জীবনের পথে এগিয়ে চলার জন্যে আন্তরিক আগ্রহটুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাঁধাকে, বাঁধা মনে করলেই, সেটা বাঁধা।
আর বাঁধাকে যদি কেউ সিঁড়ি মনে করে, তবে সে বাঁধার উপর পা রেখে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। বাঁধাটি তখন সিঁড়ির একটি ধাপে পরিণত হয়ে যায়। আমরা কোয়ান্টামে সবসময় বাঁধাকে আমাদের প্রেরণায় রূপান্তরিত করেছি। অগ্রসর হওয়ার একটি ধাপ হিসেবে গ্রহণ করেছি বিধায়, কোন পরিস্থিতি আমাদের চলার পথে অন্তরায় হতে পারে নি। আলোকায়ন হলো নিজেকে গঠন করে নেয়ার একটি প্রোগ্রাম। এখানে এসে একটি মানুষ নিজেকে নতুন করে বিশ্বাসী করে তুলে, নতুন করে প্রশান্ত ও উজ্জীবিত হয়। মেডিটেশনের গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে নিতে পারে।
আলোকায়নের আলোচনাগুলো প্রত্যেককে নতুন করে উৎসাহিত করে, নিজের দিকে তাকানোর সুযোগ করে দেয়। নিজের ভুল ত্রুটিগুলো পর্যালোচনার আলোয়ে আসার সুযোগ পায়। আর এজন্যেই এমন বিরূপ পরিস্থিতিতেও নিজেকে বদলাতে চাওয়া মানুষগুলোর আলোকায়নে ছুটে আসা।
এ সপ্তাহের আমাদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে “স্ট্রেস: সর্বনাশা শত্রু”। দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি ছোট্ট শিশু বিরস মুখে সোফায় বসে গালে হাত দিয়ে বসেছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো বাবা কী করছো। সে বললো, টেনশন করছি। আবার জিজ্ঞেস করা হলো কেন টেনশন করছো, ক্লাস টু’র অঙ্ক যে কতো কঠিন সে তো তুমি বোঝো না। আসলে টেনশন রয়েছে প্রতিটি পেশায়, প্রত্যেক বয়সের মানুষের। টেনশন ও অস্থিরতা আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে।
পড়ালেখা শেষ করে চাকরি পাবো তো? বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে পারবো তো? কাজের মেয়ে বাড়ি গেছে ফিরবে তো? কী হতে পারতো অর্থাৎ কী হলে আরো ভালো হতো- ইস্ যদি আরেকটু ভালো বেতনের চাকরি হতো? আরেকটু ভালো জায়গায় যদি বিয়ে হতো। যদি না হয়? প্রোমোশন না হলে কী করবো, বিজনেস অর্ডারটা যদি না পাই কী হবে। এগুলো হলো টেনশন।
উৎস যা-ই হোক, স্ট্রেসের কারণ মূলত ৩টি। পণ্যদাসত্ব অলীক কল্পনা বা অবাস্তব চাওয়া নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
আসলে যা কিছু আকর্ষণীয় মনে হয় তা- ই আমরা চেয়ে ফেলি, আদৌ তা আমার জন্যে কল্যাণকর হবে কি না বোঝার চেষ্টা করি না ? ফলে কেউ পেয়ে অশান্তিতে ভুগি, কেউ না পেয়ে। পণ্য আরাম দিতে পারে, কিন্তু প্রশান্তি দিতে পারে না। টাকা দিয়ে বিছানা কেনা যায়, ঘুম নয়। টাকা দিয়ে খাবার কেনা যায় কিন্তু ক্ষুধা বা খেতে পারার সামর্থ্যকে নয়। টাকা দিয়ে মস্ত বড় প্রাসাদ কেনা যায়, কিন্তু শান্ত-সুখের নীড় নয়। পণ্যের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সবকিছুকেই যদি পণ্য বানিয়ে ফেলি, অর্থাৎ যদি ব্যালেন্স করতে না পারি, যদি জীবনে পরিমিতি না থাকে, তাহলে সীমালঙ্ঘনের শাস্তি তো হবেই।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, খাও, পান কর কিন্তু অতিরিক্ত করো না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ আমেরিকা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫% মানুষ ভোগ করে পৃথিবীর মোট সম্পদের ৫৫%। অথচ সেখানে ট্রাঙ্কুলাইজার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। আসলে তাদের কেনার সামর্থ্য বেশি, যে কারণে তাদের অভাববোধও বেশি এবং টেনশনও বেশি। কেননা- চাওয়া > পাওয়া >অতৃপ্তি > টেনশন -আমরা অধিকাংশ মানুষ অলীক কল্পনা বা ফ্যান্টাসির জগতে বসবাস করি। এ অবাস্তব ধারণা তৈরিতে সাহায্য করছে স্যাটেলাইট বা মিডিয়া, টিভি, সিনেমা বা নতুন সংযোজন মোবাইল। মিডিয়া আমাদের এমন একটা জগতের ধারণা দিচ্ছে যেখানে যত ইচ্ছা খাও, দাও, স্ফূর্তি করো। জীবনটাকে উপভোগ করো। এগুলো দেখে দেখে আমরা অবাস্তব কল্পনায় হারিয়ে যাই। আসলে সিনেমার রূপালী পর্দা এবং বাস্তবতা এক জিনিস নয়।
সিনেমার রূপালী পর্দা দেখে আমরা অবচেতন মনে যা চাই অনেক সময় সচেতন মন তাতে সায় দেয় না। কিন্তু অবচেতন মন তাতে বিশ্বাস করে না। সে ক্রমাগত ঐ চাওয়াগুলো পূরণ করার জন্যে অস্থির করে তোলে। এভাবেই সৃষ্টি হয় টেনশন । অর্থাৎ চাওয়া > না পাওয়া > হতাশা > টেনশন -পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ ম্যাথু রিচার্ড বলেন, আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত যা ঘটে চলেছে তা কিন্তু আমাদের দুঃখের কারণ নয়, বরং এসব ঘটনায় আমরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি তাই আমাদের দুঃখের কারণ। স্ট্রেসের কারণ ঘটনা নয়, ঘটনার প্রেক্ষিতে সৃষ্ট মানসিক প্রতিক্রিয়া। আমাদের টেনশন, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা ও অশান্তির প্রথম কারণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।
সবসময় আমরা চিন্তা শুরু করি, কী আমার নেই। না শুকরিয়া আসে প্রতিযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে – অন্যের সাথে নিজের তুলনা থেকে। আমেরিকাতে স্ট্রেস বা টেনশনের ওপর প্রচুর গবেষণা হয়েছে। ৩০ বছর ধরে এসব গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রফেসর ডা. হার্ভার্ড বেনসন। ছোট ছোট রক্তক্ষরণ থেকে যেমন মৃত্যুও হতে পারে তেমনি ছোটখাটো স্ট্রেসগুলোই যদি সবসময় আপনাকে ভারাক্রান্ত করতে থাকে, আপনি মারাত্মক শারীরিক এবং মানসিক অসুখের শিকার হতে পারেন।
গবেষণার রিপোর্টে টেনশনের ফলে সৃষ্ট রোগের দীর্ঘ তালিকা- হৃদরোগ, মাইগ্রেন, ডায়াবেটিস, অনিদ্রা, নার্ভাসনেস, মিসক্যারেজ, ভয়-আতঙ্ক, বুকে ব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদ, স্কিন প্রবলেম, মনোযোগের সমস্যা, পেটের পীড়া, গ্যাস্ট্রিক, আমাশয়, অবর্ণনীয় ব্যথা, আইবিএস, ওজন হ্রাস/ বৃদ্ধি, পিঠে ব্যথা, ক্যান্সার, বিষণ্ণতা-অবসাদ, হাত-পায়ের তালু ঘামা, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া প্রভৃতি। জীবন যতদিন আছে, ততদিন আছে জীবনের কাজ, ব্যস্ততা, সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতন, সমস্যা-সম্ভাবনা সবকিছুই।
এ সবকিছুর মধ্যেই আপনি লাভ করতে পারেন স্ট্রেসমুক্ত এক প্রশান্ত-তৃপ্ত-পরিপূর্ণ জীবন। কীভাবে? যদি -আপনার যা আছে, যতটুকুই আছে তা নিয়েই শোকরগোজার হোন। আর উপলব্ধি করুন যে অনেক অর্থ, অনেক উপকরণ খ্যাতি বা প্রতিপত্তি মানেই প্রশান্তি নয় সুখ নয়, পরিতৃপ্তি নয়। ‘হ্যাপিনেস লেসন্স ফ্রম নিউ সায়েন্স’ বইতে অর্থনীতিবিদ লেয়ার্ড বলেছেন একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের পর কেউ যদি অতিরিক্ত উপার্জনও করে, সে উপার্জন তাকে বাড়তি সুখ দেয় না। তাহলে যে বাড়তি অর্জনের জন্যে আপনার এত টেনশন এত হাঙ্গামা, তার শেষ ফলাফল কী? আসলে যতক্ষণ দম আছে ততক্ষণই জীবন। -কোনোকিছু নিয়ে শুরুতেই খারাপ না ভেবে ভালো কী আছে তা নিয়ে ভাবুন।
প্রতিকূলতাকে সমস্যা নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখুন। যেমন ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেছেন। বিরক্ত না হয়ে বা টেনশন না করে মনে মনে দিনের কাজগুলোকে গুছিয়ে নিন বা সঙ্গীর সাথে গল্প করুন অথবা চোখ বন্ধ করে কিছু্ক্ষণের জন্যে হারিয়ে যান মেডিটেশনের গভীর তন্ময়তায়। শুধু কাজ বা শুধু অর্থ উপার্জন নিয়ে মেতে থাকলে জীবনটা একসময় আপনার জন্যে ক্লান্তিকর বোঝায় রূপান্তরিত হবে।
সুপারম্যানখ্যাত হলিউড তারকা ক্রিস্টোফার রিভ। দুনিয়া তোলপাড় করা বক্স অফিস হিট মুভি সুপারম্যানের নাম ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি পরিণত হয়েছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে। কিন্তু ১৯৯৫ সালে একটি দুর্ঘটনায় তিনি প্যারালাইজড হয়ে যান এবং ২০০৪ সালে ৫২ বছর বয়সে তিনি মারা যান। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলছিলেন- মাত্র ২৪ বছর বয়সেই আমি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার উপার্জন করতে শুরু করি। আমি ভেবেছিলাম এটাই সাফল্য। আমি আমার পরিবারকে অবহেলা করতে শুরু করলাম, হয়ে গেলাম ঘোরতর বৈষয়িক এক আত্মকেন্দ্রিক মানুষে। ১৯৯৫ সালে দুর্ঘটনাটার পর থেকে আমার উপলব্ধিতে এলো এক বিরাট পরিবর্তন। বৈষয়িক এসব অর্জনে আসলে কিছুই যায় আসে না। আমার কাছে সাফল্য মানে শুধু নিজের ভালো করা নয়, সাফল্য মানে অন্যের জন্যেও ভালোটা করতে পারা। সাফল্য মানে নিজের সামর্থ্যের সবটাই কল্যাণ সাধনে উজাড় করে দিতে পারা।
তাই পরিবারকে সময় দিন। বন্ধু-আত্মীয়-প্রতিবেশীর খোঁজখবর নিন, সৃষ্টির সেবার কাজে ব্যয় করুন অর্থ-সময় ও শ্রম। একজন মানুষ মেডিটেশন নিয়মিত করলে তার পক্ষে শোকরগোজার থাকা, নিজের আবেগের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে আনা এবং ইতিবাচক হওয়া সম্ভব হয়। এছাড়া মেডিটেশন দেহের পেশি ও স্নায়ুকে শিথিল করে ফলে স্ট্রেসের কারণে যে উত্তেজিত অবস্থা তৈরি হয় তা থেকে পেশি ও স্নায়ু মুক্তি পায়। এজন্যে দেখা যায় কোর্সে এসে মানুষ প্রাণ খুলে হাসছেন। দীর্ঘদিন পর আরামে ঘুমাচ্ছেন। মেডিটেশনের প্রাথমিক প্রাপ্তিই প্রশান্তি।
আলো এবং অন্ধকার যেমন একসাথে থাকতে পারে না ঠিক তেমনি মেডিটেশন এবং টেনশন কখনো একসাথে অবস্থান করতে পারে না। এদের অবস্থান হচ্ছে পরস্পর বিপরীতমুখী। এ প্রসঙ্গে নবীজীর হাদিসটি প্রণিধানযোগ্য। তোমরা উত্তেজিত অবস্থায় দাঁড়ানো থাকলে বসে পড়ো, বসা থাকলে শুয়ে পড়ো। মেডিটেশনে আমরা বৈজ্ঞানিকভাবে উত্তেজিত প্রতিটি কোষকে শুইয়ে দেই। ফলে ক্ষতিকর আবেগ শরীরে অবস্থান করতে পারে না। বিশিষ্ট গবেষক ডা. রিচার্ড ডেভিডসন গবেষণা করে দেখেছেন যে, যেসব মানুষ নেতিবাচক চিন্তা ও দুশ্চিন্তায় অভ্যস্ত তাদের ব্রেনের ডানদিকের প্রি-ফ্রনটাল করটেক্স বেশি কাজ করে। যারা বেশি উদ্যমী, আগ্রহী, সুখী, আত্মতৃপ্ত তাদের বামদিকের প্রি- ফ্রনটাল করটেক্স বেশি কাজ করে।
মেডিটেশন ব্রেনের কাজকে ডানদিকের এই দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, নেতিচিন্তা থেকে সরিয়ে বাম দিকের ইতিবাচক, সুখী, আত্মবিশ্বাস, উদ্যমী অংশে নিয়ে যায়। এ থেকে প্রমাণিত হয় মেডিটেশন মানুষকে দুশ্চিন্তার পরিবর্তে প্রশান্ত, আত্মতৃপ্ত, সুখী ও সুচিন্তায় অভ্যস্ত করে তোলে। বর্তমান সময়ে আলোচিত পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ ম্যাথু রিকার্ড ৩৫ বছর ধরে মেডিটেশন চর্চা করছেন।
গবেষণাকালে ২৫৬টি ইলেকট্রোড দিয়ে বিজ্ঞানীরা তার পুরো মাথাটাকে মুড়িয়ে ফেলেছিলেন। সীমাহীন উৎসাহ নিয়ে তারা রিকার্ডের ব্রেনের ওপর মেডিটেশনের প্রভাব অনুসন্ধান করতে থাকেন। গবেষণায় যা বেড়িয়ে এসেছে তা চমকপ্রদ। তার ব্রেনের বামদিকের প্রি-ফন্টাল করটেক্স অত্যন্ত সুতীক্ষ্ণ। তাই আসুন, মেডিটেশন করুন, কোয়ান্টাম মেথড কোর্সে অংশ নিন। সমস্যার জট উপড়ে ফেলুন। আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে এক মহিমান্বিত সফল জীবন।
