যা আছে তা নিয়ে শুরু করলাম
উক্যএ মার্মা
বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৪
সেদিন অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল। ২০১৭ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি একটা সময়। বেলা সাড়ে ১২টায় এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। আশানুরূপ না হওয়ায় রেজাল্টটা মেনে নিতে পারছিলাম না। বার বার মনে হচ্ছিল—আরো পরিশ্রম করা উচিত ছিল!
আমি ১২ বছর (২০০৩—২০১৫) শিশুশ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে পড়েছি। কিন্তু এইচএসসি-টা বাইরে কোথাও পড়ার ইচ্ছে ছিল। তাই মাকে জানালাম। তারপর নিজ এলাকা লামায় গিয়ে কলেজে ভর্তি হলাম। বাইরের পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হলো। আমি ছোট থেকে কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে নিয়মের মধ্যে বড় হয়েছি। কঠোর পরিশ্রম করতেও শিখেছি। কিন্তু বাইরে এসে কিছুদিনের মধ্যে আমাকে দীর্ঘসূত্রিতা পেয়ে বসে। কোনো নির্দিষ্ট রুটিন নেই। আমাকে সতর্ক করার মতো পাশে কেউ নেই। এজন্যেই এইচএসসি-তে এ মাইনাস পেলাম।
এসময় আমাকে কিছু টিউশনি করাতে হয়েছে অর্থের জন্যে। গ্রামের কয়েকজন ছাত্র আমার কাছে বাসায় এসে প্রাইভেট পড়ে যেত। এতে কিছুটা উপার্জন হতো। তা দিয়ে আমি প্রয়োজনীয় পোশাক, বই কেনার খরচগুলো চালিয়ে নিলাম। কারণ আমি তো জানি, আমার মায়ের পক্ষে সংসারের এত চাপ নেয়া সম্ভব না। আমরা দুই ভাই ও ছোটবোনের লেখাপড়াসহ বাড়ির সব খরচ চালানো তার জন্যে কঠিন। ২০১২ সালে বাবা পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার পর মায়ের ওপরই পুরো সংসারের দায়ভার এসে পড়ে।
যা-হোক এইচএসসি-র রেজাল্ট ভালো না হওয়ার কারণটা আমি বুঝতে পারলাম—আমি একটা বৃত্তে আটকে গেছি। এই বৃত্ত হলো দীর্ঘসূত্রিতার বৃত্ত, ভালো কিছু করতে না পারার বৃত্ত। এখান থেকে আমাকে বের হতেই হবে। তবে শুরু করাটা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। একটি অটোসাজেশনের কথা মনে পড়ল—আমার সীমাবদ্ধতাই আমার শক্তি। আমি জানি কীভাবে সীমানা বাড়াতে হয়। আমার সীমানা বাড়তেই থাকবে’।
কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে থাকতে আমি ছবি আঁকা, নাচ-গান, প্যারেড-ডিসপ্লে, খো খো, কাবাডিসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের সবগুলোতেই প্রতিযোগিতা করে প্রথম সারিতে থেকেছি সবসময়। লেখাপড়া আর খেলাধুলা দুটাই সমানভাবে ভালো করেছিলাম। এসএসসি-তেও ফলাফল ভালো ছিল।
মনে সাহস পেলাম। ভাবলাম, এইচএসসি-তে রেজাল্ট তেমন ভালো হয় নি তো কী হয়েছে! বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে ভর্তি হতেই হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মনছবি করেছিলাম ছোটবেলায়। তাই আমার যা আছে আমি তা নিয়ে শুরু করলাম। উচ্চ মাধ্যমিকের বাংলা বই দিয়েই পড়া শুরু হলো। ঢাকায় বা চট্টগ্রামে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করার সুযোগ হয়ে উঠল না। কারণ আমি যদি বাইরে যাই তাহলে আরো অর্থের প্রয়োজন হবে। মা হয়তো আমার কথা ভেবে চেষ্টা করবেন। কিন্তু আমি তো বুঝি—সংসার চালাতে মাকে কতটা কষ্ট করতে হচ্ছিল!
নিজে নিজেই ভর্তি পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় যারা বাইরে কোচিং করছিল, তাদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানলাম আমি অনেক পিছিয়ে আছি। কিছুটা মন খারাপ হলো। তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র কোয়ান্টা জ্যাকি ভাই ফোন করে আমাকে পড়ার জন্যে উৎসাহিত করলেন। তিনি ভর্তি পরীক্ষার জন্যে কিছু বই পাঠিয়ে দিলেন আমার কাছে। তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
আসলে সাময়িক বিরতি নিলেও কোয়ান্টামের শিক্ষা আমি ভুলে যাই নি। আবার প্রতিদিন দুইবেলা মেডিটেশন শুরু করলাম। ধ্যান আর অটোসাজেশনের প্রকৃত অর্থ কী সেটা আমি সে-সময় ভালোমতোই উপলব্ধি করেছি।
কোয়ান্টামের আরেক সিনিয়র লেংঙি ভাইয়ের কথা না বললেই নয়। তিনি আমাকে ইংরেজিতে সহযোগিতা করলেন। পরম করুণাময়ের কাছে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলাম। বাংলা সাহিত্য আমার বরাবরই ভালো লাগে। গল্প-কবিতা-উপন্যাসে সমৃদ্ধ এই বাংলা সাহিত্য।
এখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার শেষ প্রান্তে আছি। অনার্স শেষে মাস্টার্সে পড়ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার এই সময়টা আমি কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম সেন্টারের একজন স্বেচ্ছাসেবক ছিলাম। এখানে এসে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে আমার ভালো লাগে। এই সৎসঙ্ঘের সাথেই আমি আজীবন থাকতে চাই। কারণ এখানে নিজের যে-কোনো নেতিবাচকতাকে জয় করার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। এখন আমার মনছবি হলো, সবসময় নিজের কল্যাণের পাশাপাশি মানবকল্যাণ ও সেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখা।
[ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘সব সম্ভব’ বই থেকে ]
