প্রাচীন নগরী ট্রয়তে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। এটি বর্তমানে তুরস্কে অবস্থিত, জায়গাটার নাম ট্রুভা।
ওখানে যাওয়াটা বেশ কঠিন, তাই খুব বেশি ট্যুরিস্ট যায় না। পাবলিক বাস আমাদের যেখানে নামিয়ে দিল, ওখান থেকে আরো অনেকখানি হাঁটতে হবে, প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। সেইসাথে প্রচণ্ড রোদ।
হঠাৎ দেখি, স্থানীয় একজন ট্রাক্টর চালিয়ে যাচ্ছেন। তাকে থামিয়ে বললাম, ট্রুভা! আমরা টার্কিশ জানি না, তিনিও ইংরেজি জানেন না। আমাদের কথায় সমর্থন জানিয়ে বললেন, ওকে, ট্রুভা ট্রুভা। সায় পেয়ে তার ট্রাক্টরে চেপে বসলাম।
অতঃপর ট্রুভা পৌঁছে ট্রাক্টর থেকে নামার পর কত টাকা দিতে হবে তা হাতে ইশারা করে তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, হাউ মাচ? কারণ এই কথাটা পৃথিবীর সর্বত্র সবাই বোঝে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, নো মাচ!
সেই ট্রাক্টর চালকের কথা আমি আজও ভুলতে পারি নি। তিনি যদি ট্রুভা পৌঁছে দেয়ার জন্যে আমার কাছে বিনিময় মূল্য চাইতেন, আমি ঠিকই দিতাম। এরকম অনেকেই তো নেয়, আমরাও দিয়ে থাকি। তাদের কথা আমরা কেউ মনে রাখি না। কিন্তু ভিনদেশি এই মানুষটিকে আমি ঠিকই মনে রেখেছি। কারণ তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন—তোমার যদি সুযোগ থাকে, তাহলে আরেকজনকে সাহায্য করো।
আমাদের চারপাশেই আমরা দেখতে পাই—সামান্য বৃষ্টি হলে যানবাহনের ভাড়া বেড়ে যায়, একটু রোদ হলে বেড়ে যায়, এমনকি ঈদের সময় সাধারণ মানুষকে কত দুর্ভোগে পড়তে হয়! কিন্তু পৃথিবীর পথে-প্রান্তে অগণিত মানুষ আমাকে শিখিয়েছে, এসব দুর্ভোগই জীবনের শেষ কথা নয়। যে-কোনো ধর্মের, যে-কোনো দেশের, যে-কোনো জাতির সবচেয়ে মহান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হলো, ভালবাসার চেয়ে বড় কোনো শক্তি পৃথিবীতে নেই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—
কত অজানারে জানাইলে তুমি,
কত ঘরে দিলে ঠাঁই—
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।
অর্থাৎ আপনি যদি পর’কে ভাই করেন, তাহলে পরও আপনাকে ভাই করবে।
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শনিবার কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আয়োজিত মুক্ত আলোচনার ১৩৩ তম পর্বে এ কথাগুলো বলেন অভিযাত্রী, পাখি-গবেষক, নিসর্গী ও লেখক তারেক অণু। এ আয়োজনে ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর’ বিষয়ে ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি তুলে ধরেন তিনি।
উল্লেখ্য, মুক্তচিন্তার প্রসার ও শত ভাবনার বিকাশে নানা বিষয়ে ২০০৩ সাল থেকে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আয়োজন করছে মুক্ত আলোচনা কার্যক্রম।
তারেক অণু আরো বলেন, আমরা প্রায় সবাই ভ্রমণ পছন্দ করি এবং ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের পছন্দ আলাদা। যেমন, আমি ভ্রমণ করতে ভালবাসি প্রকৃতি দেখতে, মূলত পাখি দেখতে। অনেকে দেখতে যান ঐতিহাসিক জায়গা, অনেকে বাজার দেখতে যান, মেলা দেখতে যান, অনেকে আবার খেতেও যান। তবে একটি কথা আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি—পৃথিবীর যে-কোনো স্থানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ভালো হবে না খারাপ হবে, তা গড়ে দেয় সেখানকার মানুষ। যে দেশেই যান সেখানে প্রকৃতি, খাবার-দাবার এবং সবকিছু হয়তো খুব ভালো ছিল কিন্তু কেউ আপনার সাথে অন্যায় আচরণ করল বা কটুকথা বলল, আপনি কিন্তু ভ্রমণের সমস্ত সুখস্মৃতি ভুলে যাবেন। ঐ কটুকথা আপনার ঠিকই মনে থাকবে। আবার কোথাও থাকার ব্যবস্থা তেমন ভালো ছিল না, হয়তো কোনোমতে ডালভাত খেয়ে থাকতে হয়েছে, কিন্তু সেখানকার কোনো মানুষ, হয়তো-বা একজন রিকশাচালক আপনাকে ভালবেসে এক কাপ চা খাইয়েছে, এই সুন্দর অভিজ্ঞতাই কিন্তু আপনার মনে থেকে যাবে। এমনই কিছু অভিজ্ঞতা এবং আমার দেখা কিছু মানুষের কথা আজ বলব—
উজবেকিস্তানের তাসখন্দে দুই তরুণের সাথে আমার পরিচয় হলো। কথায় কথায় জানতে পারলাম, একজনের বাড়ি ফারগানা। এই জায়গাটির প্রতি আমার বরাবরই এক ধরনের আকর্ষণ আছে, কারণ মধ্য এশিয়ার এই জনপদে মোঘল সম্রাট বাবরের বাড়ি। আমি সেখানে যেতে চাই শুনে সেই তরুণ বলল—আমার গ্রামে দেখার কিছু নেই। কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। এবার সে ফারগানায় তার মামাকে ফোন করল এবং তারও একই কথা—আমাদের এখানে তো দেখার কিছুই নেই। আমি বললাম, সেই দায়িত্ব আমার। সেখানে পৌঁছে দেখি, ছেলেটার দাদী আমার জন্যে অনেকখানি জায়গা জুড়ে বহু ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার সাজালেন। আশেপাশের মানুষগুলো আমাকে দেখতে এলেন, আমার সাথে ছবি তুললেন, ঠিক একসময় আমাদের গ্রামগুলোতে যেমনটা হতো।
আরো দেখলাম, মধ্য এশিয়ার মানুষগুলো অন্যকে না দিয়ে কিছুই খায় না। এমনকি সে অজানা-অচেনা মানুষ হলেও। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে, রেস্টুরেন্টে সব জায়গায় আমার এ অভিজ্ঞতা হলো। একা কিছু খাওয়াটা তাদের কাছে চরম অসভ্যতা। অথচ উজবেকিস্তান কিরগিজস্তান তাজিকিস্তান এবং কাজাখস্তান, এই চারটি দেশ কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে আমাদের চেয়ে তেমন কোনো ভালো অবস্থানে নেই। তারপরও এখানকার অধিবাসীরা আমাকে শিখিয়ে দিল—পাশের মানুষটাকেও আমার দেখভাল করতে হবে।
উজবেকিস্তানের বোখারায় রেল স্টেশন দেখে শুরুতে বেশ ভয় পেয়েছিলাম। সবকিছু এতটাই ঝকঝকে তকতকে যে, আমি ভাবছিলাম আজ কি এই শহরে কারফিউ? বা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কেউ কি আসছেন? সমরখন্দেও তা-ই, রেল স্টেশন অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। আমরা অনেকেই যে-কোনো পরিস্থিতিতে চট করে বলে ফেলি—বাংলাদেশ তো গরিব একটা দেশ, গরিব দেশে এরকম হয়ই! আমাদের এই ভ্রান্ত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উজবেকিস্তান কিন্তু আমাদের চেয়েও গরিব একটি দেশ। আসলে পরিচ্ছন্নতা অভ্যাসের ব্যাপার, এর সাথে অর্থবিত্তের সম্পর্ক নেই। আমরা ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র ফেলব না—এই অভ্যাসটাকে নিজেদের সংস্কৃতির অংশ করে নিলেই তো হয়ে যায়।
কিরগিজস্তানে কথা হলো একজন ট্যাক্সিচালকের সাথে। অবাক হলাম তার চমৎকার ইংরেজি শুনে। তিনি বললেন, আমেরিকায় তিনি অনেক বছর ট্যাক্সি চালিয়েছেন। জানতে চাইলাম, তাহলে আমেরিকা থেকে ফিরে এলে কেন? তার জবাব—না না, সেখানে কোনো শান্তি নেই, তাই আমি নিজের দেশে চলে এসেছি। উলান নামের এই ট্যাক্সিচালকের শ্বশুরের সাথেও আমার পরিচয় হয়েছিল। তাদের বাড়িতেও গিয়েছিলাম। আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর মধ্যে এটি একটি। তেপান্তরের মাঠ, ঘোড়ার দল চরে বেড়াচ্ছে, তার পেছনে তুষার-আচ্ছাদিত তিয়েনসান পর্বত। তার বাড়ির প্রত্যেকটা ঘর থেকে এই পর্বত দেখা যায়। বৃদ্ধ এই ভদ্রলোকের মতো সত্যিকারের সুখী মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। স্বল্প আয়ের এই মানুষটি খুব পরিতৃপ্তি নিয়ে বললেন—দেখ, আমি এখনো ফিট আছি, আমার এত এত নাতি-নাতনি আছে, পরিবারের মানুষেরা আমাকে ডাকে। তাকে দেখে অনুভব করলাম—আমরা যারা মনে করি, আরো টাকা হলে ভালো থাকতাম, তাদের এই চিন্তায় কোথাও একটা গলদ আছে।
কিছুদিন আগে আমরা কেনিয়ার তুরকানা নামে একটা অঞ্চলে গিয়েছিলাম। এটি সাব-সাহারা, মানে সাহারা মরুভূমির একটু নিচে। ওখানে খুব গরম, বাবলা গাছ ছাড়া তেমন কোনো গাছ নেই। উট দেখা যায় সবখানে। ওখানকার মানুষ প্রায়শই ট্যুরিস্টদের কোনো গাড়ি দেখলে থামায় শুধু এক বোতল পানির জন্যে। সকালে উঠে ওদের শিশুদের প্রথম কাজ—পানির খোঁজে বেরিয়ে পড়া। ওদের জীবনের মিশনই হলো, আজ কতটুকু পানি জোগাড় করা যায়।
এসব শিশুদের দেখে মিশরের এক গাইডের কথা আমার মনে পড়ে গেল। আবু সিম্বলের মন্দির দেখতে যাওয়ার সময় আধা লিটারের একটা পানির বোতল শেষ করে গাইডকে দিয়েছিলাম খালি বোতলটা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার জন্যে। সে বোতলের মুখটা খুলে কয়েকবার ঝাঁকুনি দিল। বোতল নিংড়ে ২-৩ ফোটা পানি গড়িয়ে তার মুখে পড়ল। এরপর সে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, আই অ্যাম ফ্রম সাহারা, এভরি ড্রপ অব ওয়াটার ইজ ইম্পর্টেন্ট টু মি।
আর আমরা অফুরন্ত সম্পদের দেশের মানুষ। আমাদের দেশে কেউ যদি লাউ খেয়ে বীজটা মাটিতে ফেলে দেয়, কিছুদিনের মধ্যে সেখানে গাছ হয়ে যাবে। এত পানি আমাদের দেশে! কিন্তু এই পানিকে, এই মাটিকে, এই দেশকে আমাদের সম্মান করতে শেখানো হয় না, মূল্য দিতে শেখানো হয় না। পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে যারা কখনো এক গ্লাস পরিষ্কার পানি দেখে নি। আলজেরিয়া, নাইজার, চাদ—এ দেশগুলোতে প্রচুর মানুষ আছে যাদের কাজই হচ্ছে, সাহারা মরুভূমিতে ১০ হাজার বছর আগে একটা বিল ছিল এবং সেই বিলের পানি কোথায় কোথায় জমে আছে, সেই পানিগুলো তারা বালুর মধ্য থেকে খুঁজে বের করে। এই পানি তারা ১০ বার ছাঁকে, ১০ বার পাতন করে, তারপরও সেটা বালু-মিশ্রিত ঘোলা পানি। এক গ্লাস পরিষ্কার পানি তারা কখনোই দেখার সুযোগ পায় নি। আর আমরা একেকজন জীবনের কত কষ্টের কথা বলি! কিন্তু আমরা কোনোদিন কি ভাবতে পারব যে, এক গ্লাস পরিষ্কার পানির জন্যে কত কষ্ট করতে হয়?
আর আমি শিখেছি—চোখ-কান খুলে ভ্রমণ করতে পারলে পৃথিবীর যে-কোনো মানুষ বিনয়ী হতে বাধ্য। মিশরে কায়রোর পথে যে ভিক্ষুক, তিনিও কিন্তু আমার-আপনার চেয়ে ভালো আরবি জানেন। আবার আমার দেশে পদ্মার জেলেরা পদ্মা নদীর পানির রং দেখেই বুঝতে পারবেন, আজ আবহাওয়াটা কেমন হবে। আমরা পথে নামলে জানতে পারি, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই আমার চেয়ে কিছু না কিছু ভালো জানেন। তাই ভ্রমণে বেরিয়ে বিনয়ী না হয়ে আপনি পারবেন না।
প্রথমবার কালিম্পং গিয়ে লেপচা জাদুঘর দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি সেটা বন্ধ। দার্জিলিংয়ের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা লেপচা নামে পরিচিত। জাদুঘরের দারোয়ান বলল, কেয়ারটেকারের শরীর খারাপ, তাই আজ জাদুঘর বন্ধ। আমি বললাম, এটা কেমন কথা, ইন্টারনেটে তো লেখা আছে জাদুঘর খোলা। আমি ভিনদেশ থেকে এসেছি, আবার কবে আসব জানি না। তারপর ওরা ফোনে যোগাযোগ করল এবং আমাকে আশ্বস্ত করল যে, কেয়ারটেকার আসছেন, একটু অপেক্ষা করতে হবে। যে-ই শুনলাম কেয়ারটেকারের বয়স ৯৪ বছর, আমার বেশ অনুশোচনা হলো—কেন এভাবে বললাম! তার বাড়ি ৭-৮ মিনিটের পথ শুনে আমি নিজেই চলে গেলাম তার কাছে। রীতিমতো বিস্মিত হলাম যে, জওহরলাল নেহেরু থেকে শুরু করে ভারতের প্রত্যেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার ছবি আছে, এমনকি বহুদেশ থেকে আগত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথেও। শুধু তা-ই নয়, এই মানুষটিই লেপচা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা এবং ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাতেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। তবে আমি যে কারণে তার প্রতি শ্রদ্ধা অনুভব করলাম তা হলো—কোথাকার কোন ছেলে এসেছে জাদুঘর দেখতে, তারপরও অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি জাদুঘরে যেতে প্রস্তুত তার জাতি সম্বন্ধে দুটো কথা তাকে জানানোর জন্যে। তিনি আমাকে শেখালেন, আমরা যত উঁচুতেই থাকি না কেন, প্রতিটি মানুষই গুরুত্বপূর্ণ।
মুক্ত আলোচনার এই পর্বে কৌতূহলী দর্শক-শ্রোতাদের কিছু প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন অভিযাত্রী তারেক অণু। ভ্রমণের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ভ্রমণের জন্যে সবার আগে প্রয়োজন ইচ্ছা, তারপর ফিটনেস। যদি প্রথমেই খরচের কথা ওঠে তাহলে কোথাও যাওয়া হবে বটে, কিন্তু সেটা ভ্রমণ হবে না।
আর যত ছাড় দিতে পারবেন, ভ্রমণটা তত সহজ হবে। কেউ যদি মনে করে, আমার যেদিন এক কোটি টাকা হবে সেদিন আমি ঘুরতে যাব, তাহলে কোনোদিনই তার ঘুরতে যাওয়া হবে না। অতএব আগে পথে নামতে হবে।
বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে কেন দেশে ফিরে এলেন?—এ প্রসঙ্গে তারেক অণু বলেন, নিজের ভাষার বাইরে আমার কখনো ভালো লাগে না। খুব অল্প বয়সে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমাকে আমার ভাষার ভেতরে থাকতে হবে যেহেতু আমি লিখতে ভালবাসি। আমি পৃথিবীর বহু জায়গায় যাই, নতুন নতুন মানুষ দেখতে আমার ভালো লাগে। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে মায়াময় জায়গা হলো যেখানে আপনি বেড়ে উঠেছেন। আর কোনো জায়গার মানুষই শতভাগ ভালো নয়, আবার শতভাগ মন্দও নয়। তাই আমি আমার দেশের মানুষ নিয়েই থাকব—এটাই আমার ফিরে আসার কারণ।
উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানে তারেক অণুর পথ চলাতেই আনন্দ বইটি বিশেষ মূল্যছাড়ে সংগ্রহ করার সুযোগ ছিল অংশগ্রহণকারীদের জন্যে। বইটিতে লেখকের অটোগ্রাফ নেয়ারও সুযোগ পান তারা।
অতিথির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি :
তারেক মাহমুদ অণু
তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পদ্মাপাড়ের শহর রাজশাহীতে। সেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। ২০০২ সালে উচ্চশিক্ষার্থে তিনি ফিনল্যান্ডে পাড়ি জমান। তার মা ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান। মায়ের চাকরিসূত্রে তার শৈশব কেটেছে লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে, অজস্র বইপত্রের মাঝে। বইয়ের বিচিত্র সব ছবি কল্পনার আনন্দলোক তৈরি করেছিল তার শিশুমনে। বিশ্বকে দেখার ও জানার আগ্রহ তার মধ্যে জন্ম নেয় শৈশবে পড়া বই এবং এর চরিত্রগুলোকে কেন্দ্র করে।
সারা পৃথিবীকে একটাই দেশ মনে করেন তিনি, যে দেশটাকে কিছুটা ভালো করে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছায় চেষ্টা করেন নানা অঞ্চল ভ্রমণের। পর্বত শিখর জয় করতে ভালবাসেন। ডুব দেন সাগরতলে। তার চেয়েও বেশি উপভোগ করেন পাখির পেছনে দৌড়ে সকালকে বিকেল করে দিতে।
ভ্রমণ কেন করব? এ প্রসঙ্গে এক জায়গায় তিনি বলেন, ‘ভ্রমণ করবেন জীবনকে আরেকটু বোঝার জন্যে। নিজেকে আরেকটু ভালবাসার জন্যে’। কিশোর বয়সে তারেক অণু প্রথম ভ্রমণ করেন খুলনায়। একে একে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও সৌন্দর্যকে তিনি উপভোগ করেছেন। কলকাতা দিয়ে শুরু হয় তার বহির্বিশ্বে ভ্রমণ। ২০০৬ সালে জার্মানি ভ্রমণ ছিল তার জীবনের প্রথম বড় রোড ট্রিপ। ৯টি দেশ ঘুরে ভ্রমণের নেশা তাকে পেয়ে বসে। বাংলাদেশের প্রথম অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণকারী ইনাম আল হকের সান্নিধ্যে তিনি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পান—ভ্রমণ শুধু নিজের জন্যে নয়; দেশের জন্যে, পরিবেশের জন্যে। বরেণ্য অভিযাত্রী, পাখি-বিশারদ ও লেখক ইনাম আল হকের সাথে পরিচয় তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০০৭ সালে তারা একসাথে পৃথিবীর উত্তর মেরু ভ্রমণ করেন। উত্তর মেরু থেকে হিমালয় হয়ে বঙ্গোপসাগরের অতল সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড—সবখানে ইনাম আল হকের সহ-অভিযাত্রী ছিলেন তারেক অণু।
২০০৮ সালে পৃথিবীর সর্ব উত্তরের প্রান্ত নর্থ ক্যাপ ভ্রমণ করেন তারেক অণু। উল্লেখ্য, অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের নরওয়ের ল্যাপল্যান্ডে এটি উত্তরতম বিন্দু। সেখানে এরপর কোনো ভূমি নেই। আছে শুধু বরফ। দক্ষিণ মেরুর অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণ করেছেন এ অভিযাত্রী। বাদ যায় নি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ট্রপিকাল রেইন ফরেস্ট অ্যামাজনও। উল্লেখ্য, সাতটি মহাদেশের শতাধিক দেশ তিনি একাধিকবার ভ্রমণ করেছেন। ১৯ বছর ধরে তিনি হেঁটে চলেছেন বিশ্বের পথে পথে।
তারেক অণুর বিশেষ আগ্রহ পর্বতারোহণে। বাংলাদেশের প্রথম নারী এভারেস্টজয়ী নিশাত মজুমদারের সাথে ২০১২ সালে হিমালয়ের ‘ইমজাৎ সে’ বা ‘আইল্যান্ড পিক’ জয় করেন তিনি। এ-ছাড়া ইউরোপের সর্বোচ্চ ও বৃহত্তম আল্পস পর্বতের সর্বোচ্চ শিখর ‘মঁ ব্লাঁ’ আরোহণকারী একমাত্র বাংলাদেশি তিনি।
তারেক অণুর লেখা ভ্রমণ-বিষয়ক প্রথম বই ‘পৃথিবীর পথে পথে’ প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘পথ চলাতেই আনন্দ’। এ-ছাড়া ‘বাংলাদেশের পাখির ফিল্ডগাইড’-এর সহ-লেখক তিনি। তার মতে, ‘মনের আনন্দে আমরা যারা ভ্রমণ করি, এই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সার্থকতা লেখালেখিতে। ভ্রমণকে লিপিবদ্ধ করে রাখি মনের মুগ্ধতা দিয়ে—এ লেখা ছাপা হতে হবে, নামি হতে হবে এমন কিন্তু নয়। কিন্তু লেখাটি থাকতে হবে।’
