ইতিহাসে জুলাই ২৪ – বাঙালি কবি এবং অনুবাদক অরুণাচল বসু এর মৃত্যুদিন

ইতিহাসে জুলাই ২৪

বাঙালি কবি এবং অনুবাদক অরুণাচল বসু এর মৃত্যুদিন

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে আজ বছরের ২০৫তম (অধিবর্ষে ২০৬তম) দিন। এক নজরে দেখে নিই ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা, বিশিষ্টজনের জন্ম ও মৃত্যুদিনসহ আরও কিছু তথ্যাবলি।

ঘটনাবলি

১৮২৩ : চিলিতে দাসত্ব প্রথা বিলুপ্তি।
১৮৬১ : পাদ্রি জেমস লং কারারুদ্ধ হন নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের দায়ে।
১৮৭৯ : পি ডব্লিউ ফ্লিউরি কলকাতায় প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি প্রদর্শন করেন।
১৯১১ : পেরুর ষোড়শ শতকের ইনকা সভ্যতার অন্যতম প্রতীক মাচুপিচু শহর আবিষ্কার।
১৯৭৬ : ঢাকায় প্রেসিডেন্টের গার্ড রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়।

জন্ম

১৮০২ : আলেক্সাঁদ্র দ্যুমা, বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক।
১৯১১ : পান্নালাল ঘোষ, ভারতীয় বাঙালি বংশীবাদক ও সুরকার।
১৮৫৭ : হেইনরিখ পন্টোপিডান, ডেনমার্কের নোবেলজয়ী লেখক।
১৯৬৯ : জেনিফার লোপেজ, মার্কিন সংগীতশিল্পী ও অভিনেত্রী।

মৃত্যু

১৮৭০ : ঊনবিংশ শতকের সাহিত্যিক, মহাভারতের বাংলা অনুবাদক কালীপ্রসন্ন সিংহ
১৮৮৪ : প্রখ্যাত বাঙালি সাংবাদিক, বাগ্মী ও রাজনীতিক, হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদক রায়বাহাদুর কৃষ্ণদাস পাল
১৯৩৯ : বাঙালি রাজনীতিবিদ, অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী স্যার আবদুল করিম গজনভী
১৯৭৪ : নোবেল বিজয়ী ব্রিটিশ পদার্থবিদ স্যার জেমস চ্যাডউইক
১৯৭৫ : বাঙালি কবি ও অনুবাদক অরুণাচল বসু
১৯৮০ : বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক উত্তম কুমার
১৯৮৬ : নোবেলবিজয়ী মার্কিন জৈবরসায়নবিদ ফ্রিটজ লিপম্যান
২০০৯ : ভারতীয় বাঙালি সঙ্গীতশিল্পী আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়

অরুণাচল বসু

অরুণাচল বসু ছিলেন একজন বাঙালি কবি এবং অনুবাদক। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দীর্ঘদিন কবিতা, গান, ছড়া ইত্যাদি লিখেছেন। চীনা, তুর্কি, জাপানি এবং রুশ ভাষার অনেক কবিতা তিনি অনুবাদ করেছেন। প্রথম জীবনে চিত্রশিল্পী হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। এছাড়া নতুন সংস্কৃতি নামক একটি সংস্থার মূল সংগঠকও ছিলেন। ছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সহযোগী।

জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার ডোঙ্গাঘাট গ্রামে। বাবা অশ্বিনীকুমার বসু এবং মা ছিলেন বিখ্যাত লেখক ও কবি সরলা বসু।

ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি এবং লেখালেখির প্রতি সহজাত প্রতিভা ছিল। মাত্র ছয় বছর বয়েসেই কবিতা লেখায় হাতেখড়ি। একই সাথে তিনি চিত্রশিল্পী হিসেবেও বেশ পরিচিতি লাভ করেন। বেলেঘাটার দেশবন্ধু হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে বন্ধু সুকান্ত ভট্টাচার্যের সাথে দারুণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর পরেই দুজনে একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠেন। অরুণাচল বসু ছিলেন কবি সুকান্ত’র ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সুকান্তের কিশোর বাহিনী’র যশোরের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। সুকান্ত সমগ্রতে যতগুলো চিঠি আছে, তার বেশিরভাগই অরুণাচলকে লেখা। সেই চিঠি থেকে জানা যায়, সেই সময়ের যশোরের বিখ্যাত তরুণ কবিদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

অরুণাচল সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা, দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশ, সামাজিক ও সাংগঠনিক কাজেও পারদর্শী ছিলেন। সাম্যবাদ, প্রগতিশীল চেতনার কবির লেখা প্রকাশনার মধ্যে পলাশের কাল, দুরান্ত রাধা, কবি কিশোর সুকান্ত, সুকান্ত জীবন ও কাব্য, রুশদেশের কবিতা সংকলন, মা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। যশোরে বেশ কিছু সমাজসেবামূলক কাজ, কবি সম্মেলন, কিশোরদের জন্য ছড়া পাঠের আসর করেছিলেন তিনি।

অল্প বয়সে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন; প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরে আসেন পার্টির বিভাজনের কিছু পরে। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা ও আপসহীন। এমনকি জীবিকার ক্ষেত্রে যে ন্যূনতম আপস করতে হয়, তাও তিনি করেননি। তার ডায়ারি থেকে জানা যায়, তিনি বহু ধরনের জীবিকা গ্রহণ করেছিলেন; কখনও ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় প্রুফ রিডারের চাকরি, কখনও ‘সোভিয়েত দেশ’ পত্রিকা ফেরি বা কখনও লন্ড্রি চালানোর প্রচেষ্টা— সকল রকম প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি তার কবিসত্তাকে অমলিন রেখেছিলেন। তাইতো তার কলমে বেরিয়েছিল-

মেঘ না-হ’লে কি বিদ্যুৎ জমে
আকাশ কি হয় দীর্ণ—
ছিঁড়ে চলে যাবো, হোক না জীবন
কণ্টক সমাকীর্ণ।

কবিতায় যেমন ছিল গীতিময়তা বা কাব্যমাধুর্য, তেমনই ছিল দেশাত্মবোধ। কবির জীবিতকালে মাত্র দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল- ‘পলাশের কাল’ ও ‘দূরান্ত রাধা’। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পলাশের কাল’প্রসঙ্গে সমালোচনা ছিল এমন- “সুকান্তর সঙ্গী হয়েও অরুণাচলের কবিতা… সুকান্তর থেকে সুরে, শব্দে ও চিত্রে আশ্চর্য পৃথক।”

অনুবাদক হিসেবে তিনি প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। মূলত রাশিয়ান কবিতার অনুবাদ করলেও অন্যান্য দেশের কবিতাও বাদ যায়নি। প্রায় সাঁইত্রিশ বছর ধরে রচিত তার কাব্যচর্চার ফসল বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এবং পাণ্ডুলিপিতে ছড়িয়ে রয়েছে। প্রচুর গানও লিখেছিলেন তিনি। এ ছাড়াও রয়ে গেছে তার আঁকা বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রচ্ছদ আর প্রচুর ছবি। মৃত্যুর প্রায় সাতাশ বছর পরে তার রচিত কবিতা, গান ও অনুবাদ নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ‘অরুণাচল বসুর সংকলিত কবিতা’নামে। বিভিন্ন সংকলনেও তার কবিতা স্থান করে নিয়েছে। এদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো:

· হাজার বছরের প্রেমের কবিতা (১৯৬১) — সম্পাদনা : অবন্তী সান্যাল (তিনটি জাপানি কবিতার অনুবাদ)
· একালের কবিতা (১৯৬৩) — সম্পাদনা : বিষ্ণু দে (কবিতা: তুমি তো আকাশ আজ)
· প্রেমের কবিতা (১৯৬৩) — সম্পাদনা : সুকুমার ঘোষ (কবিতা: কত নীল রাত হাওয়ায় হারালো)
· মৌন মিছিল (১৯৬৬) — সম্পাদনা : সুবোধ রায়, খাদ্য আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত (কবিতা: এত জলে)
· সেরা রংমশাল (২০০৩) — সম্পাদনা : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (কবিতা: গান ও তীর)

অরুণাচলের আরেকটি পরিচয় তিনি ছিলেন সংগ্রাহক। বেশ কয়েকটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও দেশ-বিদেশের বেশ কিছু আঁকা ছবির কপি তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। তার জীবনের অন্যতম কৃতিত্ব— ‘নতুন সংস্কৃতি’(সাহিত্য ও সংগীত বিভাগ) নামক সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা। সচেতন এক মানবিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্যেই তিনি এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন। বাংলার সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে ‘নতুন সংস্কৃতি’এক ঝলক টাটকা বাতাস বয়ে নিয়ে এসেছিল ‘আধুনিক বাংলা কবিতার সংগীতরূপ’অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে। আধুনিক বাংলা কবিতার সঙ্গীতরূপ দেওয়ার ব্যাপারে তিনিই ছিলেন পথিকৃৎ। শেষ জীবনে কবি থেকে তার রূপান্তর ঘটেছিল সংগঠক হিসেবে।

সবাইকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার স্বভাবসিদ্ধ; ছোট-বড় সবার সাথেই মিশতে পারতেন বন্ধুর মতো। সমসাময়িক প্রথিতযশা কবিদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন তার বন্ধুস্থানীয়। অগণিত গুণগ্রাহীকে ফেলে রেখে সেরিব্রাল থ্রম্বোসিসে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

সূত্র: সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *