আপাতত সবকিছু —নরমাল’থাকার পরও অনেকে সকালে ঘুম থেকে উঠতে চান না। বিছানা ছাড়তে ক্লান্তি লাগে। জীবনের কোনো কাজে উৎসাহ পান না। প্রাণবন্ততা নেই। এটাকে কি আমরা সুস্থতা বলব? না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সুস্থতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছে – শারীরিক, মানসিক, সামাজিকভাবে ভালো থাকাই সুস্থতা।কিন্তু কোয়ান্টামে আমরা বলি, সুস্থতার সংজ্ঞা আরো গভীর। সুস্থতা মানে হলো – জীবনে স্বপ্ন পূরণের জন্যে নিরলস কাজ করার সক্ষমতা।
নিরলস পরিশ্রমী মানুষ সাধারণত অলস হয় না, স্থবির হয় না, অতিরিক্ত অসুস্থতায় ভোগে না। কারণ নিয়মিত কাজ শরীরকে সক্রিয় রাখে, রক্ত চলাচল ঠিক রাখে, ঘুমের গুণগত মান উন্নত করে।
আসলে ফিট থাকার প্রক্রিয়া পরম করুণাময় খুব সুন্দর করে বলে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের সূরা বালাদের ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, —নিশ্চয়ই আমি মানুষকে কষ্ট ও পরিশ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি করেছি।’অর্থাৎ আল্লাহ মানুষকে কষ্ট ও পরিশ্রম নির্ভর করে সৃষ্টি করেছেন। যে যত বেশি কষ্ট, পরিশ্রম ও মেহনত করবে তিনি তত বেশি সুস্থ থাকবেন, ভালো থাকবেন। এজন্যে কোয়ান্টামে আমরা বলে থাকি যত চাপ তত শার্প। এই শার্পনেস দেহের ও মনের।
বেদ এও এই কথা বলা হয়েছে। —হে মানুষ! উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে আন্তরিকতার সাথে পরিশ্রম করো। দারিদ্র ও অসুস্থতা তোমার কাছ থেকে পালিয়ে যাবে।’অর্থাৎ পরিশ্রমী মানুষ রোগ বালাই থেকে মুক্ত থাকে, মুক্ত থাকে অভাব ও দরিদ্র থেকে।
আমরা অধিকাংশ মানুষ এই পরিশ্রমে অনীহা প্রকাশ করি। যখন কেউ ভেতর থেকে পরিশ্রমের প্রতি অনীহা প্রকাশ করেন, তখন সুস্থ থাকার সক্ষমতাকে তিনি কমিয়ে ফেলেন। কারণ আমরা যা ভাবি, তারই প্রকাশ ঘটে আমাদের দেহ-মনে।
পরিশ্রম করলে শুধু সুস্থতা নয় বরং স্রষ্টার কাছ থেকে পুরষ্কারও লাভ করা যায়। নবীজী বলেছেন, —অক্লান্ত পরিশ্রম করো। তাহলে আল্লাহ তোমাকে পুরস্কৃত করবেন।'(বায়হাকি)
সুস্থতার আসল রহস্য কী? এটি বোঝার জন্যে দুটি চরিত্রের কথা ভাবি – ক এবং খ। দুজনেই সমবয়সী, ৩৫ বছর। দুজনের মেডিকেল রিপোর্ট একদম ঠিকঠাক।
ক অফিসে যায়, কিন্তু কাজে মন নেই। সারাক্ষণ ঘড়ি দেখে কখন অফিস শেষ হবে। বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দেয়, হাতে থাকে মোবাইল। তার জীবনে কোনো লক্ষ্য নেই। নিজের ভেতর থেকে কোনো কাজ করার অনুপ্রেরণা পান না।
খ একই অফিসে কাজ করে। কিন্তু তার একটি স্বপ্ন আছে – সে একটি সেবামূলক সঙ্ঘের সাথে সম্পৃক্ত। অফিস শেষ করার পরও সে ১-২ ঘণ্টা সে সঙ্ঘের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের প্রত্যেকের খোঁজ-খবর নেয়। তার চোখেমুখে একটা আলাদা দীপ্তি। সবসময় প্রাণবন্ততা তাকে ঘিরে থাকে।
চিকিৎসা বিজ্ঞান বলবে – দুজনই সুস্থ। কিন্তু মনোবিজ্ঞান এবং জীবনমানের বিচারে – খ অনেক বেশি সুস্থ। কারণ তার মধ্যে আছে —নিরলস পরিশ্রম করার সক্ষমতা‘।
এই সক্ষমতা তিনটি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
১.শারীরিক শক্তি : যা আমাদের দীর্ঘক্ষণ কাজ করতে দেয়।
২.মানসিক দৃঢ়তা : যা ব্যর্থতার পরও আমাদের উঠে দাঁড়াতে শেখায়।
৩.আবেগিক স্থিতিশীলতা : যা চাপের মুখেও আমাদের শান্ত রাখে।
নিউরোসায়েন্স বলছে – আমাদের মস্তিষ্ক চ্যালেঞ্জ নেয়ার জন্যেই তৈরি। যখন আমরা কোনো কঠিন কাজ করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন ও সেরোটোনিন নিঃসৃত হয়। নিরলস পরিশ্রম করার সক্ষমতা তাই শুধু শারীরিক সুস্থতা নয়, বরং মানসিক সুখের চাবিকাঠি। এজন্যে পরিশ্রমকে সবসময় স্বাগত জানাতে হবে।
পরিশ্রমী মানুষই শতায়ু হওয়ার পথে এগিয়ে থাকেন :
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। ১০০তম জন্মদিন পালন করেছেন, অথচ এখনো তিনি দিনে ৮-১০ ঘণ্টা কাজ করেন। মাহাথির বলেন যে সুযোগ পেলেই আমি আরাম খুঁজি না। হাঁটতে বের হই। সাইকেল চালাই, ঘোড়ায় চড়ি। ব্রেন শার্প রাখার জন্যে বই পড়ি লেখালেখি করি বক্তৃতা দেই আলোচনায় অংশ নিই।
তিনি বলেন, “ব্রেন হলো পেশির মতো। একে ব্যবহার না করলে এটি অকেজো হয়ে যায়।” আমার বিশ্বাস দীর্ঘদিন দাপিয়ে কাজ করতে চাইলে শরীর মনকে অবশ্যই একটিভ রাখতে হবে। তিনি কোনো লাঠি ছাড়াই এখনো সোজা হয়ে হাঁটেন। তার দীর্ঘায়ুর রহস্য কোনো ওষুধ নয়, রহস্য হলো – শৃঙ্খলা এবং কাজ। মাহাথির বলেছেন: ‚আমি এত দীর্ঘজীবী হওয়ার জন্যে কোনো প্রচেষ্টা করি নি কিন্তু আমি আমার স্বাস্থ্যের যত্ন নিই।”
জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপের কথা ভাবুন। একে বলা হয় —ব্লু জোন’। এখানকার মানুষ ১০০ বছরের বেশি বাঁচে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, এর কারণ হলো—জীবনের উদ্দেশ্য’। তারা কখনোই —রিটায়ার’বা অবসর নেন না। শেষ বয়স পর্যন্ত তারা বাগান করেন, মাছ ধরেন।
কোয়ান্টামে আমরা ভালো কাজে ব্যস্ত থাকাটা সবসময় উৎসাহিত করি। আমাদের একটি জনপ্রিয় অটোসাজেশন আছে। যত আরাম তত ব্যারাম যত ব্যস্ত তত সুস্থ।
সন্তানকে সুস্থ ও দীর্ঘজীবী দেখতে হলে পরিশ্রমে উদ্বুদ্ধ করুন :
বিশেষজ্ঞদের মতে, খুব ছোটবেলায় এমনকি পাঁচ বছর বয়সের আগে থেকেই যেসব শিশু খেলাধুলা-দৌড়ঝাঁপের মধ্য দিয়ে অধিকতর সক্রিয় থাকতে অভ্যস্ত, তাদের সুষম মনোদৈহিক বিকাশ এবং পরবর্তী জীবনে সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।একজন বাবা মায়ের প্রকৃত দায়িত্ব তার অল্পবয়সী সন্তানকে এমন কাজের সুযোগ করে দেয়া, যা তাকে কষ্টসহিষ্ণু ও পরিশ্রমী করবে।
সুস্থ থাকার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যে করণীয় :
১. সুস্থতার দায়িত্ব নিতে হবে নিজেকেই :
মহীয়সী নারী হেলেন কেলার বলেছেন, —শরীরকে সম্মান করা মানে নিজের জীবনকে সম্মান করা।’
ছোট ছোট যত্ন স্বাস্থ্য গড়ে তোলে। আর ছোট ছোট অযত্ন অবহেলা স্বাস্থ্য নষ্ট করে। এজন্যে স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিজেকে নিতে হবে। হেলদি লাইফস্টাইল অনুসরণে আন্তরিক হতে হবে। জীবনে যত বেশি সক্রিয় ও সচল থাকা যায় তার চেষ্টা করতে হবে। এজন্যে চেয়ারে বসে না থেকে দাঁড়ানো ও হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। কোয়ান্টামের ইয়োগার একটি বিশেষ আসন- বঙ্গাসন। প্রতিদিন কমপক্ষে ১০-১৫ মিনিট এই আসন করতে হবে। হেলথি লাইফস্টাইল নিয়ে নিত্যদিন শত শুদ্ধাচার অণু বইতে সুন্দরভাবে লেখা আছে-সুস্থ জীবনদৃষ্টি, স্বাস্থ্যসম্মত আহার, পর্যাপ্ত পানি পান, পরিমিত ঘুম, মেডিটেশন, দমচর্চা ও কোয়ান্টাম ইয়োগা আপনাকে দেবে সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন কর্মব্যস্ত সুখী জীবন। যত্নায়নের এই বিষয়গুলো নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে।
২. সুস্থতার জন্যে মাইন্ডসেটও খুব গুরুত্বপূর্ণ :
চিকিৎসা, থেরাপি, ওষুধ-পথ্য সমস্তই দারুণ গতি পায় যখন ব্যক্তির মনে উচ্চারিত হয় আমি সুস্থ হতে চাই। এই যে ভালো থাকতে চাই, সুস্থ থাকতে চাই এই ভালো ভাবনা সুস্থ থাকার সক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে। এজন্যে কোয়ান্টামে আমরা বলি, রোগ-অসুস্থতার কথা কম বলুন। সবসময় বলুন, আমি সুস্থ থাকব। দীর্ঘায়ু হবো। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণায় অগ্রণী প্রতিষ্ঠান মেয়ো ক্লিনিকের গবেষকরা বলেছেন : ভালো ভাবনা বিষণ্নতা রোধ করে, ব্যথার অনুভূতি কমায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। সর্বোপরি জীবনমান বাড়ায় যা দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আর মাইন্ডসেট ঠিক করার জন্যে মেডিটেশনের কোনো বিকল্প নেই। যে মন অস্থির, সে মন দীর্ঘ সময় একটানা কাজ করতে পারে না। এজন্যে আমরা বলি, মন ভালো তো সব ভালো। নিয়মিত মেডিটেশন আপনার ফোকাস বাড়াবে এবং দুশ্চিন্তা কমাবে। একজন মানুষ যখন ভয় আতঙ্ক শঙ্কা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে তখন সহজাত সুস্থতার ক্ষমতা বেড়ে যায়। কোয়ান্টামে গত ৩৩ বছরে হাজার হাজার মানুষ নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা করে নিজের দেহ-মনকে সুস্থ রেখেছেন। ঠিক তেমনি তারা ধাপে ধাপে নিরলস পরিশ্রম করার সক্ষমতা বাড়িয়েছেন।
৩. জীবনের জন্যে কল্যাণকর লক্ষ্য নির্ধারণ করুন :
যখন আমাদের কাজের উদ্দেশ্য হয় প্রভুর সন্তুষ্টি, পরিবারকে সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ করা, সমাজে অবদান রাখা – তখন কাজ আর বোঝা থাকে না, কাজ হয়ে যায় ইবাদত। জীবনের জন্যে এই কল্যাণকর লক্ষ্য নির্ধারণ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে কাজ নিজের ও অন্যের জন্যে কল্যাণ নিয়ে আসে না, সেই কাজ কখনো তৃপ্তি ও প্রশান্তি দিতে পারে না। আমাদের প্রতিটি কাজের উদ্দেশ্য হতে হবে স্রষ্টার সন্তুষ্টি এবং মানুষের কল্যাণ।
৪. সৎসঙ্ঘে একাত্ম থাকুন :
একা একা ভালো থাকা কঠিন। এমন মানুষের সাথে মিশতে হবে যারা পরিশ্রমী। হার্ভার্ডের গবেষণা বলছে – আপনার চারপাশের মানুষ যদি লক্ষ্যমুখী হয়, আপনিও সফল হবেন। আমরা ভাগ্যবান কোয়ান্টামে এসে এরকম একটি সৎসঙ্ঘ আমরা পেয়েছি। এখানে আমরা পরিশ্রম করি আনন্দ নিয়ে। সামনে রমজান এসেছে। আসুন, রমজানে আমাদের ভালো কাজের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিই। স্রষ্টার ইবাদত ও সৃষ্টির সেবায় প্রাণান্ত পরিশ্রম করি। আমাদের শারীরিক-মানসিক-আত্মিক ফিটনেসের পরিমাণ বাড়বে।
আসলে জীবনে নিরলস পরিশ্রম করার সক্ষমতা বাড়বে যখন আমার জীবনে ব্যালেন্স আসবে। জীবনে ব্যালেন্স এলেই আমরা সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করতে পারব। অর্থ সফলতা যেমন মানুষকে সামাজিক মর্যাদা এনে দেয় তেমনিভাবে অনেকসময় উশৃঙ্খলার পথটাও এনে দেয়। এর জন্যে প্রয়োজন নিয়মিত মেডিটেশন এবং সৎসঙ্ঘের সাথে লেগে থাকা। কারণ সৎসঙ্ঘে একাত্ম থাকলে জীবনে একটি ডিসিপ্লিন তৈরি হয়, ছন্দ তৈরি হয়। এই ছন্দই জীবনকে সফল করে।
আজকের এই দিনে, ২০২৬ সালের শুরুতে আসুন আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি – আমি কি সত্যিই সুস্থ? আমি কি প্রতিদিন সকালে নতুন স্বপ্ন নিয়ে জাগি? নাকি আমি শুধু দিন পার করছি?আমি কি পরিশ্রমে আনন্দ পাই?
এখন থেকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি শুধরে নেব। প্রতিটি কল্যাণকর কাজই হলো ইবাদত। এমনকি নিজের দেহের যত্ন নেয়াও ইবাদত। নিজের মনকে আর্বজনামুক্ত করাও ইবাদত। আর কাজ মানেই আনন্দ। কাজ মানেই অর্জন। আর যত কাজ করব তত আমার সুস্থ থাকার সক্ষমতা বাড়বে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে Use it or lose it.ব্যবহার করতে হবে নতুবা হারাতে হবে। তাই যত দেহ-মনের শক্তি ও সক্ষমতাকে ভালো কাজে লাগাব, প্রাণান্ত পরিশ্রম করার মাইন্ডসেট করব তত সুস্থ ও দীর্ঘায়ু জীবনের অধিকারী হবো।
