আমরা বছরে ছাই করছি ৮০ হাজার কোটি, আমাদের জিডিপির প্রায় চার শতাংশ!
ধূমপান একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ ও বড় ধরনের পাপ এই- চেতনা সমাজ-মানসে বিস্তার লাভ করলেই আমরা সিগারেট আগ্রাসনের হাত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করব।
আমাদের আলোচনার পরপরই একটি সিগারেট কোম্পানির ছয় মাসের ঘোষিত মুনাফার হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। এতে কোম্পানির নীট মুনাফার কথা বলা হয়েছে ৯৫০ কোটি টাকা মাত্র। একটি কোম্পানি ছয় মাসে মুনাফা করেছে ৯৫০ কোটি টাকা আর সিগারেট খেয়ে আমরা বছরে ছাই করে ফেলছি ৮০ হাজার কোটি টাকা। যা আমাদের জিডিপির প্রায় চার শতাংশ। আর সিগারেট খেয়ে টাকা ছাই করার পাশাপাশি সিগারেটজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে এর চিকিৎসার পেছনে ব্যয়ের পরিমাণ হচ্ছে বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা।
এ ব্যাপারে আমাদের সামাজিক সচেতনতা যত বাড়বে তত আমরা সিগারেট আগ্রাসনের হাত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করব।
ডিজিটাল দূষণ – নির্মম শিকার আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
সিগারেটের এই গজবের পাশাপাশি আরেকটি গজবের নির্মম শিকার হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আর এই গজবের নাম হচ্ছে ভার্চুয়াল ভাইরাস বা ডিজিটাল দূষণ।
পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে আমরা দীর্ঘদিন ধরে- পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে একধরনের সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি হলেও এই ডিজিটাল দূষণ সম্পর্কে আমাদের এখনো সেভাবে সচেতনতা সৃষ্টি হয় নি। যদিও এই ডিজিটাল দূষণের সর্বনাশা প্রভাব সম্পর্কে আমাদের চিন্তাশীল সমাজ সবসময়ই সোচ্চার ছিলেন।
শিশুদের বর্তমান এবনরমালিটির জন্যে অনেকাংশে মোবাইল দায়ী – অধ্যাপক মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
এদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছেন বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী প্রফেসর আনোয়ারা সৈয়দ হক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ জাফর ইকবাল।
অধ্যাপক মোহাম্মদ জাফর ইকবাল সম্প্রতি বলেছেন, “ছোট শিশুরা সামাজিক রেসপন্স থেকে ইদানিং পিছিয়ে পড়ছে। এর কারণ স্ক্রিন বা মোবাইলের দিকে শিশুর রেসপন্স। অনেক মা-বাবা শিশুর হাতে মোবাইল দিয়ে খাবার খাওয়ানো সহ নানান কাজ করেন।
এটি করলে শিশুরা স্ক্রিনমুখী হয়ে যাবে। শিশুদের বর্তমান এবনরমালিটির জন্যে অনেকাংশে মোবাইল দায়ী। এতে করে শিশুর মেধা বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়, কারণ শিশুদের মস্তিষ্ক টেলিভিশন বা স্ক্রিনে যা দেখানো হয়, তা গ্রহণ করার জন্যে প্রস্তুত নয়। শিশুর মোবাইল ব্যবহার অটিস্টিকের বৈশিষ্ট্যকে ত্বরান্বিত করে।”
শিশুটি বাতাসের মাঝে হাত বুলিয়ে তাকে সরিয়ে কিংবা অদৃশ্য করে দিতে চেষ্টা করছে!
অধ্যাপক মোহাম্মদ জাফর ইকবাল আরেকটি কলামে লিখেছেন, আমি আজকাল শুধু যে চিঠিপত্র পাই তা নয়, নানানরকম ভয়ের গল্পও শুনি।
একটি ভয়ের গল্প এরকম- মা নানান কাজে খুব ব্যস্ত থাকেন। তাই ছোট শিশুটিকে সময় দিতে পারেন না। আবিষ্কার করেছেন শিশুর হাতে একটা স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট ধরিয়ে দিলে সেটা নিয়ে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যস্ত থাকে। তাই শিশুটাকে ব্যস্ত রাখার জন্যে তিনি তার হাতে স্মার্টফোন দিয়ে রাখেন।
একদিন কোনো কারণে শিশুটিকে একটু শাসন করার প্রয়োজন হলো। সামনে দাঁড়িয়ে যখন শিশুটিকে শক্ত গলায় কিছু বললেন, তখন হঠাৎ তিনি আবিষ্কার করলেন শিশুটি তার দিকে তাকিয়ে বাতাসের মাঝে হাত বুলিয়ে তাকে সরিয়ে কিংবা অদৃশ্য করে দিতে চেষ্টা করছে। স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটের স্ক্রিনে হাত দিয়ে স্পর্শ করে ঘষা দিলেই সেটা সরে যায় বা অদৃশ্য হয়ে যায়।
শিশুটি মায়ের শাসনটুকু পছন্দ করছে না, তাকে সামনে থেকে সরিয়ে অদৃশ্য করার জন্যে একই কায়দায় হাত বুলিয়ে মা-কে অদৃশ্য করার চেষ্টা করছে। যখন মা অদৃশ্য হয়ে গেল না কিংবা সরে গেল না, তখন শিশুটি অবাক এবং বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকল।
এই মা যখন তার সন্তানের এই গল্পটি আরেকজনের সাথে করছিলেন তখন তিনি ভেউ ভেউ করে কাঁদছিলেন। নিজেকে শাপ-শাপান্ত করছিলেন।
আমার ধারণা ছোট শিশুদের নিয়ে আমরা একটা কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। শুধু আমরা নই, পৃথিবীজুড়েই মোটামুটি একই অবস্থা। তবে অন্য অনেক দেশের মানুষের মাত্রাজ্ঞান আছে। বাবা-মায়ের কমনসেন্স আছে। যতই দিন যাচ্ছে আমার মনে হচ্ছে আমাদের দেশের অভিভাবকদের অনেকেরই মাত্রাজ্ঞান বা কমনসেন্স নেই।
খুব শিশু বয়সে বেশি টেলিভিশন দেখলে শিশুর অটিজম শুরু হতে পারে
আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটির একজন অধ্যাপকের একবার ধারণা হলো- খুব শিশু বয়সে বেশি টেলিভিশন দেখলে শিশুর অটিজম শুরু হতে পারে। গবেষণা করে দেখলেন আমেরিকার যেসব স্টেটে ক্যাবল টেলিভিশন দ্রুত বেড়ে ওঠেছে সেখানে অটিজমও দ্রুত বেড়ে ওঠেছে।
মজার ব্যাপার হলো তার এই গবেষণাটি বৈজ্ঞানিক মহল মোটেই গ্রহণ করল না। শুধু তাই নয় উল্টো গবেষণা করে এরকম একটা তথ্য আবিষ্কার করে সবাইকে বিভ্রান্ত করার জন্যে সবাই তাকে অনেক গালমন্দ করতে শুরু করল।
‘অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা এত বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ শিশুদের স্ক্রিনের ব্যবহার’
‘অটিজম’ একসময় অপরিচিত শব্দ ছিল। এখন আমাদের দেশেও মোটামুটিভাবে সবাই অটিজম কিংবা অটিস্টিক শব্দটা শুনেছে। পৃথিবীতে অটিজম বাচ্চার সংখ্যা বছরে ছয় থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। পৃথিবীতে এখন শতকরা একভাগ মানুষ অটিস্টিক। আমেরিকায় এই সংখ্যা আরো বেশি।
অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা এত বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ শিশুদের স্ক্রিনের ব্যবহার। এখন বাচ্চাদের যে পরিবেশে বড় করা হয় সেটি আগের থেকে ভিন্ন। যেটি নিশ্চিতভাবে আগের চেয়ে ভিন্ন সেটি হচ্ছে টেলিভিশন ভিডিও গেম স্মার্টফোনের ব্যবহার।
‘…লেখা আছে ভিডিও গেম খেলার সময় কোনো কোনো শিশুর মৃগী রোগ শুরু হতে পারে!’
কেউ কি কখনো ভিডিও গেমের কাগজটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছেন? সেখানে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা আছে ভিডিও গেম খেলার সময় কোনো কোনো শিশুর মৃগী রোগ শুরু হতে পারে! এতসব জানার পর ছোট একটা শিশুকে টেলিভিশন বা ভিডিও গেমের সামনে বসিয়ে দিতে কি আমাদের জান ধুকপুক ধুকপুক করবে না!”
অধ্যাপক মোহাম্মদ জাফর ইকবালকে আমরা আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। স্ক্রিন, সোশ্যাল মিডিয়া স্মার্টফোন ইত্যাদির সঠিক ব্যবহারের ব্যাপারে আমাদের দেশে সচেতনতার অভাব সবচেয়ে বেশি।
অনেকে শুধুমাত্র ফুটানি করার জন্যে এই জিনিসগুলো শিশু-কিশোর তরুণদের হাতে তুলে দিচ্ছে। তাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে আমাদের শিশু-কিশোর তরুণরা।
প্রতি বছর ১০ থেকে ১৭ শতাংশ হারে বাংলাদেশে অটিজমের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে!
সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৪৪টি শিশুর একজন অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত।
বাংলাদেশেও অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলছে। ১৯৮০ সালে প্রতি আড়াই হাজার শিশুর মধ্যে একজন ছিল অটিস্টিক।
২০২৩ সালে ১১৮ জনে একটি শিশুর মধ্যে অটিজমের লক্ষণ দেখা গেছে। এবং প্রতি বছর ১০ থেকে ১৭ শতাংশ হারে বাংলাদেশে অটিজমের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
দেশে প্রতি ১৪টি শিশুর একজন অটিস্টিক, বড় কারণ আমাদের সামগ্রিক সামাজিক সচেতনতার অভাব
২০১৯ সালে করা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, দেশের সাত থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের সাত শতাংশ অটিস্টিক।
অর্থাৎ প্রতি ১৪টি শিশুর মধ্যে একজন অটিস্টিক। এবং অটিজম গ্রামের চেয়ে শহরে এবং মেয়েশিশুর চেয়ে ছেলেশিশুদের মধ্যে বেশি।
অটিস্টিক শিশুদের মায়েদের ডিপ্রেশন হার ৪৫ শতাংশ, ৬০ শতাংশ ডায়াবেটিসসহ একাধিক রোগে আক্রান্ত
এই শিশু অটিজমের একটি বড় কারণ হচ্ছে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক সচেতনতার অভাব।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শাহীন আক্তার বলেন, শিশু অটিস্টিক হলে পরিবারের সবার ওপরই চাপ পড়ে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন মা। সন্তান জন্ম দেয়ার জন্যে সমাজ মাকে দোষ দেয়। শিশুর লালনপালনের জন্যে মা চাকরি ছেড়ে দেন। অনেকের সংসার ভেঙে যায় শিশুকে আঁকড়ে থাকেন মা। এত চাপে মায়ের ঠিকমতো ঘুম হয় না! অধিকাংশের শরীর ভেঙে যায়।
আসলে কথাগুলো খুবই সত্যি। সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ৬.৭ শতাংশ বিষণ্নতায় আক্রান্ত। গবেষণায় দেখা গেছে অটিস্টিক শিশুদের মায়ের মধ্যে এই হার ৪৫ শতাংশ। ৬০ শতাংশ মা ডায়াবেটিসসহ একাধিক রোগে আক্রান্ত থাকার কথা বলেছেন।
গবেষণা বলে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুর কথা বলা, দৈহিক ও মানসিক উন্নয়নের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে
অটিজমের সাথে স্ক্রিনটাইমের যোগ সূত্র রয়েছে কি না এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে। একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে- অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুর কথা বলা দৈহিক ও মানসিক উন্নয়নের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত কথা বলা বা যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে সে মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।
যে কারণে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স বলেছে দেড় বছরের কম বয়সী শিশুরা যেন টিভি ফোন বা কম্পিউটারের পর্দার সামনে একেবারেই সময় না কাটায়। আর দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্যে স্ক্রিন ব্যবহারের লিমিট হলো দিনে সর্বোচ্চ একঘণ্টা।
ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ স্ক্রিনে সময় নষ্ট করেছে, যার পরিণতি হলো ডিজিটাল দূষণ
সারাবিশ্বে বিশেষত বাংলাদেশে শিশুদের সর্বনাশ হয়েছে করোনাকালে! একে ঘরবন্দি তার ওপর অনলাইন লেখাপড়ার নামে তাদের হাতে হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট দিতে বাধ্য হয়েছেন অনেক অভিভাবরক।
লেখাপড়া আর কতক্ষণ! ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও গেম বা অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখে সময় নষ্ট করেছে। যার পরিণতি হলো ডিজিটাল আসক্তি বা ডিজিটাল দূষণ।
এখন অনেক চেষ্টা করেও মা-বাবা আর তাকে এই ডিভাইস থেকে মুক্ত করতে পারছেন না। এটা শুধু আমাদের দেশে নয় সারা পৃথিবীব্যাপী সৃষ্টি হওয়া এক বিপর্যয়।
ইউনেস্কো আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বাড়াতে ক্লাসরুমে যেন স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করা হয়
আসলে চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। তরুণ মনে সারা পৃথিবীব্যাপী এই গজব ও বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার পরে জাতিসংঘের শিক্ষা-সংস্কৃতি বিষয়ক অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কোর রিপোর্ট বেরিয়েছে। তারা আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বাড়াতে ও শিখন প্রক্রিয়াকে বাধাহীন করতে ক্লাসরুমে যেন স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করা হয়।
ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ড স্কুলে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করেছে
পৃথিবীর অনেক দেশেই স্কুলে এখন স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ড উল্লেখযোগ্য। ডাচ শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য হলো Mobile phones are a disturbance- scientific research shows. We need to protect student against these.
যে মোবাইল ফোনগুলো হচ্ছে একটা ডিস্টার্বেন্স বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে শিক্ষার্থীদের এ থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন।
শিশু কান্নাকাটি করলে বা বায়না ধরলে তার হাতে মোবাইল বা কোনো ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট তুলে দেবেন না
আমরা যে গজব ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছি এই সম্পর্কে এখনই সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। এবং সবাই মিলে কিছু সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নিলে ইনশাআল্লাহ আমরা এই বিপর্যয় থেকে আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে পারব।
এবং এ ব্যাপারে আমাদের করণীয়ের মধ্যে প্রথম করণীয় হচ্ছে, শিশু কান্নাকাটি করলে বা কোনোকিছুর জন্যে বায়না ধরলে তাকে চুপ করাতে হাতে মোবাইল বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট তুলে দেবেন না।
‘ভার্চুয়াল অটিজম’ – অর্থাৎ শিশুর অটিজম নেই, কিন্তু তার মধ্যে লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে
বাচ্চা হয়তো খেতে চাচ্ছে না, না খাক। ভালোভাবে ক্ষুধা লাগতে দেন। ক্ষুধা লাগলে সে নিজেই তখন চেয়ে খাবে। ট্যাব বা ফোন হাতে দিলে খাওয়ানো সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু এর খেসারত অত্যন্ত মারাত্মক! কেননা শিশু ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল বা টিভি পর্দায় বুঁদ হয়ে থাকলে অচিরেই সে ভার্চুয়াল অটিজমে আক্রান্ত হতে পারে। অর্থাৎ সে শিশুর অটিজম নেই, কিন্তু তার মধ্যে লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে।
ভার্চুয়াল অটিজমের লক্ষণ হচ্ছে সে সমবয়সী বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে পারছে না। তার কথা বলা কমে গেছে, নিজের জগতে বাস করছে, কারো চোখের দিকে তাকায় না।
আসলে এর চিকিৎসা একটাই এবং দীর্ঘস্থায়ী। শিশুর জীবন থেকে স্ক্রিনটাইম অর্থাৎ মোবাইল ট্যাব কম্পিউটার বা টিভির দিকে তাকিয়ে থাকা পুরোপুরি বাদ দিতে হবে।
অনর্গল কথা বলতে হবে বাচ্চার সঙ্গে, তবেই সে কথা বলতে শিখবে
শিশু কেন কথা বলতে পারছে না? কারণ বাড়িতে কেউ তার সঙ্গে কথা কথা বলছে না! কারো সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে না। সে নিজেকে প্রকাশও করতে পারছে না। অনর্গল কথা বলতে হবে বাচ্চার সঙ্গে। তবেই কথা বলতে শিখবে সে।
শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
আসলে যন্ত্রের সাথে তো ভাবের আদান-প্রদান হয় না, ওটা একতরফা!
শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মজার কথা বলা, সে কোনো মজার আচরণ করলে হাসা-সবই চোখের মাধ্যমে বোঝা যায়।
ট্যাব বা মোবাইল ধরিয়ে তা হয় না। মা-বাবা ব্যস্ততার অজুহাতে সন্তানকে সময় দেন না ফলে শিশুর জগৎজুড়ে শুধুই কার্টুন। সেই চরিত্রদের সঙ্গেই মনে মনে সে কথা বলে। একপর্যায় শিশুও আর কথা বলার পরিশ্রমটুকুও আর করতে চায় না।
বাবা-মায়ের যখন বোধদয় হয় তা কথা বলানোর জন্যে উঠে-পড়ে লাগেন। স্পিচ থেরাপিস্টের কাছে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন! তখন শিশু বেঁকে বসেছে। কারণ তত দিনে শিশুর নিজস্ব ভার্চুয়াল জগৎ তৈরি হয়ে গেছে।
ট্যাব/মোবাইলের কারণে শিশুর মনোসংযোগে বড় ঘাটতি তৈরি হয়, সে ভাবতে শেখে না, পড়াশোনায় মন দিতে পারে না
ট্যাব মোবাইলের মধ্যে ডুবে থাকায় শিশুর মনোসংযোগে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। সে ভাবতে শেখে না, ফলে পড়াশোনায় মন দিতে পারে না। পড়তে বসে একটু পরেই তার মধ্যে ছটফটানি তৈরি হয়।
দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা ট্যাবের আলো তার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। সে কারণে হজমেরও সমস্যা হয়। সব মিলিয়ে সে আনসোশ্যাল অমনোযোগী শিশুতে পরিণত হয়। এর দায় কি বাবা-মা এড়াতে পারেন?
টানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের কর্নিয়া শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে
এখন ছোট ছোট বাচ্চার চোখে ভারী চশমা দেখা যায়, কয়েক বছর আগেও যা ছিল এক বিরল দৃশ্য। আসলে টানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকায় চোখের ওপরে চাপ পড়ে। কারণ চোখকে ক্রমাগত স্ক্রিনের দৃশ্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। চোখের ভেতরের পেশিগুলোকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। তাছাড়া চোখের পাতা ওপর-নিচ করা কমে যাওয়ায় কর্নিয়া শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। অতএব ভার্চুয়াল জগৎ বা ডিজিটাল জগতে ঠেলে দিয়ে বাচ্চার শৈশব নষ্ট না করে বাবা-মায়ের উচিত আশেপাশে যা হচ্ছে তা থেকেই শিশুকে শেখানো।
দায়হীনতার অনুভূতি শিশুকে ক্রমশ একা স্বার্থপর ও অসহিষ্ণু করে তোলে
এক মনোরোগ চিকিৎসক তার অভিজ্ঞতা বলছিলেন। শিশুর মানসিক অস্থিরতায় চিন্তিত মা-বাবা তার পরামর্শ নিতে আসছে।
ডাক্তার বললেন তিনি মা-বাবার সাথে আলাদা করে কথা বলতে চান। মা-বাবা সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের হাতে মোবাইল ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “তুমি বাইরে বসে এটা দেখো।”
ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন আপনারা কেন এটা করছেন? দম্পতি বললেন এ একা একা বসে থাকবে তো তাই। আসলে সামর্থ্যবান পরিবারগুলোর অধিকাংশ শিশু যে নাজুক মানুষ হয়ে বেড়ে উঠছে, অল্পতেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এজন্যে দায়ী ভুল প্যারেন্টিং।
ছোটবেলা থেকে শিশু বুঝে যায় তাকে কোনো দায়িত্ব পালন করতে হবে না, সব দায়িত্ব বাবা-মায়ের। এমনকি একা কয়েক মিনিট কাটানোর দায়িত্বও তার নেই। এই দায়হীনতার অনুভূতি শিশুকে ক্রমশ একা স্বার্থপর ও অসহিষ্ণু করে তোলে। পরিস্থিতির সামান্য এদিক ওদিক হলেই সেটার মোকাবেলা আর সে করতে পারে না।
পরিবারের সবকিছুতে সন্তানকে সংযুক্ত রাখুন, তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে
সন্তানকে সবসময় বড় করুন পরিবারের অংশ হিসেবে। পরিবারের সবকিছুতে তাকে সংযুক্ত রাখুন। পরিবারের ছোটখাটো যে কাজ সে করতে পারে, সেই কাজে তাকে নিয়োজিত রাখুন। তাকে বুঝতে দিন যে সে এই পরিবারেরই একজন। এবং ছোট হলেও সে যা দায়িত্ব পালন করতে পারে, যে কাজগুলো করতে পারে, সে কাজগুলো তাকে করতে উদ্বুদ্ধ করুন। এতে তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে। নিজের ওপরে আস্থা বাড়বে এবং অনেককিছু সে নিজে নিজেই মোকাবেলা করতে পারবে।
শুদ্ধাচার শিক্ষাদান মা-বাবার সন্তানের প্রতি সবচেয়ে বড় কর্তব্য
আসলে ছোট থেকেই যত তাকে শুদ্ধাচার শিক্ষা দেবেন, তত সে সফল দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। আর এই শুদ্ধাচার শিক্ষাদান- এটা প্রত্যেক মা-বাবার সন্তানের প্রতি সবচেয়ে বড় কর্তব্য সবচেয়ে বড় উপহার!
মা-বাবা হওয়ার আগে মা-বাবার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হোন
আসলে মা-বাবা হওয়ার আগে মা-বাবার যে দায়িত্ব, দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হোন। সঠিক প্যারেন্টিং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমাদের স্বপ্নের রূপকার হিসেবে গড়ে গড়ে তুলবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এটাই আমাদের প্রার্থনা।
প্রত্যেক মা-বাবার প্রধান কর্তব্য শিশুকে যথাযথ মনোযোগ দিয়ে বড় করে তোলা
পরম করুণাময় আমাদের প্রতিটি শিশুকে সুস্থ সবল এবং নিজের কাজ সবচেয়ে ভালোভাবে করার দক্ষতা প্রদান করুন। এবং প্রত্যেক মা-বাবার প্রধান কর্তব্য হোক শিশুকে যথাযথ মনোযোগ দিয়ে তাকে বড় করে তোলা।
ফ্রান্স, নেদারল্যন্ডের মতো আমাদের স্কুলেও স্মার্টফোন নিষিদ্ধ হোক
ফ্রান্স এবং নেদারল্যন্ডের মতো আমাদের স্কুলেও স্মার্টফোন নিষিদ্ধ হোক। আমাদের সন্তানরা আবার বইয়ের জগতে ব্যায়ামের জগতে ধ্যানের জগতে আন্তরিকভাবে ডুবে থাকুক। এটাই আমাদের প্রার্থনা। ভালো থাকুন আনন্দে থাকুন। মেডিটেশনের বাণী কোয়ান্টামের বাণী ঘরে ঘরে পৌঁছে দিন।
খোদা হাফেজ। আসসালামু আলাইকুম। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।
[০৪ আগস্ট ২০২৩ সাদাকায়নের জন্যে ২৯ জুলাই ২০২৩ তারিখে গুরুজীর প্রদত্ত বক্তব্য]
