বয়স শুধুই একটি সংখ্যা নাকি নিয়তি? “কতদিন বাঁচব?”—এই প্রশ্ন মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা একটি অদৃশ্য সীমা নির্ধারণ করে ফেলি। সমাজ, সংস্কৃতি ও পারিপার্শ্বিকতা আমাদের আয়ু সম্পর্কে একটি পূর্বধারণা গড়ে দেয়। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, “প্রত্যাশাই ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করে।” যদি আপনি আপনার জীবনযাপন ও মানসিকতাকে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালনা করেন, তাহলে বার্ধক্যেও আপনি তারুণ্যের প্রাণশক্তি ধরে রাখতে পারেন।
চল্লিশ পেরোলেই চালশে? না, এটা মিথ্যা!
“আজকে যে বেপরোয়া বিচ্ছু শান্ত সুবোধ হবে কাল সে; চোখের সঙ্গী হবে চশমা, চল্লিশ পেরোলেই চালশে!”
এই ধারণা কি বদ্ধমূল? গবেষণা বলছে, না! বয়স বাড়লেই শারীরিক ও মানসিক অবক্ষয় অনিবার্য নয়। টাইম ম্যাগাজিনের একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিয়মিত মেডিটেশন, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সুস্থ জীবনাচার বার্ধক্যের গতিকে ধীর করে এবং আয়ু বাড়ায়।
মেডিটেশন ও শিথিলায়ন: দীর্ঘায়ুর চয়ান্তা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, মানসিক চাপ (স্ট্রেস) শারীরিক ক্ষয়ের অন্যতম কারণ। নিয়মিত মেডিটেশন:
রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে,হতাশা ও উদ্বেগ কমায়,ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে,হাড়ের গঠন মজবুত ,,করে,স্মৃতিশক্তি ও নিউরোন-ক্ষয় রোধ করে টেলোমেয়ার:
বার্ধক্যের গোপন নিয়ন্ত্রক আমাদের দেহকোষের ক্রোমোজোমের প্রান্তে থাকে টেলোমেয়ার (Telomere), যা কোষ বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে ছোট হতে থাকে। টেলোমেয়ার ছোট হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত:
হৃদরোগ,ডায়াবেটিস,স্নায়বিক দুর্বলতা ,দ্রুত বার্ধক্য
টেলোমেয়ার রক্ষার উপায় ২০১৪ সালে ইউসিএসএফ-এর গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মেডিটেশন ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেন, তাদের টেলোমেয়ার দ্রুত ক্ষয় হয় না। টেলোমেয়ার সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন:
নিয়মিত মেডিটেশন ,পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস,শারীরিক ব্যায়াম,পর্যাপ্ত ঘুম,ইতিবাচক মানসিকতা
বার্ধক্যকে জয় করুন সচেতন জীবনাচারে বয়স বাড়বে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু জরা ব্যাধি অনিবার্য নয়। বিজ্ঞানসম্মত জীবনযাপন, মেডিটেশন ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আপনাকে দিতে পারে একটি সুস্থ, সুখী ও দীর্ঘ জীবন।
কীভাবে রোধ করা যায় টেলোমেয়ারের ক্ষয়?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্ট্রেসমুক্তি এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
নিয়মিত মেডিটেশন, বিজ্ঞানসম্মত খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও জীবনের প্রতি আশাবাদী-ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি টেলোমেয়ার-এর স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যহ্রাসকে ব্যাহত করে। ফলে বার্ধক্য প্রক্রিয়া ঘটে তুলনামূলক ধীর গতিতে।
শুধু তা-ই নয়, নিয়মিত মেডিটেশনকারীদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বয়সজনিত নিউরোন-ক্ষয়ও অন্যান্যদের তুলনায় কম। তারা হতাশা-বিষণ্নতার মতো নেতিবাচক আবেগ-অনুভূতিতে আক্রান্ত হন কম।
২০১৪ সালে ইউসিএসএফ-এ ২৩৯ জন মহিলার ওপর পরিচালিত বছরব্যাপী একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মেডিটেশনের মাধ্যমে স্ট্রেসমুক্ত জীবনযাপন এবং সুস্থ জীবনাচার অনুসরণ করেছেন তাদের টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য ততটা কমে নি, যতটা কমেছে স্ট্রেস-আক্রান্ত ও পরিশ্রমহীন জীবনযাপনকারীদের ক্ষেত্রে। বার্ধক্যেও জরা-ব্যধি তাদের স্পর্শ করেনি।
তাই, সময়ের সাথে সাথে আপনার বয়স বাড়বে- একথা সত্যি; তবে সচেতন জীবনচর্চার পথ ধরে আপনি হতে পারেন ফিজিক্যাল ও মেন্টাল ফিটনেসের অধিকারী, যাপন করতে পারেন এক আনন্দময় সুখী সুস্থ দীর্ঘজীবন।
“বয়স শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায়, যুবকের প্রাণ আছে যার মনে, সে তো আজও চিরতরুণ!”
সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন। আপনার জীবনই হোক আপনার সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষণা!
কবির আহমেদ। তথ্যসূত্র: টাইম ম্যাগাজিন, ইউসিএসএফ গবেষণা, এলিজাবেথ ব্ল্যাকবার্নের টেলোমেয়ার তত্ত্ব,কোয়ান্টাম।
