ড. শমশের আলী জীবনের উদ্দেশ্যটাকে বুঝে পথ চলেছেন, এগিয়ে গেছেন

ড. শমশের আলী জীবনের উদ্দেশ্যটাকে বুঝে পথ চলেছেন, এগিয়ে গেছেন—মুক্ত আলোচনায় গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হলো মহান এই বিজ্ঞানীকে

২৩ আগস্ট ২০২৫ শনিবার কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আয়োজিত মুক্ত আলোচনার ১৩২ তম পর্বে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণুবিজ্ঞানী আল্লামা প্রফেসর ড. এম শমশের আলীর স্মৃতিচারণ করে এ কথাগুলো বলেন আলোচকবৃন্দ।

উল্লেখ্য, শিক্ষাবিদ পরমাণুবিজ্ঞানী লেখক এবং কোয়ান্টাম পরিবারের অভিভাবক প্রফেসর ড. এম শমশের আলী গত ৩ আগস্ট ২০২৫ শনিবার মহাজাগতিক সফরে যাত্রা করেছেন। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহে রাজিউন। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে মুক্ত আলোচনার এ বিশেষ পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়।

এ আয়োজনে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হন বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিক্স এন্ড টেকনোলজি ডিপার্টমেন্টের ফাউন্ডার চেয়ারপারসন প্রফেসর ড. খন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডীন প্রফেসর ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান।

সেইসাথে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই আয়োজনে যুক্ত হন বিজ্ঞানী ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডার্টমাউথ-এর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম।

মুক্তচিন্তার প্রসার ও শত ভাবনার বিকাশে নানা বিষয়ে ২০০৩ সাল থেকে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আয়োজন করছে মুক্ত আলোচনা কার্যক্রম। এবারের আয়োজনের বিষয় ছিল ‘ইসলাম বিজ্ঞান ও আল্লামা ড. এম শমশের আলী’।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাবের কো-অর্ডিনেটর এবং লাইফস্টাইল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মনিরুজ্জামান। আল্লামা প্রফেসর ড. এম শমশের আলীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে তিনি বলেন, আমরা যেমন এসেছি, তেমন চলেও যেতে হবে। এটাই বাস্তবতা। পৃথিবী থেকে একজন মানুষ যেভাবে গেলে চারপাশের সকল মানুষ বলবে তিনি একটা সফল জীবন কাটিয়ে গেছেন, ড. এম শমশের আলী স্যার ঠিক সেভাবেই চলে গেছেন। তিনি সত্যিই তার পদচিহ্ন পৃথিবীতে রেখে গেছেন। কোয়ান্টামে আমরা বলে থাকি, সুস্থ এবং কর্মময় দীর্ঘজীবন—এটাই প্রতিটি মানুষের কাম্য। ঠিক এই জীবনটাই যাপন করে গেছেন ড. এম শমশের আলী। মৃত্যুর একদিন আগপর্যন্তও তিনি ছিলেন কর্মময়। তিনি আমাদের সবার জন্যে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।

প্রফেসর ড. খন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী বলেন, আমি মনে করি—প্রতিটি মানুষের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো তার জীবনের উদ্দেশ্যটা ঠিক করা। ড. শমশের আলী স্যার জীবনের উদ্দেশ্যটাকে বুঝে পথ চলেছেন, এগিয়ে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে মেধাবী অনেক মানুষের সমাগম ঘটেছে। এছাড়াও দেশে-বিদেশে বিজ্ঞানের জগতের অনেককে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। তাদের অধিকাংশই নিজ নিজ গবেষণা এবং পাবলিকেশন বাড়ানোর প্রতিই বেশি আগ্রহী। তাদের জীবনে আর কোনো উদ্দেশ্য আমি দেখি নি। আর এখানেই প্রফেসর শমশের আরী সবার মাঝে ব্যতিক্রম। তিনি যদি চাইতেন, শত শত বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা রেখে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি শুধু এর মধ্যে নিজেকে গণ্ডিবদ্ধ করেন নি। বরং ভেবেছেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং এসব প্রকাশনা মানুষের কী কাজে লাগবে। তিনি নিজের লক্ষ্যস্থির করে নিয়েছিলেন—‘আমাকে মানুষের কল্যাণের জন্যে কিছু করতে হবে। শুধু নিজের আয় বাড়ানো বা সম্মান বাড়ানোর জন্যে এ জীবন নয়।’

স্যারের সাথে বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিজ্ঞানবিষয়ক কিছু প্রোগ্রামে আমার থাকার সুযোগ হয়েছে। আমার বৈজ্ঞানিক নানাবিধ আবিষ্কার সেখানে দেখিয়েছি। ড. শমশের আলী বিজ্ঞানকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করেছেন। তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন চারপাশের মানুষকে বিজ্ঞানমনষ্ক করে তুলতে। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম এবং বিজ্ঞানের যোগসূত্র নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন এবং এ বিষয়গুলো সবার সামনে তুলে ধরেছেন।

বিজ্ঞানী ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডার্টমাউথ-এর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম তার আলোচনায় বলেন, ড. শমশের আলীর মৃত্যু আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি ছিলেন আমার ১৩ বছরের অগ্রজ। তার কাজের মধ্য দিয়েই এই মহান বিজ্ঞানীকে চিনেছি, জেনেছি। একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, তার জীবনব্যাপী কাজের কারণেই আমরা কিছুটা হলেও বেশি জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পারমাণবিক শক্তি কমিশন—কোথাও তার সাথে আমার কোনো যোগাযোগের সূত্রপাত হয় নি। তার সাথে প্রথমবারের মতো আমি দেখা করার সুযোগ পাই বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায়—‘ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর সায়েন্স টেকনোলজি এন্ড ডেভেলপমেন্ট ইন মুসলিম ওয়ার্ল্ড’-এর কনফারেন্সে।

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার রয়েছে অসামান্য অবদান। তিনি কখনো মনে করেন নি, বিজ্ঞান এবং ধর্ম দুটো বিপরীত শক্তি। এই মুক্তমনা চিন্তাভাবনাই তাকে অসাধারণ এক প্রতিভাবান শিক্ষকে পরিণত করেছিল। আমার দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে একজন পলিম্যাথ বা বহুবিদ্যাবিশারদ (এমন একজন ব্যক্তি, বিচিত্র বিষয় এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের বহু শাখায় যার রয়েছে সুগভীর পাণ্ডিত্য)।

কারো মৃত্যুর পর যখন আমরা তাকে স্মরণ করি, তখনই মনে পড়ে কেয়ামত সম্পর্কে বিশেষ একটি হাদীসের কথা। নবীজী (স) বলেছেন, ‘আদমসন্তানদেরকে শেষবিচারের দিনে পাঁচটি বিষয়ের হিসাব দিতে হবে—১. কীভাবে সে তার জীবন যাপন করেছে। ২. যৌবনে (মানসিক ও দৈহিক শক্তি) কী কাজে ব্যয় করেছে। ৩. সম্পদ কীভাবে অর্জন করেছে। ৪. কীভাবে সম্পদ ব্যয় করেছে এবং ৫. যা সত্য বলে জেনেছ, তা কতটুকু অনুসরণ করেছে।’ যদিও চূড়ান্ত বিচারের ভার একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার, আমরা শুধু এই পলিম্যাথ-এর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এটুকু বলতে পারি, তিনি আমাদের সবার জন্যে অনুকরণীয় জীবন আদর্শ রেখে গেছেন। তার যৌবনকাল এবং জীবনের প্রায় পুরোটাই তিনি মানুষের কল্যাণে ও গণশিক্ষার জন্যে ব্যয় করেছেন।

আল্লামা এম শমশের আলীর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রফেসর ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, তিনি অত্যন্ত প্রাজ্ঞ মানুষ ছিলেন। তিনি বিজ্ঞানকে খুব সহজ করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘সায়েন্টিফিক ইন্ডিকেশনস ইন দ্য হলি কুরআন’ বইটির লেখকদের মধ্যে তিনিও একজন। কোরআন এবং বিজ্ঞানের যোগসূত্র নিয়ে এটি একটি অনবদ্য প্রকাশনা।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ওয়াল আসর। ইন্নাল ইনছা-না লাফী খুছর।’ [অর্থ : ‘সময়ের শপথ! (তাকাও মহাকালের দিকে। তাহলেই বুঝতে পারবে) বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীল ছাড়া প্রতিটি মানুষ অবশ্যই ক্ষতিতে নিমজ্জিত।] কোরআনের এই কথাটি আমরা যদি গভীরভাবে উপলব্ধি করি, তাহলেই বুঝতে পারব পৃথিবীতে আমাদের প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য। এ সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে।

ড. শমশের আলী কোরআন এবং বিজ্ঞানকে সহজ করে সবার সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের একজন সাধক। তিনি বিজ্ঞানকে ভালবেসেছেন এবং ইসলামকে ভালবেসেছেন। ইসলাম ও বিজ্ঞানের মাঝে কোনো যে বিরোধ নেই, এটি তিনি গবেষণার আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং এই সত্য প্রতিষ্ঠায় তিনি সফল হয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস।