প্রথমবারের মতো সরাসরি জাহাজে ইউরোপ যাচ্ছে তৈরি পোশাক

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ। মোট রপ্তানির ৬০ শতাংশই যায় সেখানকার দেশগুলোতে। এতদিন চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে এসব দেশে সরাসরি পণ্য পাঠানোর সুযোগ ছিল না। এবারই প্রথমবারের মতো সেই দুয়ার খুলেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়াল অ্যাডিমরাল এম শাহজাহান জানান, ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম জাহাজটি যাওয়ার সম্ভবনা আছে। এরইমধ্যে ট্রায়াল রান বা পরীক্ষামূলক যাত্রাও সম্পন্ন হয়েছে৷ খবর ডয়েচে ভেলের।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের উদ্দেশে প্রথম সরাসরি জাহাজটি যাবে ইটালির রাভেনা বন্দরে। সেখান থেকে ইউরোপের অন্যান্য দেশের ক্রেতারা যার যার দেশে পণ্য নিয়ে যাবেন।

ইটালিয়ান শিপিং কোম্পানি ‘কালিপসো কোম্পানিয়া দে নাভিগাৎসিওনে এসপিএ’-এর দুইটি কন্টেইনার জাহাজ, সোঙ্গা চিতা ও কেপ ফ্লোরেস বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক পরিবহণ করবে। সোঙ্গা চিতা লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী আর কেপ ফ্লোরেস মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী। বাংলাদেশে ইটালিয়ান শিপিং কোম্পানিটির এজেন্ট রিলায়েন্স শিপিং এন্ড লজিস্টিকসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাশেদ জানান, “করোনার সময় শিপিং-এর ভাড়া (ফ্রেইট) ১০ গুণেরও বেশি বেড়ে যায়। তখন ইউরোপের তৈরি পোশাক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে সরাসরি তাদের পাঠানো জাহাজে করে পণ্য নেয়ার পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সরাসরি এখন পণ্য যাওয়া শুরু হচ্ছে।”

তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে এখন ট্রান্সশিপমেনেন্টের মাধ্যমে ইউরোপে পণ্য যায়। প্রথমে ফিডার জাহাজে করে শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং বা সিংগাপুরে যায়। সেখান থেকে মূল জাহাজে করে পণ্য পাঠানো হয় ইউরোপে। তার বদলে এখন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রপ্তানি পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা করবে। খালি কন্টেইনার নিয়ে জাহাজও আসবে চট্টগ্রামে। ফলে আগের তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ সময় লাগবে। খরচও অনেক কমে যাবে।

রাশেদ জানান, গত ২৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে কেপ ফ্লোরেস জাহাজটি এক হাজার ৫০টি খালি কন্টেইনার নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। কন্টেইনারগুলো রেখে জাহাজটি চলে যায়। কন্টেইনারগুলো এরইমধ্যে তৈরি পোশাক বোঝাই করা হয়েছে। এই কন্টেইনার নিতে সোঙ্গা চিতা জাহাজ চট্টগ্রামের পথে রয়েছে। জাহাজটি ৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে এক হাজার খালি কন্টেইনার নিয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছার কথা আছে। খালি কন্টেইনারগুলো রেখে গার্মেন্টস পণ্য বোঝাই কন্টেইনারগুলো নিয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি ইটালির উদ্দেশে যাত্রা করার কথা রয়েছে সোঙ্গা চিতার। এরপর আবার আসবে কেপ ফ্লোরেস। এভাবেই মাসে দুইবার চট্টগ্রাম থেকে পণ্য যাবে ইউরোপে।

এর ফলে আগে যেখানে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে কমপক্ষে ৪০ দিন লাগত তা কমে ১৬ দিনে নেমে আসবে। আর খরচ কমবে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ। রিয়াল অ্যাডিমরাল এম শাহজাহান মনে করেন, প্রকৃত খরচ আসলে এর চেয়েও কমে আসবে।

তিন বলেন, “যত বেশি জাহাজ সরাসরি চালু করা যাবে তত খরচ কমবে। আর একটি জাহাজ কতটি কন্টেইনার পরিবহণ করতে পারে, মানে জাহাজের আকারের উপরও নির্ভর করে। জাহাজের আকার বড় হলে খরচ কমে। এখন যে দুইটি জাহাজ দিয়ে শুরু হচ্ছে তাতে এক হাজারের মতো কন্টেইনার থাকে। কিন্তু তিন-চার হাজার কন্টেইনারবাহী জাহাজও আছে। সেটা হলে খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে। আর সময় তো বাঁচবেই।”

তিনি আরো বলেন, “৬ জানুয়ারি থেকে এটা শুরু হলে ধীরে ধীরে সরাসরি ইউরোপে পণ্য নিয়ে জাহাজ যাওয়ার সংখ্যা বাড়বে। এটা তৈরি পোশাক শিল্পে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি (চট্টগ্রাম) রাকিবুল ইসলাম জানান, ইটালির তিনটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান মিলে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি জাহাজে করে তৈরি পোশাক নেয়ার এই ব্যবস্থা করেছে। তিনি বলেন, “আগে কলম্বো ও সিংগাপুরে পাঠাতেই লাগত পাঁচ থেকে সাতদিন। আমাদের এখন ইউরোপে যে কার্গোগুলো পৌঁছে তাতে ৬০ থেকে ৭০ দিন সময় লাগে। সেই জায়গায় আমরা ১৬ দিনে কার্গোগুলো পৌঁছাতে পারছি। এতে আমাদের লিড টাইমটা অনেক অনেক কমে আসবে।”

তিনি বলেন, “জাহাজ জটের কারণে ইটালির ক্রেতারা সরাসরি পণ্য নিতে চেয়েছিলো এবং তারা সফল হয়েছে। এখন ইউরোপের অন্যান্য দেশও আগ্রহী হবে। এটা আমাদের জন্য বড় সুযোগ। আমরাও চাচ্ছিলাম মাদার ভ্যাসেলে করে পোশাক পাঠাতে। আগে আমরা ফিডার ভাসেলে করে কলম্বো, সিংগাপুরে পাঠাতাম। সেখান থেকে মাদার ভ্যাসেলে পণ্য যেত। ইউরোপে আমাদের মোট রপ্তানির ৪০ ভাগ পোশাক যায়। ফলে অনেক বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেল।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *