আরএমজি নির্ভরতা থেকে বহুমুখী অর্থনীতির পথে
প্রতিবেদন: আরএমজি বিডিংস ডেস্ক
একটি জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তি কেবল একটি খাতের ওপর নির্ভরশীল হলে সেই ভিত্তি কখনোই টেকসই হয় না। আমাদের দেশের বর্তমান বাস্তবতা ঠিক এমনই একটি সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে।
এক সময় যে জাতি মসলিন তৈরি করে সূক্ষ্ম কারিগরি ও বস্ত্রশিল্পে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল, সেই জাতি আজ তৈরি পোশাক শিল্পে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি। এটি আমাদের গর্ব। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ, প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার এসেছে এই খাত থেকে। প্রায় ৪৪ লাখ মানুষ সরাসরি এখানে কাজ করেন, যার ৬০ শতাংশই নারী। কিন্তু এই অর্জনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে বড় ঝুঁকি।
কেন এই ঝুঁকি?
প্রথমত, বৈশ্বিক নির্ভরতা: এই শিল্প বহুলাংশে বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা, ক্রেতার সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির ওপর নির্ভরশীল। করোনা মহামারিতে মাত্র ৩ মাসে ৩.১৮ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক মন্দায় ২০২৩ সালে অর্ডার কমেছিল ১৮ শতাংশ।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির চাপ: স্বয়ংক্রিয় মেশিন ও এআইয়ের প্রসারে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতে ৩০ শতাংশ কাজ কমে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, এলডিসি উত্তরণ ও পরিবেশগত চাপ: ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বের হলে ইউরোপে শুল্কমুক্ত সুবিধা (জিএসপি) থাকবে না। তখন প্রতি ১০০ ডলারের পোশাকে ১২ ডলার শুল্ক দিতে হবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্রিন ডিল ও কার্বন ট্যাক্সের কারণে কারখানাগুলোকে বাড়তি ১৫-২০ শতাংশ খরচ করতে হবে।
তাহলে বিকল্প কোথায়? বিকল্প মানে পোশাক বাদ দেওয়া নয়, পোশাকের পাশাপাশি আরও ৪টি শক্ত স্তম্ভ তৈরি করা।
১. কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ: দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি টন ফল-সবজি সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়। কোল্ড চেইন, হিমাগার ও ফুড প্রসেসিংয়ে বিনিয়োগ করলে বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি সম্ভব, এখন হচ্ছে মাত্র ১.২ বিলিয়ন। এতে গ্রামে কোটি মানুষের কাজ হবে।
২. তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা: বর্তমানে ৬.৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আনছেন। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন। সফটওয়্যার, বিপিও ও এআই সেবায় তরুণদের দক্ষ করলে এটাই হতে পারে দ্বিতীয় আরএমজি।
৩. ওষুধ ও হালকা প্রকৌশল: ওষুধ শিল্প এখন ১৪৫টি দেশে রপ্তানি করছে। হালকা প্রকৌশলে বগুড়া, যশোর ও ঢাকায় ৪০ হাজার কারখানা বছরে ৮ হাজার কোটি টাকার যন্ত্রাংশ তৈরি করছে, যা আমদানি বিকল্প।
৪. চামড়া ও পাটজাত পণ্যের বৈচিত্র্যায়ন: কাঁচা চামড়া নয়, ব্র্যান্ডেড ব্যাগ, জুতা ও পাটের পরিবেশবান্ধব ব্যাগের বিশ্ববাজার ৩০০ বিলিয়ন ডলারের। আমরা ধরেছি মাত্র ১ শতাংশ। ইটিপি ও পরিবেশবান্ধব ট্যানারি হলে ইউরোপের বাজার খুলবে।
উত্তরণের রোডম্যাপ কী?
বিকল্প খাতে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। তিনটি কাজ জরুরি:
ক) দক্ষতা উন্নয়ন: প্রতি উপজেলায় টিটিসিকে বিকল্প খাতের জন্য আপগ্রেড করতে হবে। ২ বছরের ডিপ্লোমা ও ৬ মাসের কারিগরি প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।
খ) সহজ অর্থায়ন: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ ও স্টার্টআপ ফান্ড চালু করতে হবে।
গ) সমন্বিত উদ্যোগ: সরকার, বেসরকারি খাত (বিজিএমইএ, বেসিস), ব্যাংক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে ৫ বছরের রোডম্যাপ ও নতুন রপ্তানি বাজার (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা) খুঁজতে হবে।
সারকথা হলো, তৈরি পোশাক শিল্প আমাদের অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত্তি, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য একমাত্র অবলম্বন নয়। মসলিন থেকে আরএমজি পর্যন্ত আমরা নিজেদের প্রমাণ করেছি। এখন সময় এসেছে আরএমজি থেকে বহুমুখী শিল্পোন্নত জাতিতে পরিণত হওয়ার। বিকল্প কর্ম ও বিকল্প উৎপাদনে বিনিয়োগই পারে আমাদের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল, ঝুঁকিমুক্ত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে। তাই এই উত্তরণ আর বিলাস নয়—এটি এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।
