বর্তমানকে নিয়ে বাঁচতে চাই
রিমন কান্তি দে
লোক—প্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
আমি সেই ছেলে, যার দিনগুলো কাটত দুষ্টামি আর হাসিখুশিতে। আমার জীবনের গল্পটা তেমন একটা বড় না হলেও কিছু তো গল্প থেকেই যায়। ছোটবেলায় যেমন পড়ালেখায় ভালো ছিলাম তেমনি ছিলাম দুরন্ত স্বভাবের। আমার বাড়ি কক্সবাজার জেলায় ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামবাদের হিন্দুপাড়ায়। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন গ্রামে লেখাপড়া করার তেমন পরিবেশ ছিল না। বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেতে হতো। গ্রামের পরিবেশে ভালোই কেটেছিল আমার শৈশবের দিনগুলো। পড়ালেখায় ভালো ছিলাম বলে স্যারদের কাছেও ছিলাম প্রিয়। কিন্তু মাঝে মাঝে ভালো সময়গুলোর মাঝেও খারাপ সময় এসে উপস্থিত হয়। তেমন এক ঘটনা ঘটল আমার জীবনে।
আমার বাবা একজন কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। কিন্তু বাবার একদিন হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হলো। পরিবারে আমরা চার ভাই। বাবার অসুস্থতার কারণে বড় ভাই পড়ালেখা বন্ধ করে সংসারের হাল ধরলেন। মেজো ভাই বান্দরবানে কষ্ট করে লেখাপড়া চালিয়ে গেলেন। আর মা চট্টগ্রামে চলে গেলেন কাজের সন্ধানে। আমি আর আমার ছোট ভাই মামার বাড়িতে থেকে পড়ালেখা শুরু করলাম।
আমি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কখনো মামার বাড়িতে, কখনো মাসির বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করেছি। অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আমাকে আমার মামা ও মাসি বললেন কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্যে। তখন আমার একজন মামাতো ভাই কোয়ান্টামে পড়ত। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি মামার সহায়তায় পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়েছিলাম।
সেখানে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বন্ধুদের দেখে হতবাক হয়েছিলাম। এত ভিন্ন ধরনের মানুষ একসাথে থাকব কীভাবে! সবাই কি একই খাবার খায় নাকি ভিন্ন? সবাই বাংলায় কথা বলবে তো? বিভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু একপর্যায়ে তাদের সবার সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
আমি ভর্তি হয়েছিলাম বাণিজ্য বিভাগে। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি যোগ দিয়েছিলাম আর্চারিতে। কোয়ান্টামে স্যারদের আদর-যত্নে আমি বেড়ে উঠতে লাগলাম। কয়েকজন স্যার খুবই ভালো ছিলেন, তাদের কথা খুব মনে পড়ে। নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমি আর আমার বন্ধুরা যে মজা করেছিলাম তা বলে শেষ করা যাবে না। তাছাড়া আমি বিভিন্ন ক্লাসের বড় ভাইদের সাথে মিশতে শুরু করলাম। তাদের কাছ থেকে আমি পড়ালেখাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম।
মা-বাবা ও ভাইদের ছেড়ে থাকতে একটু কষ্ট হতো। কিন্তু আমি মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম। জীবনে সবকিছু তো পূর্ণভাবে পাওয়া যায় না। ছোটবেলা থেকে অনেক সংগ্রাম করে বেড়ে উঠেছি। তাই কোয়ান্টামে এসে আমি আমার জীবন সম্পর্কে বুঝতে পেরেছিলাম। আমার লক্ষ্যকে ঠিক করতে পেরেছিলাম যে, জীবনে কিছু একটা হতে হবে। কারণ গ্রামে পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না বলে তেমন একটা ভালো পরিবেশ পাই নি। অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না।
কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজে আমার অনেক মজার স্মৃতি রয়েছে। ক্লাসে ও কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিতে বন্ধুদের সাথে দুষ্টামি করতাম। কয়েকজন মিলে আম আর গুটগুটি ফল পাড়তে যেতাম। স্কুলে আবাসিক দায়িত্বশীলদের ও স্যারদের সাথেও অনেক স্মৃতি রয়েছে। তাদের সাথে আমরা গল্প করতাম। মাঝে মাঝে তাদের সাথে খেলাধুলাও করতাম। সবার সাথে হেসেখেলে দিন কাটালেও আমার মনের মধ্যে অনেক কষ্ট জমে ছিল, যা আমার বন্ধু এবং স্যারদেরকে বুঝতে দিতাম না।
আমার মাঝে মাঝে মনে হতো, পৃথিবীতে শুধু কষ্ট করতে এসেছি নাকি? ধনীর ছেলেমেয়েরা যখন নানা সুযোগ-সুবিধা পেত, তা দেখে আমি মাঝে মাঝে আমাদের অবস্থা ভেবে হতাশ হতাম। কিন্তু যেদিন সাফল্য দোরগোড়ায় অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলাম সেদিন শান্তি এবং খুশিতে চোখ থেকে পানি ঝরে পড়ল। আশা করি, আমি আমার সামনের জীবনেও সাফল্য ধরে রাখত পারব।
ভগবানের আশীর্বাদে আমি ২০২১-২২ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় চান্স পেয়েছি। আমার এই সাফল্যের পেছনে যার অবদান না বললে হয় না, তিনি হচ্ছেন গুরুজী দাদু। আমি তার দীর্ঘায়ু কামনা করি। তাকে যেন ভগবান আরো ভালো কাজ করার সুযোগ দেন।
আমি যেন আমার লক্ষ্য পূরণ করতে পারি, এই প্রার্থনা করি। অতীত আমাকে অনেক হতাশ করার চেষ্টা করবে, ভবিষ্যৎ আমাকে স্বপ্ন দেখাবে আর বর্তমান সবসময় আমার সাথে থাকবে। তাই আমি বর্তমানকে নিয়ে বাঁচতে চাই। বর্তমানকে আঁকড়ে ধরে সংগ্রাম করে যেতে চাই। আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাব—এটাই আমার বিশ্বাস।
[ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘সব সম্ভব’ বই থেকে ]
