আত্মনির্মাণের সেই সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে অন্য কেউ ধরিয়ে দেয়ার আগেই নিজের ভুল নিজে খুঁজে বের করা এবং তা সাহসের সাথে স্বীকার করা। কারণ, যে নিজের ভুল নিজেই দেখতে পায়, তার উন্নতির পথ কেউ আটকাতে পারে না। নিজেকে নির্মাণ করা, জীবনব্যাপী এক সাধনা।
মহান সাধক ও কবি মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির একটি অসাধারণ উক্তি ‚ঘষা খেতে যদি এতই দ্বিধা, তবে চকচকে হয়ে উঠবে কী করে?“ আর এই সাধনার পথে প্রতিনিয়ত নিজেকে ঘষামাজা করতে হয়, নিজের ভুলগুলোকে খুঁজে বের করতে হয় এবং সেগুলোকে সংশোধনের পথে হাঁটতে হয়।
ভুল মানেই ব্যর্থতা নয়, ভুল মানেই শেখা :
আমরা প্রায়ই —ভুল’ শব্দটাকে —ব্যর্থতা’র সাথে এক করে ফেলি। কিন্তু সফল মানুষেরা আমাদের শিখিয়েছেন, ভুল করা মানে হেরে যাওয়া নয়; ভুল করা মানে আমরা চেষ্টা করছি, আমরা কাজ করছি।
এমনকি বিজ্ঞানের জগতেও ভুলের শক্তি অপরিসীম। পেনিসিলিন, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, তার আবিষ্কার হয়েছিল কীভাবে জানেন? সম্পূর্ণ ভুল করে! বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের গবেষণাগারে একটি জার ভুল করে খোলা ছিল। সেই ভুলের কারণেই এক ধরনের ছত্রাক তৈরি হয়, যা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি থামিয়ে দেয়। একটি ভুল বদলে দিয়েছিল পুরো চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস।
সুতরাং, প্রথম আমাদেরকে মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে এখানে – ভুলকে ভয় পাওয়া নয়, ভুল থেকে শেখার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। ভুল শুধু কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়া নয়। ভুল হতে পারে- আমার দৃষ্টিভঙ্গিগত, আমার ভাবনায়, আমার সিদ্বান্ত নেয়ার পদ্ধতিতে, আমার সম্পর্কগুলো পরিচালনার ওপরে এবং এমনকি আমার লক্ষ্য নির্ধারণের মধ্যেও।
কেন আমরা ভুল স্বীকার করতে ভয় পাই? ভুল স্বীকারে বাধা কোথায়?
নিজের ভুল স্বীকার করা এত কঠিন কেন? এর পেছনে কয়েকটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।
প্রথমত, আমাদের অহমবোধ বা ইগো : আমাদের ভেতর থেকে একটি সত্তা সবসময় বলতে থাকে, ‚আমি সঠিক, আমি নির্ভুল।“ এই অহমবোধই আমাদেরকে ভুল স্বীকার করতে বাধা দেয়। ভুলকে ন্যায্য প্রমাণ করার এই চেষ্টা শয়তানের প্রবৃত্তি, আর ভুল স্বীকার করা মানবিক প্রবৃত্তি।
দ্বিতীয়ত, পারফেক্ট বা নিখুঁত সাজার প্রবণতা : বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে, আমরা সবাই চাই নিজেদের একটি নিখুঁত জীবন দেখাতে অথচ স্ক্রিনে দেখানো সেই নিঁখুত জীবনগুলো কিন্তু সাধারণত মোটেই বাস্তব নয়।
এই নিখুঁত সাজার চেষ্টা আমরা আমাদের পরিবারেও করি। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণা বলছে, যে পরিবারে বাবা-মায়েরা নিজেদের ভুল স্বীকার করেন এবং ক্ষমা চান, সেই পরিবারের সন্তানেরা আবেগীয়ভাবে অনেক বেশি সুস্থ ও স্থিতিশীল হয়। কারণ তারা শেখে, ভুল করাটা স্বাভাবিক, কিন্তু ভুল থেকে শেখাটাই আসল বীরত্ব।
তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠা লাভের পর ভুলের ব্যাপারে অসচেতন হয়ে উঠি : আমরা অনেকে জীবনে সাফল্যের বা অর্জনের প্রাপ্তিতে এত মাতোয়ারা থাকি যে তখনই আমরা ভুল করতে শুরু করি। কোয়ান্টামে আমরা বলি, সাফল্য ও খ্যাতি যত পেতে থাকব তত সচেতন থাকব ভুলের ব্যাপারে। কারণ যত ওপরে উঠব পা ফসকে গেলে নিচে পড়ে যাব ততটাই।
ছোট ভুলের বিপদ ও বড় প্রভাব – দ্য ব্রোকেন উইন্ডো থিওরি
আমরা অনেক সময় জীবনের বড় বড় ভুলের ব্যাপারে সচেতন থাকি, কিন্তু ছোট ছোট ভুল বা বিচ্যুতিগুলোকে গুরুত্ব দিই না। এখানেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় বিপদ।
মনোবিজ্ঞানে ‚ব্রোকেন উইন্ডো থিওরি“ নামে একটি তত্ত্ব আছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ফিলিপ জিমবার্ডোর (Philip Zimbardo) দেয়া একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, ধনী-গরীব যাই হোক, যে-কোনো এলাকার রাস্তায় পার্কিং করে রাখা একটি গাড়ির কেউ কোনো ক্ষতি করে নি। কিন্তু যেই মাত্র গবেষক নিজে গিয়ে গাড়িটির একটি জানালা ভেঙে দিলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই আশেপাশের বাকি গাড়ির জানালাগুলোও ভাঙচুর হয়ে গেল।
১৯৮০-৯০ দশকে নিউইয়র্কে পুলিশ কমিশনার উইলিয়াম ব্রাটন (William Bratton) ও মেয়র রুডি গিউলিয়ানি (Rudy Giuliani) এই তত্ত্ব প্রয়োগ করেন।
তারা ছোটখাটো অপরাধ যেমন : মেট্রোতে টিকিট না কাটা, রাস্তার গ্রাফিটি, ময়লা ফেলা এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। ফলাফল, পরবর্তী কয়েক বছরে বড় অপরাধ যেমন : খুন, ব্যাংক ডাকাতি, ধর্ষণ ৫০% এর বেশি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় ।
আমাদের জীবনেও এই তত্ত্বটি একইভাবে কাজ করে।
- যখন আমরা ভাবি, ‚আজ একদিন ইয়োগা না করলে কিছু হবে না“ – আমরা একটি —ব্রোকেন উইন্ডো’ তৈরি করি। যা ধীরে ধীরে আমাদের ব্যায়ামের অভ্যাসকেই নষ্ট করে দেয়।
- যখন আমরা ভাবি, ‚আজ একটু জাঙ্ক ফুড খাই“ – আমরা আরেকটি —ব্রোকেন উইন্ডো’ তৈরি করি, যা আমাদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অভ্যাসকে দুর্বল করে দেয়।
- কাজ বা পড়ার সময় ছোট্ট একটি নোটিফিকেশন চেক করাও একটি —ব্রোকেন উইন্ডো’, যা আমাদের পুরো মনোযোগের দেয়ালকে ভেঙে দেয়।
তাই সচেতন হতে হবে ছোট ছোট ভুল, খেয়ালিপনা আর উদাসীনতা থেকে। মনছবি অর্জনে একটি —ব্রোকেন উইন্ডো’ জীবনের লক্ষ্য অর্জনের উদাসীনতা আনতে পারে। ছোট ছোট এইসব বিচ্যুতির বিষয়ে আমাদের আরো সচেতন হওয়ার সুযোগ আছে।
গল্পের সেই সম্রাটের কথা মনে করুন। শিকারে গিয়ে সদলবলে খেতে বসেছেন সম্রাট। দেখা গেল, লবণ আনা হয় নি। সিপাই ঘোড়া ছুটিয়ে লবণ নিয়ে এলো। সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, ‚যার কাছ থেকে লবণ এনেছ, তাকে পয়সা দিয়েছ তো?“ উজির মৃদু হেসে বললেন, ‚বাদশাহ্ এই সামান্য একটি ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?“ সম্রাট তখন বললেন, ‚না, না, এটা হওয়া উচিত নয়। আমি যদি কারো গাছ থেকে একটি আপেল নিই, তবে দেখা যাবে আমার সঙ্গীরা পুরো গাছকে উপড়ে ফেলছে। আমি যদি সিপাইকে বলি যাও বিনামূল্যে একটি ডিম নিয়ে এসো, তাহলে সে বাড়ি গিয়ে মুরগিসুদ্ধ ধরে আনবে।“
মনে রাখতে হবে, একটি ছোট ছিদ্র বিশাল জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে। পবিত্র ধম্মপদে বলা হয়েছে, —কোনো পাপকেই ক্ষুদ্র বলে মনে করো না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাপই জমা হতে হতে মুর্খের পাপের ভাণ্ড পূর্ণ করে।’
তাই আমাদের আত্মনির্মাণের পথে এই ছোট ছোট ভুল বা খেয়ালিপনার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে।
আত্মশুদ্ধির পথ – আমাদের করণীয়
তাহলে এই ভুলের চক্র থেকে বেরিয়ে এসে আত্মনির্মাণের পথে আমরা কীভাবে হাঁটতে পারি?
১. ভুল হলে দ্রুত স্বীকার করা ও ক্ষমা চাওয়া : ‚আমি দুঃখিত“ – এই সহজ কথাটি কোনো দুর্বলতা নয়, এটি সততা ও আত্মিক স্বচ্ছতার বহিঃপ্রকাশ। নবীজী (স) আমাদের শিখিয়েছেন, ‚আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ অনুশোচনারই অংশ।“- আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা); ইবনে মাজাহ।
২. নিজের ভুলের জন্যে নিজেকে জবাবদিহি করা : নিজের ভুলের ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। যখন আমাদের কোনো ভুল হয়, তার জন্যে প্রতীকী শাস্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেমন – সাধ্যমতো মাটির ব্যাংকে কিছু দান করা। এটি আমাদের মনকে ভুলের ব্যাপারে আরো সচেতন করে তুলবে। একই সাথে, অন্যের ভুলের ব্যাপারে আমাদের হতে হবে সহানুভূতিশীল। ক্ষমা করতে হবে এবং ক্ষমা চাইতে হবে।
৩. ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া : প্রতিটি ভুলই আমাদের জন্যে একটি নতুন পাঠ। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে আমরা কিছুক্ষণ আত্ম-পর্যালোচনা করতে পারি: ‚আজ আমার কী কী ভুল হয়েছে? কীভাবে সেগুলো শোধরানো যেত?“ এই অভ্যাসটি আমাদের দিনে দিনে আরো উন্নত মানুষে পরিণত করবে।
৪. মেডিটেশন ও আত্মপর্যালোচনা করুন : মন যদি সারাক্ষণ অস্থির থাকে, তাহলে বড় ভুলও আমাদের চোখে পড়বে না। মেডিটেশন আমাদের মনকে শান্ত করে, আমাদের ভেতরের পর্যবেক্ষক সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। তখন আমরা ছোট ছোট ভুলের ব্যাপারেও নিজে থেকেই সচেতন হয়ে উঠি। মহামতি বুদ্ধ বলেছেন, ‚সব ভুল মনের কারণেই ঘটে। যদি মনের ভাবনা বদলে যায়, ভুল কি আর থাকতে পারে?“ মেডিটেশনই হলো আমাদের অশান্ত মনকে প্রশান্ত মনে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া।
