1. [email protected] : আরএমজি বিডি নিউজ ডেস্ক :
  2. [email protected] : Emon : Armanul Islam
  3. [email protected] : musa :
মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২২, ০৭:৫৭ অপরাহ্ন

ভৈরবে দিনে তৈরি হয় ২ লাখ জোড়া পাদুকা

  • সময় বুধবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২১
  • ১৪৮ বার দেখা হয়েছে

ভৈরবে পাদুকাশিল্পের যাত্রা শুরু ১৯৮৯ সালে। এটি দেশের সবচেয়ে বড় পাদুকা প্রস্তুতকারক এলাকা, যা আশপাশে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়েছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী বাজিতপুর এবং কুলিয়ারচর উপজেলাতেও বেশ কিছু কারখানা গড়ে উঠেছে। ২৫ অক্টোবর ২০২১ ‘ভৈরবে দিনে তৈরি হয় ২ লাখ জোড়া পাদুকা’ শিরোনামে এ বিষয়ে প্রথম আলোতে লিখেছেন আরিফুর রহমান।

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের পাদুকাশিল্পের রূপান্তরটা খুব কাছ থেকেই দেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল মোল্লা। তিনি নিজেও অবশ্য নেকসাস ফুটওয়্যার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। তিনি বলেন, দুই বছর আগেও পৌর শহরের কমলপুর এলাকার সাতমুখী বিল পানির নিচে ডুবে ছিল। সেখানে এখন সারি সারি পাদুকা কারখানা। আগে হাতে তৈরি করা হতো পাদুকা। এখন মালিকেরা ধীরে ধীরে আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে পাদুকা তৈরির দিকে ঝুঁকছেন। তবে করোনা মহামারির সময়ে প্রথমবারের মতো ভৈরবের পাদুকা জাপানে রপ্তানি হওয়াটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর লেগেছে বাবুল মোল্লার কাছে।

দুই মাস আগে ফুট অ্যান্ড ফিট লেদার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো জাপানে পাদুকা রপ্তানি শুরু করেছে। ভৈরবের দুর্জয় মোড় থেকে কিশোরগঞ্জে যাওয়ার পথে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নে গড়ে তোলা হয়েছে শতভাগ রপ্তানিমুখী ফুট অ্যান্ড ফিট লেদারের কারখানা। সেখানে গিয়ে জানা গেল, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর ঠিক আগে ৬৬ শতাংশ জমির ওপর এই কারখানার নির্মাণকাজ শুরু হয়। করোনার কারণে কিছুদিন নির্মাণকাজ বন্ধ থাকলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কারখানাটি উদ্বোধন করা হয়।

ফুট অ্যান্ড ফিটের সূত্রে জানা গেছে, তারা এখন পর্যন্ত জাপানে তিন হাজার জোড়া পাদুকা রপ্তানি করেছে। মানভেদে প্রতি জোড়া পাদুকার দাম ১০ থেকে ৭০ মার্কিন ডলার। বর্তমানে কারখানাটিতে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। এতে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জোড়া পাদুকা উৎপাদিত হচ্ছে। কারখানাটির কর্মপরিবেশ চোখে পড়ার মতো।

ফুট অ্যান্ড ফিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) খলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের হাত ধরেই ভৈরব থেকে বিদেশে পাদুকা রপ্তানি শুরু। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আমাদের কাছ থেকে পাদুকা নেওয়ার জন্যে যোগাযোগ করছে। তাই আশা করি, ধীরে ধীরে আমাদের রপ্তানি বাড়বে।’

ভৈরবে পাদুকাশিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। এটি দেশের সবচেয়ে বড় পাদুকা প্রস্তুতকারক এলাকা। প্রথম কারখানা স্থাপন করা হয় ভৈরব উপজেলা পরিষদ এলাকায়। কারখানার সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন আশপাশের ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়েছে। এমনকি ভৈরব ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী বাজিতপুর আর কুলিয়ারচর উপজেলাতেও বেশ কিছু পাদুকা কারখানা গড়ে উঠেছে।

জানা গেছে, করোনা মহামারিকালেও থেমে থাকেনি ভৈরবে পাদুকাশিল্পের বিকাশ। পৌর শহরের কমলপুর এলাকার সাতমুখী বিলে মাটি ভরাট করে মুনস্টার পিউ ফুটওয়্যার নামের সাত মালিকের যৌথ উদ্যোগে একটি কারখানা চালু হয়েছে, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে ২০০ শ্রমিকের। সম্প্রতি সরেজমিনে আরও কয়েকটি পাদুকা কারখানার নির্মাণকাজ চলতে দেখা যায়। একদিকে বিল এলাকায় মাটি ভরাটের কাজ চলছে, অন্যদিকে ইট, বালু, সিমেন্ট, রডসহ বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণ আনা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন নতুন কারখানা নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে সেখানে। কমলপুর এলাকার ইটের রাস্তাও করোনার সময়ে পাকা হয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাদুকাশিল্পকে কেন্দ্র করে ভৈরবে জোরেশোরে নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে, যা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। যেমন ব্যাংক ও আর্থিক সেবার পরিধি বাড়ছে, নতুন নতুন হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট গড়ে উঠছে। ফলে জমির দাম বাড়ছে হু হু করে। এক বছর আগেও যেখানে ১ শতাংশ জমির দাম ছিল ১০ লাখ টাকা, সেখানে তা বেড়ে এখন ৪০ লাখ টাকায় উঠেছে। কারখানা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যেও নতুন বাসা বানিয়ে ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এ ছাড়া পাদুকাশিল্পের কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে গড়ে উঠেছে দুটি বিনোদনকেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটছে।

পাদুকাশিল্পকে ঘিরে ভৈরব এলাকায় জুতা রাখার বাক্সসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন ম্যাটেরিয়ালসের (উপকরণ) অন্তত ৩০০টি দোকান গড়ে উঠছে। এ ছাড়া পাদুকার নকশা তৈরির কারখানাও রয়েছে। পাদুকার পাইকারি দোকানও বাড়ছে দিন দিন। সব মিলিয়ে যেন হুলস্থূল ব্যাপার।

কারখানার মালিক, পাইকারি বিক্রেতা ও এলাকার বিভিন্নজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, ভৈরবে পাদুকাশিল্পের এই রূপান্তর হয়েছে স্থানীয়দের নিজস্ব উদ্যোগে। পাদুকাশিল্পের বিকাশে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা মেলেনি। এমনকি চলমান করোনা মহামারিতে সরকার বিভিন্ন খাতে যে প্রণোদনা ঋণ দিয়েছে, সেটিও পাননি ভৈরবের পাদুকাশিল্পের উদ্যোক্তারা। কোনো কোনো উদ্যোক্তা ঋণের জন্যে ব্যাংকে গেলেও খালি হাতে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কারখানার মালিকেরা বলছেন, পাদুকাশিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতি। পাদুকা তৈরির কাঁচামাল আমদানি করতে হয় চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। কিন্তু কাঁচামাল আমদানিতে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয় সরকারকে। সে জন্যে উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশীয় পাদুকাশিল্পের বিকাশ ঘটাতে হলে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কহার কমানোর পাশাপাশি বিদেশ থেকে পাদুকা আমদানির ওপর সম্পূরক শুল্কহার বাড়াতে হবে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সরকারের কাছে এমন দাবি করে এলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি বলে জানান উদ্যোক্তারা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী নাদিরুজ্জামান সোহেল বলেন, পাদুকার কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহার বেশি হওয়ায় প্রতিযোগী দেশ ভারত ও চীনের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না বাংলাদেশ। উচ্চ শুল্ক দিয়ে কাঁচামাল আনলে পাদুকার উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এতে দাম বেশি পড়ে। সে জন্যে ক্রেতারা দেশীয় পাদুকা না কিনে বিদেশি পাদুকার দিকে ঝোঁকেন। তিনি বলেন, পাদুকাশিল্পের জন্যে জরুরি হলো, আমদানি করা পাদুকার ওপর বেশি করে সম্পূরক শুল্ক বসানো আর কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এসএমই ফাউন্ডেশন ভৈরবের পাদুকাশিল্পকে ক্লাস্টার ঘোষণা করেছে প্রায় এক দশক আগে। এসএমই ফাউন্ডেশন ভৈরবের পাদুকাশিল্প নিয়ে ২০১৩ সালে বেশ কিছু সমস্যা ও সুপারিশ সরকারের কাছে তুলে ধরেছিল, যার একটিও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

ভৈরব পৌর শহরের সাতমুখী বিলে একটি পাদুকাশিল্প পার্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল আট বছর আগে। কিন্তু এখন পর্যন্ত উদ্যোগটি নেওয়া হয়নি। ভৈরবে প্রতিবছর পাদুকামেলার আয়োজনের প্রস্তাব আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। উদ্যোক্তাদের জন্যে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ ছিল এসএমই ফাউন্ডেশনের।

সেটিও কার্যকর হয়নি। ভৈরব পাদুকা শিল্প মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের জন্যে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করার সুপারিশ ছিল, যেখানে সব উদ্যোক্তা তাদের উৎপাদিত পণ্য ও তথ্য বিনা মূল্যে প্রদর্শন করতে পারবেন। এটিও বাস্তবায়িত হয়নি। আধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ একটি কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার (সিএফসি) স্থাপনের প্রস্তাবটিও আলোর মুখ দেখেনি।

ভৈরব ফুটওয়্যার ফ্যাক্টরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আল আমিন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কারণে পাদুকাশিল্পে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। কারখানার মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ী, উপকরণ বিক্রেতা—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে কেউ ঋণ পাননি। ঋণের জন্যে ব্যাংকে গেলে এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, তাতে ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। তিনি আরও বলেন, পুঁজির অভাবে পাদুকাশিল্পের অনেক ব্যবসায়ীই দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন। তাদের বাঁচাতে স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।

এদিকে দেশের সর্ববৃহৎ পাদুকা প্রস্তুতকারী এলাকা ভৈরবে মোট কতটি পাদুকা কারখানা আছে এবং সেখানে কত মানুষ কাজ করেন, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমীক্ষা হয়নি। সেখানকার কারখানাগুলোয় উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্য কত কিংবা বার্ষিক লেনদেনেরও সঠিক হিসাব আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। কম্পিউটার ব্যবহার করে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সেখানকার ব্যবসায়ীদের কোনো ধারণা নেই। এসএমই ফাউন্ডেশনের মতে, ভৈরবে পাদুকাশিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, পর্যাপ্ত কারিগর, নকশাবিদসহ প্রশিক্ষিত জনবলের তীব্র অভাব।

এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে যত উদ্যোক্তা আছেন, সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনার তত টাকা পাওয়া যায় না। ফলে সবাইকে ঋণ দেওয়া সম্ভব হয় না। সারা দেশে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে স্বল্প সুদে ঋণ দিতে হলে আরও টাকার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ভৈরবের পাদুকাশিল্পের উদ্যোক্তাদের এসএমই ফাউন্ডেশন হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আগে তারা একটি পণ্য তৈরি করতেন। এখন নানা ধরনের পণ্য তৈরি করছেন।

সূত্র : প্রথম আলো (২৫ অক্টোবর ২০২১)

নতুন মন্তব্য

শেয়ার করুন

এই শাখার আরো সংবাদ পড়ুন
All rights reserved © RMGBDNEWS24.COM
Translate »