মো. গোলাম মোস্তফা, ডাকনাম সবুজ। সেই ১৯৯৬–৯৭ সালের কথা। সবুজ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ভর্তি হলেন, তখন তার বন্ধুত্ব হলো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী আছিয়া করিমের সঙ্গে। দুজন মিলে তখনই ভেবেছিলেন, একদিন তারা বাড়ি বানাবেন।
সেই বাড়ি হবে অন্য সব বাড়ির চেয়ে আলাদা। বাড়িটিকে মনে হবে ঠিক বাড়ি নয়, যেন প্রকৃতিরই একটি অংশ। প্রায় ২৫ বছর পর সত্যি হলো সেই স্বপ্ন। স্থপতি আছিয়া করিমদের বানানো মো. গোলাম মোস্তফার সে বাড়ি ‘সবুজ পাতা’ পেল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ৮ নভেম্বর ২০২১ প্রথম আলোতে এ বিষয়ে লিখেছেন জিনাত শারমিন।
এশিয়ার দেশগুলোর স্থপতিদের সংগঠন আর্কিটেক্টস রিজিওনাল কাউন্সিল এশিয়া (আর্কেশিয়া) প্রতিবছর এশিয়ার সেরা স্থাপত্য প্রকল্পগুলোর জন্যে ‘আর্কেশিয়া অ্যাওয়ার্ডস ফর আর্কিটেকচার’ পুরস্কার দিয়ে থেকে। এ বছর বাংলাদেশের দুটি প্রকল্প এতে পেয়েছে সম্মানজনক স্বীকৃতি (অনারেবল মেনশন)।
স্থপতি আছিয়া করিম, নাঈম আহমেদ কিবরিয়াদের ‘সবুজ পাতা’ এবং স্থপতি শুভ্র শোভন চৌধুরী, শ্যাহলা করিম, সায়কা ইকবাল ও মিনহাজ বিন গাফ্ফারদের ‘দ্য স্টেটসম্যান’ এই পুরস্কার পেয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর ঘোষণা করা হয় বিজয়ীদের নাম। এশিয়ার ১৫টি দেশ থেকে ২২৪টি প্রকল্প জমা পড়েছিল এবারের আসরে। সেখান থেকে ২৫টি প্রকল্প সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়। সেখানে বাংলাদেশের এই দুটি প্রকল্পই ছিল।
দ্য স্টেটসম্যান ঢাকার গুলশানের একটি আবাসন প্রকল্প। এটির স্থপতিদের পক্ষে সায়কা ইকবাল বলেন, ‘আর্কেশিয়া অ্যাওয়ার্ডস ফর আর্কিটেকচার গুরুত্বপূর্ণ একটা পুরস্কার। নতুন ধরনের ভবন বানিয়ে পাওয়া এই স্বীকৃতিতে আমরা ভীষণ আনন্দিত। এখানে নতুন ও পুরনো প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।
অল্প জায়গার ভেতর সবাই যাতে প্রকৃতিক আলো–বাতাসের সঙ্গে আধুনিক বাড়ির সব সুবিধা উপভোগ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। তাপ অনেকটা আটকে ফেলে কেবল আলো ঢোকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আর বহুতল এই ভবন দেখতে খুব সুন্দর। ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের এই প্রকল্প নগরে নতুন ধারার ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে চমৎকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।’
সবুজ পাতা বাড়ির মালিক এই বাড়ি তৈরির পেছনে কৃতিত্বের একটা বড় অংশ ভাগ করে দিলেন নিজের স্ত্রী কাজী তানিয়া আর বন্ধু আছিয়া করিমের মধ্যে। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী বাস্তুশাস্ত্র নিয়ে রীতিমতো গবেষণা শুরু করল। তার সঙ্গে যোগ দিল শিল্পী রাহুল আনন্দ। দুজন মিলে বের করল ঘরে কোন গাছ রাখলে সেটা শক্তি দেয়, ফলের গাছ পুব দিকে মুখ করে হতে হবে, উত্তরের আলো লেখাপড়ার জন্যে ভালো—এ রকম নানা কিছু।
আর আছিয়া এই স্থাপনায় এতো সময় দিয়েছেন, এতো ডিটেইলসে কাজ করেছেন যে তিনি তার নিজের বাড়ির জন্যেও এতোটা সময়, শ্রম, দিতে পারবেন কি না সন্দেহ। এই বাড়িতে কোনো গ্রিল নেই, প্লাস্টার নেই, ঢালাই নেই, সূর্যের আলো, উত্তরের হাওয়া সব ঘরে সমানভাবে ঢুকতে পারে। সব ঘর থেকে বাইরে বের হওয়া যায়। বাসাজুড়ে লাতানো গাছ। চারপাশে প্রচুর গাছ, প্রচুর পাখি। তাই পোকামাকড়ের উপদ্রব নেই। তিনতলায় আমার আঁকাআঁকির স্টুডিও আর খোলা ছাদ।’
সূত্র : প্রথম আলো (৮ নভেম্বর, ২০২১)
