জন্ম ও পরিবার:কবি আশরাফ আলীখান ১৯০১ সালে (বাংলা ১৩০৮ সন) ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গপ্রদেশের ফরিদপুর জেলার (বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত) আলফাডাঙ্গা উপজেলার পানাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা।
শিক্ষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ:
তিনি যশোর থেকে মেট্রিক পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ১৯২০-২২ সালের অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে এবং তিনি স্নাতক ডিগ্রি সম্পূর্ণ করতে পারেননি।
পেশাগত জীবন:
১৯২৩ সালে তিনি কলকাতা ইনকাম ট্যাক্স অফিসে চাকরি লাভ করেন। তবে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার প্রতি তার গভীর অনুরাগ তাকে সরকারি চাকরির স্থায়ীত্ব দিতে দেয়নি।
সাংবাদিকতা ও সম্পাদনা:
আশরাফ আলীখান ছিলেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক ও সম্পাদক।
· ১৯২৭ সাল: নভেম্বর মাসে তার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘বেদুইন’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকাটি ছিল তার চিন্তাধারা ও সমাজসচেতনতার মুখপত্র।
· ১৯৩৮ সাল: সেপ্টেম্বর মাসে তার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘নওজোয়ান’ প্রকাশিত হয়। পত্রিকা দুটিই তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাপ্তাহিক ‘বেদুইন’ পত্রিকাটিকে সুস্থ ধারায় পরিচালনার জন্য তিনি সরকারি চাকরি ইস্তফা দেন বলেও তথ্য পাওয়া যায়।
সাহিত্যকর্ম ও পরিচয়:
তাকে”বিপ্লবের বেদনা ও সাম্যের কবি” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তার কবিতায় সামাজিক বৈষম্য, শোষণ, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা প্রকাশ পেয়েছে।
· উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: ‘ভোরের কুহু’, ‘কঙ্কাল’।
· ‘কঙ্কাল’ কাব্যগ্রন্থ: বাংলা সাহিত্যের একটি যুগান্তকারী রচনা। এটি একটি দীর্ঘ ব্যঙ্গাত্মক ও শ্লেষাত্মক কবিতা, যা সমকালীন সমাজের কপটতা, ধর্মান্ধতা ও অর্থনৈতিক শোষণের তীব্র প্রতিবাদ। বিশিষ্ট কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ‘কঙ্কাল’ কাব্যগ্রন্থকে “সরকার” (একটি শাসনব্যবস্থা বা দলিল) হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এটি তার সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা।
আত্মহত্যা ও শেষ রচনা:
দুঃখের বিষয়,আশরাফ আলী খান ১৯৩৯ সালের ২১শে নভেম্বর ৩৬ বছর বয়সে কলকাতায় আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার আগের রাতেই তিনি ‘কঙ্কালের ৫০৪ লাইন শিরোনামে একটি দীর্ঘ ও মর্মস্পর্শী কবিতা লিখে যান। এই কবিতাটি ‘কঙ্কাল’ কাব্যেরই একটি সম্প্রসারিত ও চূড়ান্ত অভিব্যক্তি।
· ধর্মীয় নেতাদের সমালোচনা: মোল্লা-পুরোহিতদের আত্মহত্যাকে “মহাপাপ” বলে কোলাহল করার ব্যাঙ্গ করেছেন।
· অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র: ধনীর দরজায় গিয়ে ক্ষুধার্ত যুবকের আবেদনের করুণ চিত্র অঙ্কন করেছেন।
· মানবতা বনাম পশুপ্রেমের ব্যঙ্গ: মানুষ না খেয়ে মরছে, অথচ ধনীরা পশু-পাখিকে লালন পালন করছে— এই বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন।
মৃত্যু ও স্মৃতি:
তার জীবনাবসান বাংলার প্রগতিশীল সাহিত্য অঙ্গনে একটি বড় ক্ষতি হিসেবে পরিগণিত হয়। আশরাফ আলী খান মূলত বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ববঙ্গ)-এর সন্তান হয়েও তার কর্মজীবন ও সাহিত্যচর্চার প্রধান ক্ষেত্র ছিল কলকাতায়। তার রচনাবলি, বিশেষ করে ‘কঙ্কাল’, বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র ও সাহসী ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। তার জীবন ও সাহিত্যকে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করার জন্য তার রচনা সংকলন এবং সেই সময়ের পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত তার লেখা ও সম্পর্কিত নিবন্ধগুলো গবেষণার উৎস হতে পারে।
কবির আহমেদ লিনজু
সম্পাদক ও প্রকাশক আরএমজি বিডি নিউজ ।
