অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের একজন কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ এর মৃত্যুদিন
গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে আজ বছরের ১৭৯তম (অধিবর্ষে ১৮০তম) দিন। এক নজরে দেখে নিই ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা, বিশিষ্টজনের জন্ম ও মৃত্যুদিনসহ আরও কিছু তথ্যাবলি।
১৬৫৭ : দারা শিকোহ অনূদিত ‘শিক-ই আকবর’ প্রকাশিত হয়।
১৮২০ : প্রমাণিত হয় যে টমেটো বিষাক্ত নয়।
১৯৭২ : বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় রোমানিয়া।
১৯৭৮ : পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের দেহভস্ম ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধবিহারে সংরক্ষণ করা হয়।
১৬৫৩ : মুহাম্মদ আজম শাহ, মোগল সম্রাট।
১৭১২ : জঁ-জাক রুসো, সুইজারল্যান্ডীয় দার্শনিক।
১৮৬৭ : লুইজি পিরান্ডেলো, তিনি ছিলেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইতালিয়ান লেখক, কবি ও নাট্যকার।
১৮৯৪ : গোকুলচন্দ্র নাগ, প্রখ্যাত ‘কল্লোল’ পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সহকারী সম্পাদক।
১৯০৬ : মারিয়া গ্যোপের্ট-মায়ার, তিনি ছিলেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী।
১৯৭১ : ইলন মাস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকান প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি খাতে উদ্যোক্তা।
১৮৩৬ : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ রাষ্ট্রপতি জেমস ম্যাডিসন।
১৯৩৬ : আমেরিকান লেখক ও সমাজকর্মী আলেকজান্ডার বেরকমান।
১৯৭২ : ভারতীয় বিজ্ঞানী, পরিসংখ্যানবিদ এবং ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ।
১৯৮১ : কানাডিয়ান ক্রীড়াবিদ, মানবহিতৈষী এবং ক্যান্সার গবেষাণাকর্মী টেরি ফক্স।
১৯৮৬ : অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের একজন কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ ছিলেন অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের একজন কৃষক নেতা; যিনি ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তেভাগা আন্দলোনের ‘জনক’ হিসেবে তাকে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা। তিনি পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তার নামে প্রতিষ্ঠিত দিনাজপুরের কৃষি কলেজ ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এ উন্নীত হয়।
জন্মগ্রহণ করেন দিনাজপুর জেলার সুলতানপুর গ্রামে ১৯০০ সালে। নিজ গ্রামে শৈশবে লেখাপড়ার হাতেখড়ি হলেও সেতাবগঞ্জ থেকে প্রবেশিকা, রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এ এবং বি.এ পাস করেন। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩১ সালে ইতিহাসে এম.এ এবং ১৯৩২ সালে বি.এল ডিগ্রি লাভ করে হাজী দানেশ দিনাজপুরে আইনব্যবসা শুরু করেন।
কৃষক, বর্গা চাষি, ভাগ চাষি, ক্রান্তি চাষিদের ওপর জমিদার ও জোতদারের সীমাহীন অত্যাচার দেখে শিশু বয়সেই মোহাম্মদ দানেশের মানসিক চিন্তায় বিপ্লব ঘটে। তিনি ছাত্র জীবনেই কৃষকের ওপর অত্যাচারের প্রতিকার কল্পে কৃষক আন্দোলনে আকৃষ্ট হন। হাজী দানেশ ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির অঙ্গসংগঠন কৃষক সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করেন। তার নেতৃত্বে দিনাজপুর জেলায় টোল আদায় বন্ধ ও জমিদারি উচ্ছেদের দাবিতে কৃষক আন্দোলন জোরদার হয়। আন্দোলনকালে তিনি কারাভোগও করেন। নীলফামারী জেলার ডোমারে ১৯৪২ সালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় কৃষক সম্মেলনে অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন হাজী দানেশ। তিনি দু’কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন।
হাজী দানেশ তেভাগা আন্দোলনের নেতা হিসেবেই সমধিক পরিচিত। উত্তরবঙ্গই ছিল তেভাগা আন্দোলনের সুতিকাগার। উত্তরবঙ্গে এই আন্দোলনের উদ্ভব হওয়ার কারণ ছিল উত্তরবঙ্গ বরাবর জোতদার প্রধান তথা জোতদার শাসিত এলাকা। যারা এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে আন্দোলনকে সার্থকতার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়ার মরণপণ সংগ্রাম করেন সেই নেতারা অধিকাংশই ছিলেন উত্তরবঙ্গবাসী। তাদের মধ্যে দিনাজপুরের হাজী মো. দানেশ, রিপন রায় (পার্বতীপুর থেকে), গুরুদাস তালুকদার, বরদা চক্রবর্তী, রূপনারায়ন রায়, হেলেকেতু সিং প্রমুখ বিপ্লবী নেতারা ছিলেন আন্দোলনের স্বাপ্নিক রূপকার।
তেভাগা আন্দোলনের সর্বাধিক ত্যাগী ও তেজস্বী নেতারূপে হাজী মো. দানেশের নামটি ‘প্রবাদ পুরুষে’ পরিণত হয়। বর্গাচাষিদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তিনি উত্তরবঙ্গে তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত করেন। তেভাগা আন্দোলনের প্রস্তুতি পর্বে দাবি ছিল ১। উৎপন্ন ফলের তিন ভাগের দু’ভাগ চাই। ২। জমিতে চাষির দখল স্বত্ব দিতে হবে। ৩। শতকরা সাড়ে বারো ভাগের বেশি অর্থাৎ মণকরা ধানের পাঁচ সেরের বেশি সুদ নেই। ৪। হরেক রকমের আবোয়ারসহ বাজে কোনো কর আদায় করা চলবে না। ৫। রশিদ ছাড়া কোনো আদায় নেই। ৬। আবাদযোগ্য সব পতিত জমি আবাদ করতে হবে। ৭। জোতদারের পরিবর্তে ভাগচাষিদের খোলানে ধান তুলতে হবে।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দলনে নেতৃত্বদানকারী যে ক’জন বরেণ্য ব্যক্তির নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে তাদের মধ্যে হাজী মোহাম্মদ দানেশ অন্যতম। ঠাকুরগাঁও তথা বৃহত্তর দিনাজপুরের মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে আজীবন নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তিনি। ১৯৮৬ সালের ২৮ জুন রাজধানী ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এই বিপ্লবী নেতা।
সূত্র: সংগৃহীত