা আমাকে মিস করবেন। আমার উপস্থিতিকে মিস করবেন। আমার মিষ্টি কথাকে মিস করবেন। আমার কল্যাণ চিন্তাকে মিস করবেন। আমার আন্তরিক সেবাকে মিস করবেন। আর বলতে থাকবেন-মানুষটা বড় ভালো ছিল!
তাই প্রতিটি দিন শুরুর সময়েই ভাবুন-আজ আমি কী কী করতে পারি। যেমন-আজ ভোরে আমি উঠতে পারি। উঠে শোকর আলহামদুলিল্লাহ/ প্রভু তোমাকে ধন্যবাদ বলতে পারি। ভোরের হাওয়া যেহেতু লাখ টাকার দাওয়া। বুকভরে দম নিয়ে-দম ছেড়ে নতুন প্রাণশক্তি লাভ করতে পারি। প্রার্থনা করতে পারি। তারপর খানিকক্ষণ কোয়ান্টাম ইয়োগা করে হাঁটতে পারি। কুসুম গরম পানিতে লেবুর রস দিয়ে ডিটক্স ওয়াটার বানিয়ে পান করতে পারি। তারপর কাজ শুরু হোক ধ্যানে-এই ফিলোসফি নিয়ে ভোরের মেডিটেশন করতে পারি। তারপর নাশতার আগে দান করতে পারি। এতে কী হবে? বঞ্চিতের জন্যে আজ আমার তরফ থেকে সামান্য কিছু করার চেষ্টা তো থাকবে। আর নবীজী (স) তো বলেছেন যে, প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন। একজন (সকালে যে দান করেছে এমন) দাতার জন্যে প্রার্থনা করেন : ‘হে আল্লাহ! দাতাকে সর্বোত্তম পুরস্কার দান করো।’ আর অন্যজন (দান করা থেকে বিরত কৃপণের জন্যে) প্রার্থনা করে : ‘হে আল্লাহ! কৃপণের ধন বিনষ্ট করো।’—আবু হুরায়রা (রা); বোখারী, মুসলিম। তার মানে আমরা দেখছি যে, প্রতিদিনের দানের গুরুত্ব কতখানি!
এখন অনেকে বলতে পারেন, সবই তো জানি, সময়ের এক ফোঁড়, আর অসময়ের দশ ফোঁড়। মানে ছেঁড়া কাপড় সময়মতো সেলাই করলে এক ফোঁড় দিলেই হতো। দেরি করে সেলাই করতে করতে সেটা এখন অনেক বেশি ছিঁড়ে গেছে। পরে দিতে হচ্ছে দশ ফোঁড়। আবার বলতে পারেন, সবই তো বুঝি, কেন কাজ করতে হবে, কেনই বা সময়মতো কাজ করতে হবে। কিন্তু যে কারণে পারি না, তা হলো আলসেমি আর দীর্ঘসূত্রিতা। করব করব করে জমিয়ে ফেলেছি এমন কত কাজ যে আছে। আর আলস্য আমাদের জীবনকে বঞ্চিত করছে। এই আলস্য হচ্ছে শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সময়ানুবর্তী হয়ে সুপরিকল্পিতভাবে সুনির্দিষ্ট কল্যাণকর ফলপ্রসূ কাজ না করার নামই আলস্য।
যে জাতি এই আলস্য ভোগ বিলাসের মাঝে ডুবে গেছে সে জাতি পতিত হয়েছে। একটা জাতির উত্থান হয় কর্মের মধ্য দিয়ে, পতন হয় আলস্যের মধ্য দিয়ে। আপনারা দেখুন, রোমানরা একটা সময় তদানীন্তন সমস্ত ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত। রোম যখন পুড়ছিল, নীরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। রোমকে রক্ষা করার জন্যে যে প্রস্তুতি দরকার সে প্রস্তুতি তার ছিল না কারণ তার আলস্য ও বিকৃত বিলাসিতা। ঠিক আছে, পুড়ছে, পুড়ুক। দেখা যাক তারপরে কী হয়! দুই আলস্যের গল্পও আছে। একজনের পিঠে আগুন লেগেছে, পিঠ পুড়ছে। সে পিঠ পোড়ে না বলে সংক্ষেপে ‘পি পো’ বলল। আরেকজন এত অলস যে, পালাতে যে বলবে তা বলল না, কারণ পালাতে হলে তো দৌড়াতে হবে। সে বলল ‘ঘু শো’ মানে ঘুরে শোও। তবুও উঠবে না। এত অলস!
এই যে আলসেমি ও দীর্ঘসূত্রিতা-এই দুটো কারণের নেপথ্যে আছে আরেকটি মহাকারণ। তা হলো-একঘেয়েমি। প্রতিদিন একই কাজ যদি করতে হয়, তাহলে তা করতে করতে করতে করতে আর ভাল্লাগে না! এই ভাল্লাগে না নিয়ে গুরু-শিষ্যের একটি গল্প আছে।
গল্পটি এরকম-এক শিষ্য গুরুর কাছে বললেন, এই ভাত খাওয়া, গোসল করা, কাপড় পরা, সংসার করা, প্রার্থনা করা-এই একঘেয়েমি থেকে মুক্তি চাই। গুরু বললেন, ভাত খাও, গোসল কর, কাপড় পর, সংসার কর, প্রার্থনা কর।
কিছুদিন পর শিষ্য আবার আর্তি জানালেন। গুরুরও সেই একই জবাব। একই নির্দেশ।
গুরুবাণীর মর্মার্থ উপলব্ধি করতে শিষ্যের লেগেছিল একযুগ। একযুগ পরে তিনি বুঝেছিলেন, যান্ত্রিকতার স্বয়ংচালিত ক্রিয়ার মতো কাজ করে যাওয়ার ফলেই প্রাত্যহিক কাজে একঘেয়েমি চলে আসে। বেশিরভাগ সময়ই মন অতীতে বা ভবিষ্যতে বিচরণ করে বলেই আমরা বর্তমানকে পুরোপুরি উপভোগ করতে ব্যর্থ হই। বর্তমান হয়ে ওঠে একঘেয়ে। দিনের প্রতিটি কাজের সাথে চিত্তকে একাত্ম করতে পারলে, প্রতিটি কাজের মাঝে আত্মনিমগ্ন হতে পারলে, মনোযোগ নিবদ্ধ করতে পারলেই যান্ত্রিকতার একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। প্রতিটি কাজই হয়ে ওঠে আনন্দের উৎস। তখন প্রতিদিনের প্রতি লোকমা আহার, প্রতিবারের গোসল, প্রত্যেক কাপড়, স্ত্রীর সাথে আলাপন, দৈনন্দিন কর্তব্য ও দায়িত্ব-অর্থাৎ প্রতিটি কাজই মনে হবে এ এক নতুন জগৎ, এ এক নতুন জীবন, এ এক নতুন আনন্দলোক। তখন প্রতিবারের প্রার্থনাতেই আপনি পুলকিত হবেন, চমকিত হবেন, স্রষ্টাকে উপলব্ধি করবেন নিত্য নব মহিমায়। প্রতিটি চাওয়া পরিণত হবে পাওয়ায়। প্রতিটি সেজদা পরিণত হবে মেরাজে।
দৈনন্দিন কাজের একঘেয়েমিকে নতুন আনন্দলোকে রূপান্তরিত করার পথও মেডিটেশন। কারণ মেডিটেশন আমাদের মনকে বর্তমানে নিয়ে আসে। মেডিটেশন অতীতের ব্যর্থতার গ্লানি আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা থেকে মনকে মুক্ত করে। বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্তে সংযোজন করে নব নব মহিমা। প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি বিষয়ের অন্তর্লোকে মনকে প্রবেশ করায়। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ সচরাচর বিষয়কেও নতুন পর্যবেক্ষণী আলোয় নতুন বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর করে তোলে। মেডিটেশন আমাদেরকে আত্মনিমগ্ন করে।
আর কোয়ান্টাম মেথড আসলে এই মেডিটেশন করারই সবচেয়ে সহজ প্রক্রিয়া। আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে সহজতম পদ্ধতিতে মেডিটেশন উদ্ভাবন করার সুযোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের একজন বাঙালিকে। মেডিটেশনের পয়েন্ট হচ্ছে তিনটা। এক হচ্ছে, দেহের স্নায়ু-পেশি শিথিল করা। শিথিল করা মানে স্থির করা, ধীর করা। দুই হচ্ছে, অস্থির মনকে স্থির করা। মনে যত রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা, নেতিবাচক আবেগ যেটা আপনাকে আসলে ভুল করতে বাধ্য করে। যেমন, রেগে গিয়ে আপনি যে কাজটা করেন সেটার জন্যে পরে আবার নিজে অনুশোচনা করেন। নিজে বলেন, স্যরি ভাই/ আপা/ ভাবী মাফ কইরা দিয়েন। আমি তো মানে……তার মানেটা কী? যখনই আপনি রেগে যাচ্ছেন রাগ, নেতিবাচক আবেগ যখন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলছে তখন আপনি এমন কাজ করছেন যার জন্যে আপনি পরে অনুতপ্ত হচ্ছেন।
এবং তিন হচ্ছে, মনোযোগায়ন। আমাদের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত থাকে। এই বিক্ষিপ্ত মনোযোগকে এক জায়গায় স্থির করার নাম হচ্ছে মনোযোগায়ন। আজকে সারা পৃথিবী মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। মনোযোগ নাই; নিজের প্রতিও না, মানুষের প্রতিও না, ভালো জিনিসের প্রতিও না। কোনোকিছুর প্রতিই মনোযোগ নাই। যে কারণে পাশ্চাত্যে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করছে ধ্যানের একটি পদ্ধতি যেটাকে বলা হয় মাইন্ডফুলনেস। তারা বলছে যে, এটা একটা বিপ্লব। আর আমরা বলি যে, আমরা আড়াই হাজার বছর আগে এই বিপ্লব করে ফেলেছি। ধ্যানের ক্ষেত্রে তারা আমাদের চেয়ে আড়াই হাজার বছর পেছনে এখনো পড়ে আছ। কারণ আমাদের যে পদ্ধতি, এই পদ্ধতির চেয়ে ভালো কোনো পদ্ধতি তারা এখনো দিতে পারে নি।
এবং যখনই এই তিনটা হলো-স্নায়ু-পেশি শিথিল হলো, মনটা স্থির হলো, মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলো এক বিন্দুতে, তখনই আপনি মস্তিষ্ককে বেশি পরিমাণে ব্যবহার করতে পারবেন। যে মাথাকে ঠান্ডা রাখতে পারবে, যে-কোনো সমস্যাকে সে সম্ভাবনায় রূপান্তরিত করতে পারবে। যখনই আপনি মাথা ঠান্ডা রাখবেন, আপনার জীবনে যত সমস্যা আসুক এই সমস্যাটাকে আপনি নতুন সম্ভাবনায় রূপান্তরিত করতে পারবেন। জীবনকে উদযাপন করতে পারবেন। জীবন হবে আনন্দময়, সুখময়, শান্তিময়।
আর সবসময়ই অটোসাজেশন দিতে হবে-‘সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন কর্মব্যস্ত সুখী জীবন’। এবং মনছবি দেখতে হবে যে, আমি খুব দ্রুত, খুব সুন্দরভাবে, সময় অনুসারে কাজ করছি। আর প্রতিদিন সকালে মেডিটেশনে গিয়ে সারাদিনের কী কী কাজ আপনি করবেন, কীভাবে করবেন, কতটা সময় নিয়ে করবেন এটাকে ভিজুয়ালাইজ করুন, মনছবি তৈরি করুন। দেখবেন কাজের গতি বেড়ে গেছে। ভেতর থেকে একটা তাড়না আসবে। কারণ ব্রেনে প্রোগ্রাম ফিক্সড করে দিলে ব্রেন কাজ করে।
রাতে আবার মেডিটেশনে গিয়ে দেখতে হবে যে, কাজটা আমি সঠিক সময়ের মধ্যে কি করেছিলাম? যদি করে থাকেন নিজেকে ধন্যবাদ দিন। কল্পনায় মনের বাড়িতে আম জাম ফলমূল যা কিছু আছে খান। অর্থাৎ মন, তুই আমার কাজটা ঠিকমতো করে দিয়েছিস, এজন্যে এই পুরস্কার। আর যদি দেখা যায় যে, কাজ হয় নি বা ছোটখাটো অল্প কিছু হয়েছে। আচ্ছা ঠিক আছে আজকে মাফ করে দিলাম। কালকে করিস ঠিকমতো। তা না হলে নিজেকে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। উত্তম শাস্তি হচ্ছে মাটির ব্যাংকে দান। কারণ আলস্যকে দেখা যায় না। কিন্তু একবার যদি আপনি ডোবেন আপনি ক্রমশ নিচের দিকে নামতে থাকবেন। অলস মানুষ, দীর্ঘসূত্রী মানুষ, একঘেয়েমিতে আক্রান্ত মানুষ কখনো বড় কাজ করতে পারে না।
সবার জীবন, সবার প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত হোক শান্তি, সুখ আর আনন্দে ভরপুর-এই প্রার্থনা করছি। এটা তখনই হবে যখন আমরা কাজে নামব, কাজে ডুবে যাব। তখনই প্রতিটি দিনের প্রতিটি কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে। তাই যেন হয়-আবারো প্রার্থনা করছি।
