সৎ থাকতে চাই সবসময়
মো. বখতিয়ারুল ইসলাম
ফিজিক্যাল এডুকেশন এন্ড স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
আমি শুকরিয়ার সাথে বলতে পারি কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আমি এবং আমার পরিবার বেশ ভালো আছি। আমরা পাঁচ ভাইবোন। বাবার একার উপার্জনে পুরো সংসার চলে। বাবার কৃষিকাজ দিয়ে আমাদের পড়াশোনা, ভরণপোষণের খরচ চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল ঐ সময়। কোয়ান্টাম সম্পর্কে পাড়ার লোকদের ও আত্মীয়স্বজনের নেতিবাচক কথা শোনার পরও আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাবা আমাকে কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন নবম শ্রেণিতে। যখন বাবা আমাকে ভর্তি করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছিলেন, তখন বাবাকে আমার বড়ই একা মনে হচ্ছিল।
আল্লাহর রহমতে ক্যাম্পাসে যাওয়ার একবছরের মধ্যে পরিবারের অবস্থা পাল্টে যায়। বাবার হাত ধরে যখন এখানে এসেছিলাম, তখন বাড়ির অবস্থা ছিল ভাঙা। সেই বছর যখন আমি বার্ষিক ছুটি কাটাতে বাড়িতে যাই, তখন বাড়িটি নতুন করে ইট দিয়ে তৈরি শুরু হয়েছে। মায়ের সাথে ছুটির সময়ে একদিন গল্প করতে করতে জিজ্ঞেস করি, আমাদের পরিবারে উন্নতি হয়েছে।
কারণটা কী? মা আমাকে বললেন, তুমি কোয়ান্টামে যাওয়ার পর থেকে পরিবারে প্রত্যেক কাজে বরকত হচ্ছে। সেই দিন মায়ের একথা শুনে আমার খুব ভালো লেগেছিল।
সেইবার মা আর আমি খালের পাড়ে গরুর ঘাস কাটতে যাই। ঘাস কাটতে কাটতে দেখি খালের অপর পাড়ে তিনটি বরশিতে তিনটি শোল মাছ ধরা পড়েছে। মা আমাকে বলে, কেউ নাই নিয়ে আসো। আমি বললাম, মা আরেকজনের মাছ আমি আনব কেন? এই মাছ খেলেও দিন যাবে, না খেলেও দিন যাবে। মা আমার সততা দেখে খুবই খুশি হয়েছিলেন। আসলে ঐ দিনের ঘটনাটি ছিল আমার জন্যে পরীক্ষা। সেই দিন আমি পাশ করেছিলাম। কারণ আমি সৎ থাকতে চাই সবসময়।
বাড়িতে থাকাকালে ‘ইউনিভার্সিটি’ শব্দটা শুধু দোকানে খাতা কিনতে গেলে খাতার উপরে দেখতাম। ইউনিভার্সিটিতে যে আমি পড়ব তার স্বপ্ন কোনোদিনই দেখি নি। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে আমি কোয়ান্টাম মেথড ৪৩১ তম ব্যাচে অংশ নিয়েছিলাম। কোর্সের সব কথা আমি মনে রাখতে না পারলেও একটি কথা আমাকে প্রত্যেকটি কাজে সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এই অমর কথাটি হলো—তোমার দ্বারা সব সম্ভব।
কোর্সে গিয়ে আমি মনছবি ঠিক করি যে, আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। তাই আমি রুটিন অনুসারে পড়াশোনা শুরু করি। সত্যিকার অর্থে আমার মনছবি পূরণ হয়েছে।
আমি বাড়িতে থাকতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করি। সেখানে থাকতে আমি প্রায়ই স্যারদের মার খেতাম। কারণ আমার স্কুলে আসতে প্রায়ই দেরি হতো। যদিও স্কুলে ছাত্রছাত্রী এতই বেশি ছিল যে, বসার জন্যে পর্যাপ্ত জায়গা হতো না এবং দাঁড়িয়ে ক্লাস করতে হতো। কিন্তু কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে পড়েছি বলে আমি সুন্দর একটা পরিবেশে পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং কোয়ান্টাম মেথড কোর্সের মতো জীবন গড়ার প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। বাড়িতে থাকতে আমি কখনো ভাবি নি এত ভালো পরিবেশে পড়তে পারব। ভালো ছাত্র হবো, ভালো খেলোয়াড় হবো, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব!
আমার সহশিক্ষা কার্যক্রম ছিল কাবাডি। ছোট বড় সবাই একসাথে কাবাডি খেলার মজাই ছিল আলাদা। এছাড়াও সপ্তাহে একদিন করে আমাদেরকে নির্দিষ্ট খেলার বাইরে ইচ্ছেমতো খেলার সুযোগ দিত। সেই একদিনের জন্যে আমরা সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম।
কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের যে শৃঙ্খলা বা রুটিন তা প্রত্যেক মানুষের জন্যে দরকার। ক্যাম্পাসে থাকার সময় মনে হতো, যদি স্মার্টফোন পেতাম! কিন্তু এখন বুঝতে পারি স্মার্টফোন যদি আমার হাতে থাকত তাহলে আমার দ্বারা কিছুই করা সম্ভব হতো না।
আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করার পর আমি ক্যাম্পাসে থেকেই ইউনিভার্সিটি ভর্তির প্রস্তুতি নিলাম। অ্যাডমিশনের এত অল্প সময়ের মধ্যে বাইরে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো, থাকা-খাওয়ার ব্যাপার সহজ না।
প্রস্তুতিরত অবস্থায় আমাদের যখন একেকজন একেকদিকে চান্স পেয়ে যাচ্ছিল, তখনো আমার কোথাও অ্যাডমিশন না হওয়ায় একটু আফসোস হচ্ছিল। সেই সময়ে স্যার-ম্যাডামেরা যে যেখানে আমাকে পেয়েছেন, সবাই সাহস জুগিয়েছেন। সবাই বলতেন যা হয়ে গেছে এটা নিয়ে চিন্তা করবে না। সামনে যেটা আছে ওটার জন্যে ভালোভাবে প্রস্তুতি নাও। আসলে আমার মন খারাপ হলেও আমি সাহস হারাই নি। নিয়মিত মনছবি দেখতাম যে, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বই।
আমার শেষ পরীক্ষা ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরীক্ষা দিতে গিয়ে অনেক কিছু খেয়াল করেছি। তার মধ্যে একটি হলো—যখন আমরা পরীক্ষা হলে প্রবেশ করি তখন দেখি অনেকে কথা বলছে, অনেকের আবার হাত-পা কাঁপছে কিন্তু আমি চুপ করে বসে থেকে মেডিটেশন করি, যা আমাকে পরীক্ষার হলে মাথা ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করেছিল। ২০২২ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্যাল এডুকেশন এন্ড স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগে মেধাতালিকায় ১২ তম হলাম। এর পেছনের কারণ ছিল আমার স্কুল ও কলেজের স্যার এবং স্টাফদের সহযোগিতা, আন্তরিকতা ও দোয়া।
[ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘সব সম্ভব’ বই থেকে ]
