আজ মা থাকলে খুব খুশি হতেন
উটিংমং চাক
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চাক অন্যতম। এই জনগোষ্ঠীর একটি পরিবারে আমার জন্ম। নাইক্ষ্যংছড়ির মধ্যম চাক পাড়া গ্রামে আমার পরিবারের বসবাস। তিন ভাইবোনের মধ্যে আমি সবার বড়। আমার বাবা একজন জুমচাষী। দাদা-দাদি, মা-বাবা ও তিন ভাইবোনসহ আমরা একসাথে থাকতাম। অর্থের অভাবে আমার বাবা যখন আমাদের পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের খোঁজ পান। নিখরচায় আলোকিত মানুষ গড়ার এই সুযোগ পেয়ে বাবা আমাকে ভর্তি পরীক্ষার জন্যে নিয়ে আসেন এখানে। আমি এই পরীক্ষাতে মনোনীত হই। আমার বয়স তখন পাঁচ হবে।
এটা ছিল ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের কথা, তারিখটা ঠিকভাবে মনে পড়ছে না। আমি কোয়ান্টামে সূচনা শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম। আমি নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করলাম। আমরা যখন ভর্তি হই তখন খুব কম শিশুই বাংলা বুঝত ও বলতে পারত। এতে আমাদের যে-রকম অসুবিধা হতো তেমনি স্যার, ম্যাডাম আর সিস্টারদেরও অসুবিধা হয়ে যেত। তাই আমাদের সবসময় চোখে চোখে রাখা হতো।
ক্লাস ওয়ানের মজার একটি ঘটনা বলি। আমার নিচের পাটির একটা দাঁত কয়েকদিন ধরে ব্যথা করছিল। দাঁতটি পড়ে যাবে যাবে অবস্থা। তাই এক বড় ভাইয়ের কাছে গেলাম। ভাই আমার দাঁত তুলতে গিয়ে উল্টো ঠেলে গলার ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। অনেকক্ষণ কাশি দিয়েও যখন বের হলো না তখন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। তবে এতে পরবর্তী সময়ে কোনো সমস্যা হয় নি। কিন্তু সেই পড়ে যাওয়া দাঁতের জায়গায় একটা বাঁকা দাঁত উঠলে অনেকে বলতে থাকে দাঁত গিলে ফেলায় নাকি এরকম হয়েছে।
এভাবে একটা একটা করে ক্লাস পার করতে থাকি। আমি বরাবরই মাঝারি লেভেলের ছাত্র ছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমার বইপড়া ও ঘুরে বেড়াতে খুবই ভালো লাগে। তাই সুযোগ পেলেই লাইব্রেরিতে পড়তে যেতাম এবং বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতাম। একদিন হোস্টেলের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে গিয়েছিলাম আর এদিকে হোস্টেলে আমাদেরকে কোনো একটা কারণে একত্রিত করা হলো। আমি ও আরো অনেকজন কোয়ান্টা সেখানে দেরিতে উপস্থিত হই।
তখন দায়িত্বশীলেরা নিয়মের ব্যাপারে বেশ কড়া ছিলেন। আর না জানিয়ে হোস্টেলের বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিল। তাই আমি অনেক ভয় পেয়ে গেলাম এবং কোয়ান্টা ভঙ্গি (যোগাসনে যা জ্ঞানমুদ্রা হিসেবে পরিচিত) করলাম। কারণ কোনো এক বড় ভাই বলেছিলেন বিপদের সময় এই ভঙ্গি করলে নাকি প্রশান্ত থাকা যায়। ফলে পরিস্থিতি অনুকূলে চলে আসে। স্যার আমাদের কিছু বললেন না। এগুলো মনে পড়লে এখন অনেক মজা পাই।
২০১৪ সালটা আমার জন্যে কষ্টদায়ক ছিল। হঠাৎ আমার মা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার একমাস পর আমার ছোট কাকিও পরলোকগমন করেন। ক্লাস ফাইভে সমাপনী পরীক্ষায় যখন আমি এ প্লাস পাই নি, তখন মা মন খারাপ করেছিলেন। আমি মাকে কথা দিয়েছিলাম আগামী পরীক্ষাগুলোতে আমি আমার সর্বোচ্চ রেজাল্ট করব। এরপর আমি জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষা দেই। যদিও কোনো পরীক্ষাতে এ প্লাস পাই নি। এ গ্রেড পেয়েছিলাম। মায়ের ইচ্ছেটা অপূর্ণ থেকে যায়।
কিন্তু বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে আমি বরাবরই ভালো করতাম। তাই বিজ্ঞান নিয়েই ভবিষ্যতে পড়ার ইচ্ছে ছিল। এখন আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছি। আজ যদি মা বেঁচে থাকতেন, আমার এই খবর জানতে পেরে নিশ্চয়ই খুব খুশি হতেন। আমি আমার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি। প্রভুকে ধন্যবাদ।
আমার ইচ্ছে ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। রেজাল্ট ভালো না হওয়ার কারণে সে ইচ্ছে দমন করতে হয়। কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক সুজন স্যার আমাদের বলতেন যে, ‘বিজ্ঞান হলো অজানাকে জানার চেষ্টা করা আর মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটন করা।’ একবার বিজ্ঞান বিষয়ক একটা বই থেকে জানতে পারলাম—মানুষ এই মহাবিশ্বের মাত্র ৪.৬% জানতে পেরেছে। ২৪% ভাসা ভাসা আর ৭১.৪% এখনো অজানাই থেকে গেছে। তারপর থেকে স্যারের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমি এই অজানাকে জানতে চাইতাম। এজন্যে মনে সুপ্ত ইচ্ছা ছিল, আমি পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়ব। এখন এটা নিয়ে আমি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চাই।
[ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘সব সম্ভব’ বই থেকে ]
