কাজ করুন শ্রমানন্দে

 জীবন যখন আছে, কাজও আছে। যতদিন জীবন যাপন করব ততদিন আমাদের কাজ করতে হবে। এই কাজ আমরা করবো হতাশা নিয়ে না আশা নিয়ে, কষ্ট নিয়ে না আনন্দ নিয়ে ।

 কাজ বলতে আমরা কী বুঝি? আমাদের চাকরি-বাকরি, ব্যবসা, অধ্যাপনা, ওকালতি-ইত্যাদি।  কাজ আপনার আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যাপনের মাধ্যম। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধোয়া, দাঁত ব্রাশ থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাবার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের প্রতিটি বিষয়ই কাজ। বাসার প্রতিটি বিষয় আমাদের কাজ, বাইরের প্রতিটি চলাচলে আমাদের কাজ, আবার আমাদের যদি কোনো ভালোবাসার বিষয় বা কোন সাংগঠনিক সংযুক্তি থাকে তা-ও আমাদের কাজ।

এখন আমরা বলছি কাজ করব শ্রমানন্দে। আপনি বলবেন ‘শ্রমানন্দ’ শব্দটি তো আগে কোথাও শুনি নি।   শ্রম + আনন্দ = শ্রমানন্দ।  কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নিতে হবে। কাজের সাথে ক্লান্তির প্রচলিত যে ধারণা সেটাকে আমরা ভেঙে ফেলেছি। আর এর প্রভাব এবং ফলাফল অত্যন্ত ব্যাপক। আসলে কাজের মধ্যে আনন্দ নিয়ে আসতে পারলে আপনার কাজের রেজাল্ট অবশ্যই অসাধারণ হবে। আপনার প্রাপ্তি হবে আকাশচুম্বী। কেন এবং কীভাবে ?

পবিত্র কোরআনের সূরা বালাদের ৪নং আয়াতে বলা হয়েছে-নিশ্চয়ই আমি মানুষকে কষ্ট ও পরিশ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি করেছি। তার মানে সৃষ্টিকর্তা চাচ্ছেন আমরা পরিশ্রম করি, কষ্ট করি। কারণ তিনি জানেন যে মানুষ পরিশ্রম করলে, কাজ করলেই ভালো থাকবে।

তারপরেও আমরা অনেকে কাজকে কষ্ট মনে করি, ভাবি কাজ না করে থাকতে পারলে কতই না ভালো লাগত। সেই যুবকটির কথা মনে আছে তো? সেই পাঠান যুবক। যে শুধু মাছ ধরতো, সারাদিন পুকুরের পাশে বসে মাছ ধরা ছাড়া তার আর কোনো কাজ ছিল না। কখনো বসে বা কখনো পুকুরের পাশে কাপড় বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে সে মাছ ধরত। ঘর আর পুকুর এই ছিল তার যাওয়া-আসার ক্ষেত্র। যেমন আমাদের অনেক তরুণ-তরুণী শিক্ষার্থীর এখন মোবাইলের একটি জগত সৃষ্টি হয়েছে। মোবাইল থেকে মুখ তুলে কিছু প্রয়োজনীয় কাজ আবার মোবাইল। স্মার্টফোনের জগতেই তাদের সারাক্ষণ বিচরণ। কিছু বলতে গেলে আত্মহত্যার হুমকি।

যা-ই হোক, সেই যুবককে মুরুব্বিরা নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। একদিন সে মাছের বড়শি ফেলে চাদরে শুয়ে আছে। কয়েকজন মিলে তাকে ধরল। এই শোনো, তোমাকে কাজ করতে হবে। এভাবে শুয়ে বসে কাটালে জীবনে কিচ্ছু হবে না। পড়াশোনা করো। সে বলল-পড়াশোনা করে কী হবে? মুরুব্বিরা বললেন-সার্টিফিকেট পাবে। তা দিয়ে কী হবে? চাকরি-বাকরি করবে। চাকরি-বাকরি করে কী হবে? টাকা-পয়সা আয় করবে, তারপরে বিয়েশাদি করবে। তারপর কী হবে? সম্পদ, সুখ, তারপর শান্তি। একসময় বসে বসে খাবে। যুবক ততক্ষণে সোজা হয়ে বসেছিল। তারপর আবার গা এলিয়ে দিয়ে বলল-তাহলে এখন কী করছি, এখনো তো বসে বসেই খাচ্ছি, শান্তিতে আছি, ভালো আছি।

আসলে এই শান্তি, এই ভালো থাকা, এটা ভালো থাকা নয়। এই কর্মহীন জীবনযাপন একসময় চরম হতাশা ও শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় নিমজ্জিত করে দেয়। বিশ্রাম আমাদের প্রয়োজন, কিন্তু তা-ও যথাযথভাবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিশ্রাম বা ছুটি কিন্তু আমাদের সুস্থতার জন্যে সহায়ক না-ও হতে পারে । চলুন সাম্প্রতিক একটি গবেষণা রিপোর্ট দেখি।

সম্প্রতি একটি গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, হার্ট এ্যাটাকের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি থাকে সাপ্তাহিক ছুটির পরের দিন। সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট হেলথ এন্ড সোশ্যাল কেয়ার ট্রাস্ট এবং রয়্যাল কলেজ অব সার্জন-এর চিকিৎসকেরা একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন। এতে তারা দেখতে পান যে, সোমবার মানে ঐসব দেশে সাপ্তাহিক ছুটির পরের দিন হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকি ১৩% বেশি থাকে।

১৫০০০ রোগীর ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়। ‘সেগমেন্ট এলিভেশন মায়োকর্ডিয়াল ইনফার্কশন’ বা এসটিইএমআই যখন হয় তখন শরীরের একটি প্রধান করোনারি ধমনী পুরোপুরি ব্লক হয়ে যায়। কার্ডিওলজিস্ট জ্যাক লাফান বলেন, আমরা সপ্তাহের প্রথম দিনের সঙ্গে এসটিইএমআই-এর শক্তিশালী যোগাযোগ খুঁজে পেয়েছি। সোমবার এভাবে হার্ট এ্যাটাক বেশি হওয়ার ঘটনাকে গবেষকরা ‘ব্যাড মানডে ফেনোমেনন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনার কোনো কারণ তারা এখনো ব্যাখ্যা করতে পারেন নি।

এই রিপোর্ট দিয়ে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন? আসলে আমাদেরও ব্যাখ্যা করার তেমন কিছুই নেই। শুধু একটি কথা-এই মানুষগুলো যদি সপ্তাহে ঐ দুদিন একটানা ছুটি না কাটিয়ে কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তাহলেও কি তারা সোমবারে হার্ট এ্যাটাকের মুখোমুখি হতেন? সাধারণভাবে আমরা উত্তর দিতে পারি- হয়তো না। আসলে আমরা যা বলতে চাচ্ছি সেটা হচ্ছে শ্রমের সাথে, কাজের সাথে অবশ্যই সুস্থতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্রাম বা ছুটির সাথে সুস্থতার যতটুকু সম্পর্ক রয়েছে তার চাইতে অনেক বেশি।

সেবা বলুন বা কাজ বলুন, তা যখন আনন্দময় হবে, সেই সেবা ও কর্ম আপনাকে অমর করে রাখবে। যেমন রেখেছে আমাদের এই প্রিয় দুজন মানুষকে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখালেখির বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। এরপরেও অসুস্থ অবস্থায় তিনি দীর্ঘ ৩৪ বছর বেঁচেছিলেন। এখন ভাবুন কতটা লেখালেখির আনন্দে ডুবে থাকলে মাত্র ২৩ বছরের ৪০০০ এরও বেশি গান, অসংখ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ তিনি রচনা করেছিলেন। যতদিন সক্রিয় ছিলেন, হাসি আনন্দে কাজে কাটিয়েছেন। কারণ কাজটাকে তিনি ভালোবাসতেন। যথেষ্ট পরিমাণ পান, চা আর হারমোনিয়াম দিয়ে বসিয়ে দিলেই তিনি একটার পর একটা গান রচনা করে ফেলতে পারতেন। তিনি কি টাকার জন্যে লিখতেন? মোটেই না। আনন্দের সাথে লিখতেন, আনন্দের জন্যে লিখতেন। তাই তো তিনি তার কাজের মধ্য দিয়ে অমর হয়ে আছেন আমাদের মাঝে।

আবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা ভাবুন। দীর্ঘজীবনে তার সাধনাও ছিল লেখালেখি। তার দৈনন্দিন রুটিনটা যদি দেখেন তো ভালো লাগবে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি ধ্যান করতেন। তারপরে লেখালেখির শুরু। ভোর সাতটার আগেই মোটামুটি ঘণ্ট তিনেকের লেখা শেষ। তারপরে সারাদিনের ব্যস্ততা, লেখালেখি তো চলতো মধ্যরাত পর্যন্ত। তার বিশাল সৃষ্টিভাণ্ডারের ভেতরে ডুব দিলে কুল কিনারা পাওয়া যায় না। কেন তিনি পেরেছিলেন এভাবে লিখতে। কারণ, তিনিও তার কাজকে ভালোবাসতেন। আনন্দের সাথে কাজটি করতেন বলে তিনি তার কাজের মধ্য দিয়ে অমর হয়ে আছেন।

বলতে পারেন, কাজে আনন্দ পাবো কি। কাজ করার পরিবেশই তো নেই। কিংবা কাজ করার সুযোগই তো নেই। আমাদের অনেকেরই এই অভিযোগটি থাকে। আসলে সুযোগ করে নিতে হয়। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু। বাংলার তথা বিশ্বের একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী যিনি রেডিও তথা যোগাযোগের মাধ্যম আবিস্কার করেন। আগে আমরা জানতাম রেডিও আবিষ্কার করেন মার্কনি। কিন্তু এখন বিশ্বের সবাই জানেন যে মার্কনির রেডিও আবিষ্কারের এক বছর পূর্বেই জগদীশ চন্দ্র বসু বিনা তারের যোগাযোগের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। আবার আমরা অনেকেই জানি না যে বর্তমান ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি আবিষ্কারেও জগদীশ চন্দ্র বসুর তত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার আবিষ্কৃত তারহীন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে রেডিও, টেলিভিশন এমনকি রাডারেও। তার সাধনার জীবনটি ছিল প্রচণ্ড সংগ্রামের।

পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগ দিলেও তাকে বেতন দেয়া হয় বৃটিশ অধ্যাপকদের অর্ধেকেরও কম। তিনি অধ্যাপনা চালিয়ে গেলেন কিন্তু কম বেতন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। কাজই ছিল তার প্রতিবাদের ভাষা। আর গবেষণা। কলেজের গবেষণাগারে তার জায়গা হয় নি কারণ তিনি বাঙালি। অবশেষে প্রেসিডেন্সি কলেজে শৌচাগারের পাশে মাত্র ২৪ বর্গফুটের ছোট্ট একটি ঘরে তার গবেষণাগার স্থাপিত হলো। গবেষণার সকল যন্ত্রপাতি কিন্তু তিনি নিজেই ডিজাইন করতেন এবং স্থানীয় মিস্ত্রিদের দিয়ে বানিয়ে নিতেন। দীর্ঘ ৩৩ বছর গবেষণা করে গাছেরও যে প্রাণ আছে-এই বিষয়টি তিনিই প্রথম আবিস্কার করেন। তিনি নিরলস গবেষণা করে আবিষ্কার করেছিলেন শতাধিক যন্ত্র।

এভাবেই কাজের মধ্যে ডুবে যেতে পারলে, কাজকে ভালোবাসলে কাজের পরিবেশ নিজেই সৃষ্টি করে নেয়া সম্ভব। বিনা বেতনে অধ্যাপনা করা এবং একইসাথে গবেষণাকর্ম চালিয়ে নেয়া বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে। বেগম রোকেয়ার কথা ভাবুন। আজকে প্রতিটি মেয়ে তার কাছে ঋণী। মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে তার পরিশ্রম অনস্বীকার্য।

কাজের প্রতি ভালোবাসাটা কেমন হওয়া উচিত? কতটুকু হওয়া উচিত? আসলে অন্তরটা ঢেলে দিতে হবে। আর অন্তরটা ঢেলে দিতে পারলেই সেই কাজ আমাদের জন্যে আনন্দের হবে, কল্যাণকর হবে। একটি গল্প শুনি।

এক মসজিদে মাহফিল হবে। স্বাভাবিকভাবেই মাহফিলের কথা শুনে আশপাশের কয়েকটি গ্রামে সাজ সাজ রব। আমাদের গ্রামে গঞ্জে এখনো মাহফিলের কথা শুনে লোকজন জেগে ওঠে। রাত জেগে মাহফিল শোনে। আসলে মানুষ ভালো কথা শুনতে চায়। ভালো হতে চায়, ভালো থাকতে চায়। যা-ই হোক, লোকজন সব একত্র হলো। খুব ভালো মাহফিল হলো। বক্তা তার আলোচনা দিয়ে সবাইকে বেশ অনুপ্রাণিত করলেন। পার্শ্ববর্তী গ্রামের একজন লোক নানা কারণে সেই মাহফিলে আসতে পারে নি। মন খুব খারাপ। সে পরদিন সেই মসজিদে এলো যে কারো কাছ থেকে মাহফিলের আলোচনাটা যদি কিছুটা শুনে নেয়া যায়। তো ঢুকেই একজন লোকের সাথে দেখা হয়ে গেল। সফেদ দাড়ি, সুন্দর চেহারা। দেখেই তো সে তাকে ধরল। ভাই কাল কি আপনি সেই মাহফিলে ছিলেন? ছিলাম তো-বললেন ভদ্রলোক। তাহলে আমাকে একটু বলবেন কি সেখানে কি আলোচনা হয়েছিল। আমি থাকতে পারি নি। ভদ্রলোক তাকে নিয়ে একটি গাছের ছায়ায় বসলেন। তারপরে অনেক সময় নিয়ে মাহফিলের আদ্যোপান্ত সব আলোচনা শুনিয়ে দিলেন। বললেন-এই ছিল সমস্ত আলোচনা। শুনে সেই লোকটি তো খুব খুশি। আহা! এত সুন্দর করে এত সময় নিয়ে আপনি সব শুনিয়ে দিলেন যেন মনে হলো আমি সেই মাহফিলেই আছি। আপনার পরিচয়টা একটু বলবেন কি?

ভদ্রলোক বললেন-আমিই গতকালের মাহফিলের মূল আলোচক। শুনে তো সেই লোক লাফিয়ে উঠলেন-হুজুর মাফ করবেন, আপনি এত সময় নিয়ে আমাকে এভাবে সব শোনালেন, আপনার তো কষ্ট হলো, মূল্যবান সময়ও নষ্ট হলো। হুজুর হেসে বললেন-মোটেও কষ্ট হয় নি। বরং আনন্দ পেয়েছি। আসলে যার সন্তুষ্টির জন্যে গতকাল কথা বলেছি, আজকেও তাঁর সন্তুষ্টির জন্যেই বলেছি। আমার কাজই তো মানুষকে ভালো কথা শোনানো। সেখানে আমার কাছে ৫০০ মানুষ যা, একজন মানুষও তা-ই। আমাকে তো আমার পুরোটাই দিতে হবে, নাহলে আমার কাজ সঠিক হবে না। প্রভুর সন্তুষ্টির জন্যে কাজ করা হবে।

আসলে এভাবেই আমাদের নিজেদের কাজটি পূর্ণমাত্রায় করতে হবে। আমার কাজ যদি আমি ফেলে রাখি বা অবহেলা নিয়ে করি তাহলে সময়ের কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।

শ্রমানন্দে কাজ করার সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ কোয়ান্টামের সর্বস্তরের কর্মীবৃন্দ। একজন কোয়ান্টিয়ার থেকে শুরু করে কোয়ান্টামের সকল কমীবৃন্দ কী পরিমাণ আনন্দ নিয়ে কাজ করেন তা আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি। আমরা যারা এখনো কোয়ান্টিয়ার হিসেবে কোনো কাজ করি নি, তারা আমাদের কোয়ান্টিয়ারদের সাথে কাজ করে দেখতে পারেন কাজের সাথে আনন্দ কীভাবে সংযুক্ত হয়ে আছে। এই শ্রমানন্দে কাজ করার কারণেই কোয়ান্টাম আজ একটি অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। সেবার ক্ষেত্রে, সাধনার ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে-প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোয়ান্টাম তার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। আপনারা জানেন যে, কোয়ান্টামের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দেশের ১২৮টি স্কুলে টোটাল ফিটনেস প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। আমরা আশা করছি সেদিন খুব দূরে নয়, মেডিটেশন দেশের সবগুলো স্কুলে চালু হয়ে যাবে। নিজেদের দোয়ায়, প্রার্থনায়, শুভকামনায় এই বিষয়টি আমরা রাখতে চাই।

আসলে লক্ষ্য অনুসারে কর্মধারা পরিচালিত হয়। কাজের আগে মাইন্ড সেট করতে হবে। মন সাজানো হয়ে গেলে কাজটি সুন্দর হবে। তখন দেখবেন কাজের মধ্যে আউলাঝাউলা হচ্ছে না। সুন্দর ছন্দে সব কাজ হচ্ছে। আমরা যাকে মনছবি বলি তা হচ্ছে মন সাজানো লক্ষ্য। এজন্যেই গভীর নিমগ্ন হয়ে দেখা মনছবি বাস্তবায়িত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আজকে শ্রদ্ধেয় গুরুজীর কাছ থেকে আমরা মনছবির ব্যাপারে শুনব।

এ পর্যায়ে একটি অনুরোধ করি সবাইকে। যদি মন সাজাতে চান, তাহলে অবশ্যই সাহায্য নিতে হবে মেডিটেশনের। নিয়মিত মেডিটেশন করুন। আমরা অনেক সময় বলি আমাদের সময় নেই। মেডিটেশন করতে পারি নি। কাজে ব্যস্ত ছিলাম, জরুরি কাজ ছিল, ছেলেমেয়ের ঝামেলা ছিল, রান্না বান্নার দায়িত্ব ছিল, ঠিকমতো ঘুমানোরই সময় পাই নি তো মেডিটেশন করবো কখন। ওটা যার ফ্রি সময় আছে সে করবে। আসলে এখানেই আমাদের ভুলটি হয়ে যায়। মেডিটেশন কী করে? ধরুন সকালের মেডিটেশন। আপনি ৩০ মিনিট মেডিটেশনে বসে সারা দিনের কাজগুলোকে গুছিয়ে নিলেন। সময় ঠিক করে নিলেন। তাহলে কী হলো, কাজগুলোর ও কাজের সময়ের সাথে আপনার মানসিক একাত্মতা সৃষ্টি হয়ে গেল। যে কাজ সাধারণভাবে দুই ঘণ্টা লাগত, দেখা যাবে তা আপনি এক ঘণ্টায় শেষ করে ফেলতে পারছেন। কিংবা যে কাজে একটা ঝামেলা সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল, তা ঝামেলাহীনভাবে সহজেই সম্পন্ন হয়ে গেল। আপনি কিন্তু কাজের স্ট্রেস থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবেন। আবার রাতে ঘুমানোর আগে ৩০ মিনিটের মেডিটেশন আপনাকে সারাদিনের কাজের যাবতীয় স্ট্রেস, টেনশন থেকে আপনাকে মুক্ত করে আপনার শরীর-মনকে সুস্থ রাখার ব্যাপারে সহায়তা করবে। ফলে অনেক কাজ করেও আপনি কিন্তু কর্মক্লান্তিতে আক্রান্ত হবেন না। আনন্দ আপনাকে সবসময় ঘিরে রাখবে।

আর প্রতিজ্ঞা থাকবে যেন প্রতিটি কাজ আমরা সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারি। প্রতিদিন আমরা ১০০ বার এই অটোসাজেশনটি চর্চা করতে পারি। দাঁত ব্রাশ থেকে শুরু করে চুল আঁচড়ানো, খাবার গ্রহণ ইত্যাদি প্রতিটি কাজে মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে। তখন কাজের সাথে চিত্ত হবে একাত্ত।

আসলে কাজের সাথে চিত্তকে একাত্ত করতে পারলে প্রতিটি কাজই হয়ে উঠবে আমাদের আনন্দের উৎস। এজন্যে প্রয়োজন মনোযোগ। কাজের প্রতি পরিপূর্ণ মনোযোগ আমাদেরকে কাজের আনন্দে একাত্ম করবে। শ্রমানন্দের ভাবনা আমাদের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। তখন নিন্দা বা প্রশংসা কোনো কিছুই আমাদের কাজকে প্রভাবিত করতে পারবে না। সফলতা আমাদের পদচুম্বন করবে।