১৫৪ পদ শূন্য, ১৬ বছরের প্রকল্প শেষেও অচল জাতীয় চক্ষু ইনস্টিটিউট

নিজস্ব প্রতিবেদক, RMG BDNews24.com

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত দেশের একমাত্র বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল চরম জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতায় অচলাবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত সর্বশেষ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদনে এই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে।

৭৮% রোগীর দীর্ঘ অপেক্ষা, ৩৭% রোগীকে চারবার আসতে হয়

আইএমইডির ১৭৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী মূল বরাদ্দ ছিল ৮৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকায়। জরিপে দেখা যায়, ৭৮ শতাংশ রোগী চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ রোগী চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। ৩৭ শতাংশ রোগী চিকিৎসা পেতে চারবার পর্যন্ত হাসপাতালে আসতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, ৩৬ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয় সব ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাননি।

সিটিস্ক্যানসহ ৩টি দামি যন্ত্র অচল

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালে মোট ৭০ আইটেমের যন্ত্রপাতি রয়েছে। এর মধ্যে মাল্টি স্লাইস সিটি স্ক্যানসহ মোট তিনটি দামি যন্ত্র অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। চিকিৎসক-নার্সের ১৫৪টি পদ এখনো লোকবল নিয়োগ করা হয়নি, যা সরাসরি সেবার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

দুপুর ২টার পর চিকিৎসক-নার্স গায়েব, রোগীরা ফিরে যান

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুপুর ২টার পর আর চিকিৎসক-নার্স পাওয়া যায় না। অনেক সময় চিকিৎসকও সময়মতো আসেন না। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও শয্যার অভাবে সকালে লাইনে দাঁড়িয়েও দুপুর ২টায় সেবা বন্ধ হওয়ার আগে সিরিয়াল না পেয়ে অনেক রোগী চিকিৎসা ছাড়াই বাড়ি ফিরে যান।

১৬ বছরের প্রকল্প, ৭ বার মেয়াদ বৃদ্ধি

১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির আধুনিকায়ন ও পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৩ সালে, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৬ সালে। তবে সাতবার সময়সীমা বাড়ানোর পর প্রকল্পটি শেষ হয় ২০১৯ সালে। তিন বছরের মেয়াদে অনুমোদিত এই প্রকল্প শেষ হতে সময় লেগেছে ১৬ বছর। প্রকল্পে মোট চারজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। এত সময় ও ব্যয় সত্ত্বেও আইএমইডির মূল্যায়নে দেখা গেছে, হাসপাতাল এখনও চরম জনবল সংকটে ভুগছে।

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মবিরতি, হামলায় ১৫ জন আহত

হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গত ২৮ মে ২০২৫ তারিখে নিরাপত্তার দাবিতে তারা কর্মবিরতি পালন করেন। এ সময় জুলাই আন্দোলনে আহতদের সঙ্গে হাসপাতালের কর্মচারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যেখানে চিকিৎসকসহ ১৫ জন আহত হন। এই ঘটনার পর হাসপাতালে ব্যাপক ভাঙচুর হয় এবং বহির্বিভাগের টিকিট বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যান।

আইএমইডির সুপারিশ

আইএমইডি প্রতিবেদনে হাসপাতালটির সেবার মান উন্নয়নে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে: ·

সব সেবা, বিশেষ করে টিকিটিং ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়করণের আওতায় আনা ·

রোগীদের প্রতি সহানুভূতি ও যত্ন প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া ·

সব ধরনের চিকিৎসা সেবা বিনামূল্যে নিশ্চিত করা ·

চিকিৎসকদের পরামর্শের সময় দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বাড়ানো বছরে ৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করে যাওয়া হাসপাতাল আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই প্রতিষ্ঠানের উন্নত চিকিৎসার ফলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। বিদেশে চোখের চিকিৎসার জন্য যাওয়া প্রায় ৫০ হাজার রোগীর প্রায় ৭৫ শতাংশ এখন দেশের মাটিতেই চিকিৎসা পাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে সেই সাশ্রয় ও সেবা দুটোই হুমকির মুখে পড়বে।

দেশের কোটি মানুষের চোখের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল এই প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে দ্রুত ১৫৪টি শূন্যপদে নিয়োগ, অচল যন্ত্রপাতি মেরামত, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী রোগী ও সচেতন মহল। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।