১৯৩৪ সালের ৩১ অক্টোবর ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের চাঁন্দড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মো. আবদুল লতিফ মোল্লা এবং মাতার নাম আছিরননেসা।

- ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরের অধীনেই মূলত যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে আলফাডাঙ্গা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জসহ আশেপাশের অঞ্চলে বেশ কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালিত হয়। যুদ্ধের সময় তাঁর একমাত্র সন্তান (সাবু) শহীদ হওয়ার পরও তিনি দমে যাননি এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করে।
- শিক্ষা: তিনি টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
- তাঁর দুই স্ত্রী; নূরুন নাহার বেগম ও জাহানারা বেগম। তাঁদের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে।
- খেতাবের সনদ নম্বর ১৬৩।
- সম্মাননা:· মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত হন।
- · জাতীয় বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন দিনে তাঁর অবদান কে স্মরণ করা হয়।
- মৃত্যু ২০০৩ সালের ১৩ ই আগস্ট।
১৫ ডিসেম্বর ভোর পাঁচটা। সূর্যের আলো তখনো উঁকি দেয়নি। মুহু মুহু শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা ভাটিয়াপাড়া এলাকা। মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে। গোপালগঞ্জ জেলার উত্তরে কাশিয়ানী উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে মধুমতী নদীর তীরে ভাটিয়াপাড়া তার পাশে আলফাদাঙ্গা থানার টগরবন্দ ও কৃষ্ণপুর গ্রাম। সেখানে আছে ওয়্যারলেস স্টেশন। এই স্টেশন সহ ঘাঁটি ছিল বেশ সুরক্ষিত।
মুক্তিযোদ্ধারা তিনবার ওই ঘাঁটিটি আক্রমণ করে বার্থ হয়। দুই ইঞ্চি মর্টার দিয়ে তাঁরা অনেক রকেট ছোড়েন। কিন্তু ক্যাম্পের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি । ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানিদের এ ক্যাম্পটি দখল করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন মুক্তিযোদ্ধারা। মো. আবদুল মান্নান (এম এ মান্নান) সহযোদ্ধাদের নিয়ে ১৫ ডিসেম্বর এ ঘাঁটিতে আক্রমণ করেন। তাঁরা প্রথমে ওই ক্যাম্প অবরোধ করেন। এর মধ্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা ভাটিয়াপাড়ায় অবস্থানরত পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। কিন্তু তারা আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা তিন দিক থেকে আক্রমণ চালান। পাকিস্তানিরাও পাল্টা আক্রমণ করে।
পরে বয়রা সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার (বীর বিক্রম, পরে কর্নেল) নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা সেখানে উপস্থিত হন। অবশেষে ১৮ ডিসেম্বর একজন মেজরের নেতৃত্বে প্রায় অর্ধশত পাকিস্তানি সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
ফরিদপুর জেলায় সর্বপ্রথম তাঁর নেতৃত্বে আলফাডাঙ্গার গোপালপুরে সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল মুক্তিসেনার একটি দল গড়ে ওঠে। বেশির ভাগ সময় তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে দেশের ভেতরে ছিলেন। আলফাডাঙ্গা, কাশিয়ানীসহ বিভিন্ন স্থানে সাহসের সঙ্গে গেরিলাযুদ্ধ করেন।
মো. আবদুল মান্নান স্বাধীনতার পর কয়েক মেয়াদে গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মো. আবদুল মান্নানের বড় ছেলে (প্রথম স্ত্রীর একমাত্র সন্তান) এম এ শওকত, দুই ভাই এম এ সোবহান ও এম এ মতিন ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ছেলে শওকত ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে ৩৬ জনের একটি দলের নেতৃত্ব দিয়ে দেশে আসার পথে যশোরের আড়পাড়ায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অ্যামবুশে পড়েন। যুদ্ধে শওকত শহীদ হন। শহীদ শওকতের স্মরণে ১৯৭২ সালে চান্দড়া গ্রামে স্থাপন করা হয় ‘শহীদ শওকত স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা:
· ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে আলফাডাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
· ২৫ মার্চের পর দেশমুক্তির লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন।
· প্রশিক্ষণ: ভারতের চাকুলিয়া ক্যাম্পে।
· সেক্টর: ৮ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (পরবর্তীতে মেজর এম. এ. মঞ্জুর)।
· দায়িত্ব: আলফাডাঙ্গা থানা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
· যুদ্ধ এলাকা: যশোরের বয়রা সাব-সেক্টর, ফরিদপুর (কামারখালি, বোয়ালমারী), নড়াইল (আড়পাড়া, লোহাগাড়া), গোপালগঞ্জ (ভাটিয়াপাড়া, আরাকান্দি), যশোর (কালীগঞ্জ), পাকশী প্রভৃতি স্থানে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন।
· আহত হওয়া: ১৫ ডিসেম্বর ভাটিয়াপাড়ার যুদ্ধে আহত হন।
· ব্যক্তিগত ত্যাগ: তার পুত্র এম এ শওকত সাবু মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন, কিন্তু তিনি দমে না গিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান।
যুদ্ধোত্তরকালে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি স্থানীয় চাঁন্দড়া শহীদ শওকত স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় , চাঁন্দড়া মাদ্রাসা, আলফাডাঙ্গা আদর্শ ডিগ্রি কলেজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। এছাড়াও তিনি ফরিদপুর জেলা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর আত্মত্যাগ ও দেশগঠনে অবদানের জন্য তাঁকে আজও গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।
এম এ মান্নান একজন অত্যন্ত সাহসী ও দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যিনি ব্যক্তিগত ক্ষতি ও শোককে পাশ কাটিয়ে দেশমুক্তির সংগ্রামে নিরলসভাবে লড়াই করে গেছেন। শিক্ষা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদানও উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩ ও ঐতিহ্যে লালিত ফরিদপুর ।
কবির আহমেদ ,
সম্পাদক ও প্রকাশক আর এমজি বিডি নিউজ ২৪ ়কম।
