ঢাকা: দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রধান বাজার ইউরোপে চাহিদা হ্রাস, আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র দর কষাকষি এবং দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি ও মজুরি-চাপ একসাথে খাতটিকে অস্তিত্বের পরীক্ষায় ফেলেছে।
ইউরোপে বড় ধাক্কা, দাম কমছে অর্ডারের চেয়েও বেশি
বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে। সেই বাজারেই বড় পতন দেখা গেছে। ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১১.৬৭ শতাংশ কমে ১১.৯৩ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ১৩.৫০ বিলিয়ন ইউরো।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পতন সামগ্রিক বাজারের পতনের চেয়ে অনেক বেশি। একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমেছে মাত্র ৩.৮৩ শতাংশ কমে ৬০.২৮ বিলিয়ন ইউরোতে। অর্থাৎ বাংলাদেশ বাজার হারাচ্ছে। একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ৪.৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২.৯৯ বিলিয়ন ইউরোতে উন্নীত হয়েছে।
সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট হয় দামের হিসাবে। রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪.৫৮ শতাংশ, কিন্তু গড় মূল্য কমেছে ৭.৪৩ শতাংশ কমে প্রতি কেজিতে ১৩.৭৬ ইউরোতে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেতারা বাজারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দাম কমাতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশ এখন ইউরোপে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দামে পোশাক বিক্রি করছে, যেখানে বৈশ্বিক গড় ১৯.৮৪ ইউরো।
এর পেছনে ইউরোপের অর্থনৈতিক বাস্তবতা দায়ী। ইউরোপ-বাংলাদেশ ফেডারেশন অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র ডিরেক্টর মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এর ফলে ফ্রান্স ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হচ্ছে এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
মজুরির টানাপোড়েন: ১২,৫০০ বনাম ৩০,০০০ টাকা
বাইরে অর্ডার সংকট, ভেতরে মজুরির চাপ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকায় উন্নীত করার পর তা আর বাড়েনি। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর উত্তরায় এক হাজারের বেশি শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকায় উন্নীত করার দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, ঘর ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামে ১২,৫০০ টাকায় সংসার চালানো অসম্ভব। সরকার ইতিমধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
কারখানা মালিকরা বলছেন, ক্রেতারা দাম বাড়াতে রাজি নয়, অথচ দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে ডিজেল জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ ১০-১৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিজিএমইএর নেতারা জানান, এক দশকের বেশি সময় ধরে তারা ক্রেতাদের কাছে প্রতি পোশাকে ৫-১০ সেন্ট বাড়ানোর অনুরোধ করলেও সাড়া মেলেনি।
শিল্প স্থানান্তরের ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সময়মতো ডেলিভারি দিতে না পারলে ফাস্ট ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত অর্ডার ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তানে সরিয়ে নেবে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই গ্যাস বিল ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে প্রধান শিল্পাঞ্চলে কয়েক ডজন কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এখন তিনটি পদক্ষেপ জরুরি:
১) সাধারণ পণ্যের বদলে ম্যানমেড ফাইবার ও উচ্চমূল্যের পোশাকে যাওয়া,
২) জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ও
৩) জাপান-অস্ট্রেলিয়ার মতো নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়ানো। অন্যথায় ইউরোপে চাহিদা না ফেরা পর্যন্ত এই সংকট কাঠামোগত মন্দায় রূপ নিতে পারে।
