জীবন যে-কোনো সময় যে-কোনো জায়গা থেকে শুরু করা যায়। যে-কোনো স্তর থেকে শুরু করা যায়, যে-কোনো বয়স থেকে শুরু করা যায়।
জীবনের শুরুটাই হয় যার ক্যান্টিনবয় হিসেবে!
আপনারা রুটস সিনেমা দেখেছেন? বা বই পড়েছেন কে কে? বই না পড়েন, সিনেমা তো দেখেছেনই।
রুটস-র লেখক কে? অ্যালেক্স হ্যালি।
তো অ্যালেক্স হ্যালি কী ছিলেন?
অ্যালেক্স হ্যালির পূর্বপুরুষ কৃতদাস ছিলেন। বেয়ারা বোঝেন? কোস্টগার্ড। আমেরিকান কোস্টগার্ডের জাহাজে ক্যান্টিন বয় অর্থাৎ ওয়েটার হিসেবে He start his life।
অতএব তার ব্যাকগ্রাউন্ড খুব ভালো বোঝেন! একজন ব্ল্যাক, ওয়েটার। ঐরকম ডিগ্রি থাকলে ওয়েটারও হতেন না হয়তো, আরো কিছু হতেন। সেখানে ওয়েটার হিসেবে কাজ করলেন।
এবং কোস্ট গার্ড থেকে অনেক বছর চাকরি করে রিটায়ার করলেন।
ওয়েটার থেকে হয়তো কুক হয়েছেন। কুক থেকে সেইলার হয়েছেন, নাবিক হয়েছেন। তাছাড়া জাহাজে যারা কাজ করে তারা এমনিই নাবিক। এই হচ্ছে শুরু।
রিটায়ার করলেন।
সাদা চামড়া যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ, স্বাভাবিকভাবেই ব্ল্যাকরা ছিল নিপীড়িত!
কিন্তু যখন ওয়েটার ছিলেন, জাহাজে অফুরন্ত সময়। যারা জাহাজে ঘোরার সুযোগ হয়েছে তারা বলতে পারবেন যে, জাহাজে আসলে অফুরন্ত সময়।
কারণ ২৪ ঘণ্টাই জাহাজে থাকতে হয়। এবং জাহাজে ডিউটি আওয়ার নরমালি চার চার আট ঘণ্টা শিফট করে। বা ছয় ছয় ১২ ঘণ্টা। বাকি ১২ ঘণ্টা জাহাজে সমুদ্রে। পরিচিত কিছু লোকজন, এর বাইরে কোনো লোক নাই।
তো নিজে নিজেই লেখা শুরু করলেন এবং লিখলেন।
যেহেতু ব্ল্যাক ছিলেন, আর ওয়েটার হিসেবে জীবন শুরু… এটা তো খুব সম্মানের জীবন ছিল না।
আর আমেরিকা তো বর্ণবাদী দেশ। সাদা চামড়া যেহেতু তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তো স্বাভাবিকভাবেই ব্ল্যাকরা নিপীড়িত।
আমি আমার শিকড় খুঁজে বের করব!
তো ৬০-এর দশকে নিগ্রো মানবাধিকার নেতা ছিলেন ম্যালকম এক্স। তার সাথে দেখা হলো। তার সাথে ঘুরলেন কিছুদিন।
ঐ যে লেখার একটু বাতিক। উনি তার জীবনকথা যা বললেন, উনি ওটাকেই লিখে ফেললেন।
‘ম্যালকম এক্স’ : জীবন কথা।
এবং যেহেতু তখন নিগ্রো মানবাধিকার আন্দোলন একটা রূপ নিয়েছে এবং ম্যালকম এক্স যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হয়ে গেছেন, বইটা হিট করল। হিট করার পরে স্বাভাবিকভাবে হ্যালির অনেক সুযোগ হলো। আরো অনেক অফার আসতে লাগল।
কিন্তু উনি দেখলেন যে না, এখন যেহেতু বইটা হিট করেছে কিছু টাকা হাতে এসছে, আই উইল সার্চ মাই রুটস। যে আমি আমার শিকড় খুঁজে বের করব। আমার শিকড়টা কোথায়?
এবং শিকড় খুঁজতে শুরু করলেন। শিকড় খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে তিনি তার আদি পুরুষ, যাকে প্রথম গাম্বিয়া থেকে জোর করে ধরে নিয়ে আসা হয়েছিল, কৃতদাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল আমেরিকাতে, সেই আদিপুরুষের সন্ধান পেলেন।
রিটায়ারমেন্টের পরেও সেলিব্রেটি হওয়া যায়!
এন্ড ইট টুক টুয়েলভ ইয়ার্স।
পুরো দাসব্যবসার ইতিহাস খুঁজে বের করলেন। এবং যে জাহাজে করে তার পূর্বপুরুষকে গাম্বিয়া থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল, তার সাথে আরো ১৩৯ জন ছিল। উনি ১৪০ তম। তার পূর্বপুরুষ।
তো রুটস লিখলেন। ১৯৭৬ সালে এটা বেরুল বই হিসেবে।
বেশ কয়েক বছর পরে এটা আট খণ্ডের টিভি সিরিয়াল হলো এবং অ্যালেক্স হ্যালি সেলিব্রেটি হয়ে গেলেন।
তার জন্ম হচ্ছে ১৯২১ সালে। এবং সেলিব্রেটি হলেন যখন তার বয়স ৬০-এর ওপরে।
আসলে কাজের কোনো বয়স নাই।
যে-রকম মানে দুঃখজনক সত্য হচ্ছে যে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়, শিশুকালে মানে জন্মের প্রথম বছর এবং রিটায়ারমেন্টের প্রথম বছর।
কারণ যখন একজন রিটায়ার করেন একটা সুনির্দিষ্ট কর্মজীবন থেকে, তার আর কিছু করার থাকে না।
অ্যালেক্স হ্যালি প্রমাণ করলেন যে, না! রিটায়ারমেন্টের পরেও সেলিব্রেটি হওয়া যায়, যদি কী থাকে? যদি কাজের স্পৃহা থাকে, যদি কাজের সেই আগুন থাকে।
কাগজপত্রে তিনি ছিলেন টোবে! কিন্তু…
এবং এই যে রুটস লেখার জন্যে এই অনুসন্ধানের জন্যে, তার পূর্বপুরুষ কীভাবে এসছিল, তাকে কীভাবে আনা হয়েছিল জাহাজের খোলে বন্দি অবস্থায়, সেটাকে ফিল করার জন্যে পণ্যবাহী জাহাজে করে তিনি আফ্রিকা থেকে আমেরিকা গিয়েছেন।
এবং প্রত্যেক রাতে যখন শুতে যেতেন একেবারে তলদেশের ডেকে শুয়ে উনি ভাবতে চেষ্টা করতেন বুঝতে চেষ্টা করতেন যে, তার পূর্বপুরুষকে যখন নিয়ে আসা হয়েছিল হাত-পা বাঁধা, বমি, চিৎকার, আওয়াজ! এবং কেউ মারা যাচ্ছে, কেউ চিৎকার করছে এবং কেউ হয়তো প্রার্থনা করছে।
তার পূর্বপুরুষের নাম তিনি জানতেন টোবে। কাগজপত্রে তিনি ছিলেন টোবে।
কিন্তু খুঁজতে খুঁজতে তিনি বের করলেন যে, না। তার পূর্বপুরুষের নাম টোবে ছিল না, তার পূর্বপুরুষের নাম ছিল কুন্তাকিন্তে।
তোমার নাম যে কুন্তাকিন্তে এটা কোনোদিন ভুলো না…
কুন্তাকিন্তে ‘টোবে’ হয়ে গেল কীভাবে?
কুন্তাকিন্তেকে যখন আফ্রিকা থেকে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো, যাওয়ার পথে তার যে শিক্ষক তাকেও নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
তো জাহাজের খোল থেকে শিক্ষক মাথা বের করে কুন্তাকিন্তেকে একটি কথা বলেছিলেন যে, “কুন্তাকিন্তে! তোমার নাম যে কুন্তাকিন্তে এটা কোনোদিন ভুলো না। ইউ আর কুন্তাকিন্তে।”
কেন? আসলে সাম্রাজ্যবাদীরা শোষকরা যখন কাউকে দাস বানাতে চায়, তখন প্রথম তার পরিচয়টাকে ভুলিয়ে দিতে চায়। কারণ একজন মানুষ যখন তার পরিচয়টাকে ভুলে যায়, তখন তাকে ‘দাস’ বানানো খুব সহজ হয়।
পরিচয় মনে রাখা পর্যন্ত একজন মানুষ সহজে দাসত্ব স্বীকার করতে চায় না। এজন্যে আফ্রিকা থেকে যত মানুষকে জোর করে ধরে কৃতদাস হিসেবে আমেরিকাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের কারো আদি নামই চিহ্ন রাখা হয় নি, মুছে ফেলা হয়েছে।
তো যখন কুন্তাকিন্তেকে নতুন মালিক কাছে নিয়ে যাওয়া হলো নতুন মালিক তাকে প্রথম জিজ্ঞেস করলেন যে, তোমার নাম? কুন্তাকিন্তে বলল যে, কুন্তাকিন্তে।
বলে যে না, আজকে থেকে তোমার নাম হচ্ছে টোবে।
বলে যে না, আমি কুন্তাকিন্তে।
বলে যে না, তুমি টোবে। তারপরে তো চাবুক। চাবুকে চাবুকে রক্তাক্ত।
নির্যাতনের একপর্যায়ে সে বলল যে, হাঁ টোবে।
মুখে বলেছিল, কিন্তু অন্তরে সে তার নাম কুন্তাকিন্তেই জানত। কুন্তাকিন্তেকে সে তার মনের গভীরে সযত্নে লালন করেছে।
তার সন্তানকে বলেছে, তোমার বাবার নাম তুমি তো জানো যে এখন টোবে। কিন্তু তোমার বাবার নাম টোবে না, তোমার বাবার নাম হচ্ছে কুন্তাকিন্তে। যাকে মুক্ত আফ্রিকা থেকে শ্বেতাঙ্গরা জোর করে ধরে এনে কৃতদাস বানিয়েছে এই আমেরিকাতে।
আমি তোমাকে বলে গেলাম যে, তোমার বাবার নাম কুন্তাকিন্তে। তুমি তোমার সন্তানকে বলবে যে, তোমার দাদার নাম টোবে নয়, কুন্তাকিন্তে।
একজন মানুষ যখন তার পরিচয়কে ভুলতে না চায়, তার পরিচয় ভোলানো যায় না।
আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ক’জনের অরিজিনাল নাম পাওয়া যায়!
কিন্তু কুন্তাকিন্তের নাম কেন পাওয়া গেল?
কারণ কুন্তাকিন্তে তার নাম ভুলতে চায় নি। সে তার সন্তানকে বলেছে। তার সন্তান তার সন্তানকে, তার সন্তান তার সন্তানকে বলা অব্যাহত রেখেছে।
এই যে শিকড় খুঁজে বের করার সাহস ধৈর্য অ্যালেক্স হ্যালির ছিল, সেজন্যে তিনি বের করতে পেরেছিলেন যে, তার পূর্বপুরুষের নাম টোবে ছিল না, পূর্বপুরুষের নাম ছিল কুন্তাকিন্তে।
কোয়ান্টাম মেথড কোর্সের শুরুর দিকে কুন্তাকিন্তের ঘটনাটি গুরুজী বলতেন!
বলবেন যে, কুন্তাকিন্তে কেন এলো?
আমরা যখন আমাদের কোর্স শুরু করি, কোর্সে আমরা এই কুন্তাকিন্তের ঘটনাটা বলতাম।
এই জন্যে বলতাম যে, একটা মানুষ, একজন দাস আফ্রিকা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আমেরিকাতে, সে তার নাম ভুলতে চায় নাই।
১৭৬৭, ১৯৬৭, দু’শ বছর পরে তার নাম বেরিয়ে এলো যে না, আমার পূর্বপুরুষের নাম টোবে ছিল না, আমার পূর্বপুরুষের নাম ছিল কুন্তাকিন্তে।
কেন? সে ভুলতে চায় নাই।
আমরা আমাদের আলোচনায় বলতাম যে, একজন মানুষ তার নাম ভুলতে চায় নাই, তার নাম ভোলানো সম্ভব হয় নাই।
এবং আমরা এরকম একটা মহান জাতি, আমরা কেন আমাদের পরিচয় ভুলে যাব? যেখানে আমাদের মতন গৌরবোজ্জ্বল অতীত পৃথিবীর খুব কম জাতির রয়েছে!
“তোমার পূর্বপুরুষের নাম ছিল কুন্তাকিন্তে, সার্চ ইট, খোঁজো!”
তো অ্যালেক্স হ্যালির প্রতি আমরা শ্রদ্ধা নিবেদন করি যে, তিনি তার শিকড় খুঁজে বের করতে পেরেছিলেন।
মানুষ মারা যায়, কিন্তু স্বপ্ন বেঁচে থাকে সবসময়ই। বীর বেঁচে থাকে। কাজ বেঁচে থাকে।
কুন্তাকিন্তে মারা গেছেন, কিন্তু তার পরিচয় টিকে আছে।
কেন? স্বাধীনতার জন্যে যে ত্যাগ স্বীকার করছিলেন, নিজের নাম ভুলতে চান নাই সেজন্যে।
ডিএনএ-র মধ্যে ঐ নাম ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন যে, “অ্যালেক্স হ্যালি! তোমার পূর্বপুরুষ তার নাম টোবে ছিল না। তোমার পূর্বপুরুষের নাম ছিল কুন্তাকিন্তে। সার্চ ইট, খোঁজো!”
এবং অ্যালেক্স হ্যালি খুঁজে বের করলেন যে, আমার পূর্বপুরুষ এভাবে এসছিলেন এবং তিনি এভাবে সংগ্রাম করেছিলেন নিজের নামকে টিকিয়ে রাখার জন্যে।
[প্রজ্ঞা জালালি, ০৭ আগস্ট, ২০১৯]
