এই যুগে খাবার-দাবার নিয়ে ডায়েটিং প্রেসক্রিপশনের অভাব নেই। এতসব কিছুর মধ্যে কোনটা যে অনুসরণ করব তা ভেবে বিভ্রান্ত হই।
ডায়েটিং প্রেসক্রিপশনের বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির উপায় কী?
বিষয়টা খুব সহজ এবং সাধারণ। সবসময় সুপাচ্য সহজ খাবার গ্রহণ করবেন। অতিরিক্ত মশলা, তেল, ঝাল ও ভাজাপোড়া বর্জন করবেন। খাবারের ব্যাপারে তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কী খাবেন? দ্বিতীয়ত, কতটা খাবেন; তৃতীয়ত, কখন খাবেন?
কী খাবেন? যা কিছু আপনার ধর্মবিশ্বাস ও রুচি অনুমোদন করে, তা সবই খাবেন। তবে রাজসিক-তামসিক খাবারের প্রতি আসক্তি বর্জন করুন। প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যসম্মত খাবারই বিজ্ঞানসম্মত খাবার। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় মাছ ও গোশতের পরিমাণ সীমিত রাখুন। সপ্তাহে দুই দিন শুধু নিরামিষ খান।
গোশত মাসে চার দিনে অর্থাৎ সপ্তাহে একদিনে সীমিত রাখুন। করলা বাঁধাকপি লাল শাক সজনেসহ মৌসুমি ও আঁশজাতীয় সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে খান। পুষ্টিগুণ বজায় রাখতে মাড়সহ ভাত রান্না করুন। শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে তারপর কাটুন। আধা সেদ্ধ শাকসবজি সহজে হজম হয়। সামুদ্রিক মাছ খান। মসুরি মুগ মাশ বুট মটর অড়হরসহ যে-কোনো ডাল প্রতিদিনের খাবারে পরিমিত রাখুন। রাতে মসুর ডাল না খাওয়া ভালো। ঘন ডালের চেয়ে পাতলা ডালে উপকার বেশি।
নিয়মিত মাশরুম খান। প্রোটিন, খনিজ উপাদান ও ভিটামিন বি-১ সমৃদ্ধ এ খাবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হৃদরোগ ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি কমায়। শীতকালে নিয়মিত টমেটো ব্রোকলি গাজর ও পালং শাক খান। গরমের দিনে সকালে ও দুপুরে শসা বা খিরা খান। শসা-খিরা রাতে খাবেন না।
প্রতিদিন খাবারে সালাদ খান। সালাদে লেটুস, টমেটো, ধনেপাতা, পুদিনা, গাজর, শসা, লাল বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম ব্যবহার করুন। সালাদ ও তরকারিতে ন্যূনতম লবণ ব্যবহার করুন। কাঁচা/ ভাজা/ পাতে অতিরিক্ত লবণ পুরোপুরি বর্জন করুন। খাবারে অতিরিক্ত মশলা, টেস্টিং সল্ট, ঝাল ও ভাজাপোড়া বর্জন করুন। বাইরের খাবার যত কম খান তত ভালো। ভোজ্যতেলের ধরন যা-ই হোক আর এগুলো সম্বন্ধে বিজ্ঞাপনে যা-ই বলা হোক না কেন, সবগুলোতেই কম-বেশি কোলেস্টেরল আছে। তাই খাবারে ন্যূনতম পরিমাণ তেল ব্যবহার করুন।
খিচুড়ি প্রাণিজ আমিষের বিকল্প। সকালে দুই বছরের শিশু থেকে পূর্ণবয়স্ক সবার জন্যেই পাতলা সবজি-খিচুড়ি আদর্শ খাবার হতে পারে। ভাতের বিকল্প হিসেবে মাঝেমধ্যে আলু খান। বিশেষত শিশুকে খাওয়ান। এতে দেহের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে রং উজ্জ্বল হবে, উচ্চতাও বাড়বে।
লেবুর খোসা প্রাকৃতিক হজমী। গুরুপাক খাবার খেলে এক টুকরো লেবুর খোসা চিবিয়ে খান। টক দই বা বোরহানিও খেতে পারেন। সকালে একমুঠো ভেজানো কাঁচা ছোলা ও এক টুকরো আদা এক চিমটি বিট লবণসহ খাওয়ার অভ্যাস করুন। বিকেলে স্ন্যাক্স হিসেবে গোল আলু, মিষ্টি আলু সেদ্ধ খান। প্রতিদিন বাদাম খান। খাওয়ার সময় ও আগে-পরে আধাঘণ্টা পর্যন্ত যত অল্প পানি পান করবেন তত হজমে সুবিধা হবে।
পানীয় হিসেবে ডাব খান। ডাব না পেলে লেবু পানি খান। গরমের তাপদাহ কমাতে তেঁতুল-গুড়ের শরবত পান করুন। গরম খাবার বা পানীয় খাওয়ার সাথে সাথেই ঠান্ডা খাবার বা পানীয় খাবেন না। এতে দাঁতের ক্ষতি হয়। দেহের রেচন প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখার জন্যে প্রতিদিন কমপক্ষে ছয় গ্লাস বা দেড় লিটার পানি পান করুন। প্রচুর শাক ও আঁশযুক্ত সবজি খান। বিভিন্ন সবুজ পাতা দিয়ে তৈরি গ্রিন জুস, করলার জুস ও মেথি ভেজানো পানি পান করুন। দীর্ঘ সফরকালে ডাব, কলা (গায়ে কালো ছিটছিটে দাগযুক্ত) বা শসা খান। এতে তৃষ্ণা মেটার সাথে সাথে সফরের ক্লান্তি দূর হবে।
দেশীয় ফল পর্যাপ্ত খান। যে মৌসুমে যে ফল হয় তা সে মৌসুমের রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। বর্ষাকালে বা যখনই বাজারে আনারস ওঠে, তখন থেকেই নিয়মিত খাওয়া শুরু করুন। ফ্লু থেকে মুক্ত থাকবেন। তবে খালি পেটে আনারস খাবেন না। লিভারের সমস্যা থাকলে বেশি করে জাম খান।
আর ডায়াবেটিস থাকলে জামের সাথে এর বিচি-ও চিবিয়ে খান। ফলের মহারাজা কাঁঠাল। এটি বলকারক, রোগ প্রতিষেধক এবং রং ফর্সাকারক। হজমের অসুবিধা হলে ৮/১০ কোষ কাঁঠাল খেয়ে একটি বিচি চিবিয়ে শুধু রসটুকু খান, ছোবাটা ফেলে দিন।
ঠান্ডা লাগার প্রবণতা থাকলে প্রতিদিন সকালে নাশতার সাথে অল্প কালোজিরা ও এক কোষ রসুন চিবিয়ে খান। ১ চা চামচ মধু খাওয়ার অভ্যাস করুন। ঠান্ডা-সর্দিতে তুলসী পাতার রসে মধু মিশিয়ে পান করুন। ইলেকট্রিক ওভেন/ মাইক্রোওভেনে রান্না বা খাবার গরম করা ক্যান্সারের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। রান্নায় ননস্টিক ফ্রাই প্যান/ কুক ওয়ার ব্যবহার করা থেকেও বিরত থাকুন।
এবার খাওয়ার পরিমাণ প্রসঙ্গে বলি। কখনো ভরপেট খাবেন না। পেট কিছুটা খালি থাকতেই খাওয়া শেষ করবেন। আর কখন খাবেন? এ-ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো পন্থা হলো, ক্ষুধা না লাগলে খাবেন না। ব্যস্। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় আপনি যদি এই সাধারণ নিয়মগুলো মেনে চলেন, তাহলেই আপনার সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বাড়বে ইনশাআল্লাহ।
