স্মার্টফোন আসক্তি থেকে মুক্ত হলাম
নোমেন চাকমা
পরিসংখ্যান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। কিন্তু নবম শ্রেণিতে আমার হাতে স্মার্টফোন চলে এলো। এ যেন ছিল আমার ধ্বংসের বীজ। এর ফলে আমি যে এতটা বদলে যাব ভাবি নি। আমার লাইফস্টাইল, আচরণ সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেল। গেম, ফেসবুক অর্থাৎ ভাচুর্য়াল ভাইরাস ছিল আমার সঙ্গী। সময়ের সাথে সাথে আমার আসক্তির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছিল। মা-বাবা আমাকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন।
আমার এসএসসি পরীক্ষার পর বাবা বললেন, বান্দরবানের একটা ভালো কলেজে ভর্তি করাবেন। আমি কোনোভাবেই যেতে রাজি ছিলাম না। তাও জোর করে বাবা আমাকে কোয়ান্টাম কসমো কলেজে ভর্তি করে দিলেন। সেদিন আমি খুব কেঁদেছিলাম। ফোন ছাড়া আমি কীভাবে থাকব? আমার পাগল প্রায় অবস্থা। তখন আমার পাশে দাঁড়াল আমার সহপাঠীরা। আমি কাঁদছিলাম, ওরা আমাকে সঙ্গ দেয় এবং ক্রিকেট খেলতে নিয়ে যায়। ওদের সাথে খেলতে খেলতে আমার দিনটি যে কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারি নি। ফোন ছাড়াও যে আনন্দময় সময় কাটানো যায় উপলব্ধি করলাম। বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে একসাথে থাকা, একসাথে খাওয়া, একসাথে ঘুমানো, একসাথে পড়ালেখা, একসাথে মেডিটেশন—সবকিছুই আমার ভালো লাগতে শুরু করল।
ওদের সাথে থাকতে থাকতে আমারও পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ চলে এলো। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিতে কোনো সমস্যায় পড়লে সবাই মিলে সমাধান করতাম। ভার্সিটিতে পড়ার মনছবিও তৈরি হয় এই সময়টায়। এভাবেই এইচএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন হলো। তারপর কসমো কলেজ থেকে চলে যাওয়ার ঘণ্টা বেজে উঠল। সেদিনও আমি কেঁদেছিলাম, সবাইকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি বলে।
ইউনিভার্সিটি ভর্তি প্রস্তুতি আমি বাসা থেকে নিতে শুরু করি। সবাই আমার বাবাকে বলছিল আমাকে ভালো কোনো কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দিতে। কিন্তু আমার বাবার ঐ সময় সেই সামর্থ্য ছিল না। আমার পাঁচ ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ চালানোর পর বাবার পক্ষে আমাকে কোচিংয়ে পড়ানোটা মোটেও সহজ ছিল না। তখন আমার বাবার ওপর কী পরিমাণ চাপ পড়েছিল তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।
আমি বিশ্বাস করতাম নিজে থেকে পড়েও ভার্সিটিতে চান্স পাওয়া সম্ভব এবং আমি নিজে থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিলাম। পরিসংখ্যান বিভাগে চান্স পেলাম।
আমি ভাচুর্য়াল ভাইরাস থেকেও মুক্ত হয়েছি। এখন কোনো প্রতিকূলতা আমার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। কারণ আমি এখন প্রো-একটিভ।
আজ বাবাকে ধন্যবাদ জানাই। তখন এই কলেজে ভর্তি না করালে কী হতো আমার অবস্থা তা আর ভাবতে চাই না। আজ আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি, বাবা আমার জীবন আর কোয়ান্টাম আমার লাইফস্টাইল।
কোয়ান্টামমে থাকার সময় যত ব্যস্ততার মধ্যে থাকি না কেন, কোনোদিন গুরুজী দাদুর প্রোগ্রাম মিস করতাম না। আমি ক্লাস ওয়ান থেকে এসএসসি পর্যন্ত অর্থাৎ বাইরের জীবনে ইতিবাচকতা, নৈতিকতা, শিষ্টাচার, ধৈর্য, মানবতা যতটুকু শিখেছি, তার থেকে আরো বেশি শিখতে পেরেছি কোয়ান্টাম কসমো কলেজ থেকে।
[ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘সব সম্ভব’ বই থেকে ]
