অপরাধী হয়ে জন্মায় না কোনো কিশোর

এ ইউ দৌলা
প্রকাশ: রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৫ পিএম
কিশোর বয়স মানেই এক অপ্রতিরোধ্য স্পৃহা, সীমাহীন শক্তি এবং দুর্নিবার এক কৌতূহল। ঝুঁকি নেওয়ার সাহস, নিজের আত্মপরিচয় তৈরি করার তীব্র তাড়না এবং সমাজ বা পরিমণ্ডলে নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সহজাত ইচ্ছা এই বয়সের মূল চালিকাশক্তি। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই বৈশিষ্ট্যগুলো মানবজাতির টিকে থাকা, বিকাশ এবং অগ্রগতির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এই অন্তর্নিহিত শক্তি থেকেই জন্ম নেয় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, এই শক্তি থেকেই সূচিত হয় পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সৃজনশীল বিদ্রোহ, এবং এই শক্তির হাত ধরেই যুগে যুগে গড়ে উঠেছে নতুন রাষ্ট্র, সমাজ ও সভ্যতা।
এই সেই মৌলিক শক্তি, যা বুকে নিয়ে ক্রিস্টোফার কলম্বাস অজানা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন; অসীম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুকে তুচ্ছ করে প্রাচীন নাবিকেরা জয় করেছিল উত্তাল মহাসমুদ্র। আজকের আধুনিক যুগে স্টিভ জবস, মার্ক জাকারবার্গ বা বিল গেটসদের মতো দূরদর্শীরা যে বিশ্ব বদলে দেওয়া প্রযুক্তি ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, তার পেছনেও কাজ করেছে প্রচলিত ধারা ভাঙার এই একই সাহসী স্পৃহা। ঝুঁকি নেওয়ার এই প্রবৃত্তি মূলত একটি দুর্দান্ত ইতিবাচক শক্তি।
কিন্তু এখানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গুরুতর সংকট রয়েছে। কিশোর বয়সে তরুণদের  অন্তরে এই তীব্র মানসিক শক্তির স্রোত বইতে থাকে বটে, কিন্তু সেই বয়সে জীবনের গভীর সত্য, মিথ্যা, ন্যায়, অন্যায়, দূরদর্শিতা বা দীর্ঘমেয়াদী প্রজ্ঞা বুঝতে তারা পরিপক্ব হয় না। তাদের এই আবেগী ও অপরিপক্ব মনস্তত্ত্বের সুযোগ নেয় একশ্রেণির স্বার্থপর ও কৌশলী গোষ্ঠী। তারা কিছু তাৎক্ষণিক লাভের প্রলোভন, অপরাধকে মহিমান্বিত করার যাদুকরী বুলি এবং ভুলকে সঠিক বলে চালিয়ে দেওয়ার কৌশল দিয়ে কিশোরদের সহজে বিপথে চালিত করে। তবে বর্তমান যুগে কিশোর অপরাধের যে বিপজ্জনক উত্থান দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ এই সমস্ত স্বার্থান্বেষী মহলের কারসাজি হলেও তার সাথে যুক্ত রয়েছে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ফাঁকফোকর।
মূল সমস্যাটি কিশোর শক্তির প্রাচুর্যে নয়, বরং তার পারিপার্শ্বিক বেড়ে ওঠার পরিবেশে। যখন একজন তরুণের এই বিশাল শক্তি ও নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ সঠিক দিকনির্দেশনা বা সুস্থ মেন্টরশিপ পায় না, তখন তারা সহজেই ভুল পথে হারিয়ে যায়। তুচ্ছ কোনো কারণে সংঘবদ্ধ হওয়া, গ্যাং কালচার তৈরি করা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শর্টকাটে সফল হওয়ার চেষ্টা—এগুলো আসলে তাদের ভেতরে জমে থাকা সেই অদম্য শক্তিরই সৃষ্টি; এবং সেগুলি যে দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ক্ষতিকর ভুল, ধ্বংসাত্মক ও বিপথগামী বহিঃপ্রকাশ তা তারা বুঝতেও পারে না। ভুল অনুভবে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তারা নিজের অজান্তেই অপরাধের গভীর জালে জড়িয়ে পড়ে।
কীভাবে সেই অভিশাপ মুক্তি সম্ভব?
এই বিষয়ে আরও লেখার আগে একটা স্পষ্ট লজ্জাজনক স্বীকারোক্তি মেনে নেয়া সব অভিভাবকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভেবে দেখুন, কিশোররা তো আমাদেরই সন্তান। তারা যখন পৃথিবীতে এসেছিল, তখন কি কেউ অপরাধী হয়ে জন্ম নিয়েছিল? নিশ্চয়ই না। তাহলে আজ তারা কেন অপরাধ জগতের বাসিন্দা হয়ে উঠছে?
এটি আসলে প্যারেন্টিং, সামগ্রিক অভিভাবকত্ব ও আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। আমরা তাদের সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বড় হওয়ার একটি সুন্দর ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারিনি। তাই, এই ব্যর্থতার দায় আমাদের সকলের। পিতামাতা হিসেবে আমরা দায়ী, সমাজপতি হিসেবে আমরা দায়ী, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমরা দায়ী, গণমাধ্যমের ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমরা দায়ী, এবং রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে সরকার ও নীতিনির্ধারকরাও এর দায় এড়াতে পারেন না। আজকের ১৭ বছরের যে কিশোরটি কোনো ভয়ানক অপরাধ সংঘটিত করে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, তার সেই অপরাধের পেছনে বিগত ১৭ বছরের পারিবারিক ও সামাজিক অভিভাবকত্বেরই দীর্ঘ দায়ভার লুকিয়ে রয়েছে।
তাহলে এই অন্ধকার জগৎ থেকে বাঁচার উপায় কী? কীভাবে আমরা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করব?
অপরাধের অন্ধকার থেকে মুক্তির উপায়: তিনটি কৌশল
কৌশল গুলি অত্যন্ত সহজ কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে শক্তিশালী। এই তিনটে কৌশলের প্রথম এবং তৃতীয়টির জন্য কোনো অর্থ খরচ নেই, শুধু দরকার একটুখানি সচেতনতা আর  আন্তরিক ইচ্ছে। অবশ্য দ্বিতীয় কৌশলটির বাস্তবায়ন বেশ ব্যয় সাপেক্ষ এবং সেখানে   রাষ্ট্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা দরকার। আসুন দেখি কৌশলগুলো কী:
১ আত্মসম্মানবোধের কাল্টিভেশনঃ কিশোরদের অন্তরে নতুন করে আত্মসম্মানবোধের বীজ রোপণ করতে হবে। বিশুদ্ধ সততা, দায়িত্ব, কমিটমেন্ট, এবং নৈতিক আচরণের বিষয় গুলিকে সামনে এনে তাদেরকে সামাজিকভাবে অনেক বেশি মর্যাদা দিতে হবে।  ভুল করেও কখনো তাদের সাথে অবমাননাকর বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। তাদের ভেতরে এই বিশ্বাস জন্মাতে হবে যে তারা অত্যন্ত মূল্যবান মানুষ। সম্মান পাওয়ার এই অনুভূতিকে তাদের মানসিক অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। একবার যখন তারা নিজেদের কাজের জন্য নিজেদের শ্রদ্ধা করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে, তখন তারা নিজ থেকেই সেই সম্মান রক্ষার জন্য অপরাধমূলক কাজ থেকে দূরে থাকবে। মাদক বা নেশার জগৎ তাদের টানবে না; বরং নিজেদের সম্মানকে আরও উঁচু করতে তারা আরও সৃজনশীল, পরিশ্রমী ও পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে উঠবে।
২. সৃজনশীল পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি: তাদের এই অফুরন্ত শক্তিকে ইতিবাচক দিকে নিয়ে আসার জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোতে পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য উন্মুক্ত মাঠ ও ক্লাবের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ, মানসম্মত পুষ্টি এবং বিশ্বমানের আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
৩. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: শিশু-কিশোরদের কেবল নিজ নিজ পরিবার বা বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত সন্তান হিসেবে দেখার সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের দেখতে হবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অমূল্য সম্পদ হিসেবে।
কিশোরদের ভেতরের আগুনকে দমন বা ধ্বংস করার চেষ্টা করা মানে সভ্যতার মূল শক্তিকে ধ্বংস করা। প্রয়োজন কেবল পরম মমতায় তাদেরকে হাত ধরে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া, যেন তারা তাদের মেধা, সাহস ও শক্তি দিয়ে সমাজের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে।
লেখক পরিচিতি:
এ ইউ দৌলা
মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক