অতি সম্প্রতি ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেন নামক এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশের মানুষ বলা যায় শোকে মুহ্যমান। আমিও একজন মানুষ হিসেবে এই এতিম ছেলেটির জন্যে চোখের অশ্রু সংবরণ করতে পারছি না; সে জন্যে এই লেখা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ( ঢাবি ) নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। ’প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয় তার গৌরবের শতবর্ষ পূর্ণ করেছে ২০২১ সালে। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেকেই দেশে বিদেশে মেধার ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়েছেন, ছড়িয়ে যাচ্ছেন এখনো। সে জন্যেই উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীর আকাঙ্খা থাকে এখানে ভর্তি হওয়ার। স্বাভাবিকভাবে, তেমনই স্বপ্ন ছিল আমারও। ঢাকা এসে যখন কার্জন হলের সামনে দাঁড়াতাম, শিক্ষার্থী পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল রঙের বাসগুলো ছুটে যেতে দেখতাম; তখন মনের মধ্যে যেন না পাওয়ার বেদনা কাজ করত। যে কারণে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হয়েও কিছুকাল পড়ার পর চলে এলাম; ভর্তি হলাম ইতিহাস বিভাগে। সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল কি ছিল না; সেটা অন্য বিষয়। এখানে আমি শুধু কিছু কথা সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমাকে সংযুক্তি দেয়া হল ‘উত্তরপাড়া’র একটি হলে। বাইরে থেকে পড়াশোনা করার সমস্যা বলে আমি আমাদের জেলার এক ভাইকে ধরে উঠলাম তথাকথিত এক গণরুমে। তিনিও ওই রুমে থাকতেন; করতেন রাজনীতি। যে কোন জায়গায় নতুনদের মেনে নিতে পুরনোদের কেউ কেউ আপত্তি করেন; আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হল না। বিশেষ করে আমি যার সাথে বেড শেয়ার করলাম; তিনি আমার ইয়ারমেট হলেও বেশ একটু বিরক্ত হলেন বুঝলাম। কারণ বেশ কিছুদিন তিনি নাকি একা একা ঘুমাতেন। তবে একসময় নমনীয় হয়ে গিয়েছিলেন তিনি ( অবশ্য অনেক পরে জেনেছিলাম, তিনি অন্য হলের ছাত্র। কিন্তু পিতৃহীন বলে সবাই তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলাম। ); আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে গেলেন অন্যান্য সবাইও।
আমাদের রুমে তুমুল আড্ডা হত। বিভিন্ন জেলার, বিশেষ করে দক্ষিণ বঙ্গ আর পূর্ববঙ্গের অধিবাসীরাই ছিলাম ওই সময়ে। বাংলা, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকল্যাণ, অর্থনীতি, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইসলামিক স্টাডিজ, মার্কেটিং ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের ছাত্ররা ছিলেন। ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়, আঞ্চলিক বিষয়, অতীত ও বর্তমান বিষয়সহ কি না থাকত সে সব আলোচনায়। দেখা গেল এর মধ্যেই কেউ কেউ ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার পড়া পড়ছেন; আবার আলোচনায়ও মাঝে মাঝে অংশ নিচ্ছেন। অথচ তখনকার সময়ে সবচেয়ে চমৎকার রিডিং রুমটি ছিল আমাদের হলে ; যদিও আমাদের কেউ বেশি একটা যেতাম না সেখানে। সেই নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে কাছাকাছি হলগুলো ছাড়াও কার্জন হল এলাকার আবাসিক ছাত্রদেরও অনেকে চলে আসতেন এখানে পড়তে; অথচ আমাদের হলের ছাত্ররা কখনোই তাতে বিরক্তিবোধ করেননি। আমাদের সকলের মধ্যে একটা চেতনাই কাজ করত, আর তা হল আমরা গৌরবময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী; আমরা একই পরিবারভুক্ত।
আমাদের গণরুমে মোট বেড ছিল পাঁচটি। স্বাভাবিকভাবেই কেউ চলে গেলে তাঁর জায়গায় নতুন একজন আসতেন; ফলে সবসময় দশ জন ছাত্রই থাকতাম ( এর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অনাবাসিক )। অনেক সময় কারো আত্নীয়-স্বজন বা নবাগত কোন ছাত্র এলে আমরা অম্লান বদনে অতিথিদের অনুকুলে বেড ছেড়ে দিয়ে মেঝেতে আরামসে ঘুমাতাম। ওই ব্লকের ছাত্রদের ওয়াশ রুম আমাদের রুম সংলগ্ন ছিল; ফলে সবসময় এমোনিয়ার সুবাতাস(!) সইতেই হত। তা নিয়েও কোন মাথা ব্যথা ছিল না আমাদের। মাঝে মাঝে রুমেই রান্না করা হত; অবশ্য হলে ডাইনিং-ক্যান্টিন তো ছিলই।
একবার হল পরিদর্শনের সময় সম্মানিত আবাসিক শিক্ষকদের মধ্যে একজন হাসতে হাসতে বলেই ফেললেন যে, আমরা নাকি ঘরবাড়ির মতই করে ফেলেছি রুমটিকে। এমনকি অন্যান্য চার শয্যাবিশিষ্ট ’এলিট’ রুমের বাসিন্দাদের কেউ কেউ আড়ালে আবডালে বা রসিকতার ছলে ‘বস্তি’ বলতেও ছাড়তেন না।
অথচ মহান আল্লাহর কৃপায় ওই রুম থেকেই একই নামের দু’জন ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন, বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন দু’জন, একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা হয়েছেন, দু’জন রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকের সম্মানজনক পদে আছেন; কেউ কেউ হয়েছেন প্রতিষিঠত ব্যবসায়ী; কেউ কেউ হয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত শিক্ষক; উন্নত রাষ্ট্রের বাসিন্দা ইত্যাদি। মজার বিষয় হল, আমাদের কাউকে কোন রুমে একক সিট বরাদ্দ দিলেও সেখানে দু;একদিন থেকে আবার ফিরে আসতাম সেই গণরুমে। কেন জানি না, নিরিবিলি নতুন রুমে ভালো লাগত না কারোই।
সেই যে প্রাণের প্রকাশ, সেই যে আমার আর আমার মামার সাহিত্য চর্চা, হলের বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতায় পুরস্কার অর্জন, বিভিন্ন ম্যাগাজিন ( দেয়াল পত্রিকাসহ) প্রকাশ, আমাদের এক রুমমেটের বিটিভি-তে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সম্মিলিত অংশগ্রহণ; এমন অনেক কিছুই ছিল, যা আমাদের একীভূত করে রেখেছিল। এটা ঠিক যে, শিক্ষাজীবনের শেষদিকে বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কেউ কেউ একক রুমে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম; তবে সকলের মধ্যে বন্ধন ছিল অটুট।
আমাদের মধ্যে যে একেবারে মনোমালিন্য হত না, তা কিন্তু নয়; কারণ মানুষ হিসেবে সেটাই ছিল স্বাভাবিক। তবে কখনোই তা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যায়নি; হাতাহাতি পর্যায়ে তো নয়ই। কারো কারো মধ্যে এমনটি হলে সাথে সাথেই বাকিরা তা মিটিয়ে ফেলতাম। একবার ক্যাম্পাসে আমাদের জেলার দু’জনের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি থেকে কিছুটা হাতাহাতির ঘটনা ঘটে গেল। গুরুতর বিষয় হল, জুনিয়র ছাত্র সিনিয়রের সাথে অসম্মানজনক আচরণ করে বসলেন। জুনিয়র ছিলেন আমার বন্ধু; তবে পিতৃহীন। তাঁরা কেউ কাউকে চিনতেন না; কিন্তু আমি দু’জনকেই চিনতাম । তাঁরা কেউই আমাদের হলের ছাত্র নন; তবে সিনিয়র ছাত্র তাঁর বন্ধুদের সূত্রে আমাদের রুমে প্রায়ই আসতেন ( এখন তিনি একটি বড় রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন)
। তিনি সক্রিয় রাজনীতি করতেন বলেই পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠল। কিন্তু আমি নিরীহ একজন ছাত্র হলেও চুপচাপ বসে থাকতে পারলাম না; মাথা গরম বন্ধুটিকে ক্যাম্পাসে যেতে নিষেধ করে বেরিয়ে পড়লাম কাজে। আগে ক্যাম্পাসে জেলার সব ছাত্রছাত্রীদের বিষয়টি অবহিত করে এরপর গেলাম ঢাকা শহরে থাকা এলাকার বিশিষ্টজনদের কাছে। সবাইকে বলে দিলাম সেদিনই সন্ধ্যায় সমঝোতামূলক বৈঠকে বসা হবে আমাদের গণরুমে। শেষে গেলাম সিনিয়র ছাত্র ভাইটির কাছে। তিনি আমারই বয়সী, স্বভাবেও নরম; তবু আমার প্রস্তাব শুনে প্রথমে খুব ক্ষেপে গেলেন। তবে বন্ধুটির বাবা নেই, বড়ভাইটিও মৃত্যুপথের যাত্রী – এ সব তথ্য দিয়ে তাঁকে অনেকটা শান্ত করলাম। অবশেষে আমাদের রুমে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সমঝোতামূলক বৈঠক বসল। সেখানে শিক্ষার্থী- আমন্ত্রিত মিলে প্রায় অর্ধশতজন উপস্থিত ছিলেন। বন্ধুটিকে দিয়ে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে তবে সেই গুমোট আবহাওয়াকে অবশেষে সুবাতাসে পরিণত করা সম্ভব হল। এ জন্যে পরবর্তীকালে সব জানতে পেরে বন্ধুটির মা আমাকেসহ অচেনা সবাইকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।
একবার আমার মেজো ভাইয়ের এক বন্ধুর কাছে বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউটে ( বর্তমানে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ) বরাবরের মত গিয়েছি। আমাকে দেখে তিনি তক্ষুনি বেরিয়ে পড়লেন তাঁর বোনের বাসার উদ্দেশ্যে,নারায়নগঞ্জে। একদিন পর সেখান থেকে গেলাম কেরাণীগঞ্জ। আমি অবশ্য মৃদু আপত্তি তুলেছিলাম রুমমেটদের কথা ভেবে। কিন্তু ভাই আমাকে বললেন যে, আমার রুমমেটরা তো তাঁর কাছে প্রায়ই যাওয়ার কথা জানেন; অতএব সমস্যা নেই।
কিন্তু তিনদিন পর রুমে ফিরে দেখি এক অন্যরকম দৃশ্য। প্রায় সবাই আমাকে আবেগবশে জড়িয়ে ধরলেন; কারো কারো চোখ অশ্রু। সবাই দেখি প্যান্ট শার্ট পরে রেডি হয়েছেন; হল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, থানায় যাবেন নিখোঁজ ডায়েরী করতে। আমি ভীষণ অনুতপ্ত হলাম; সকলের নিকট গভীর দুঃখপ্রকাশ করলাম। কিন্তু রুমমেটদের একটাই কথা, কোন ‘সরি’ প্রকাশের প্রয়োজন নেই; আল্লাহর অসীম রহমতে আমাকে যে তাঁরা সুস্থভাবে ফিরে পেয়েছেন এটাই স্বস্তির। তৎকালীন প্রভোস্ট স্যার ছিলেন বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক; আমাকে স্নেহ করতেন। তিনিসহ সম্মানিত আবাসিক শিক্ষকবৃন্দ চিন্তিত ছিলেন আমার ব্যাপারে। তাঁদের কাছে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। আমার প্রত্যাবর্তনের সংবাদে সবাই নিশিন্ত হলেন, স্বস্তি প্রকাশ করলেন।
এত বছরের হল জীবন নিয়ে তো এখানে খুব বেশি কিছু লেখার অবকাশ নেই; তবু একটা ঘটনার কথা লিখছি। একবার আমার পরবর্তী নতুন রুমের জুনিয়র রুমমেট বাড়িতে গেছেন। একদিন এক লোক আমাদের রুমে এলেন তাঁর জ্ঞাতি ভাই পরিচয়ে। রুমের সিনিয়র হিসেবে আমিই তাঁর দায়িত্ব নিলাম। খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে তাঁর সুবিধা অসুবিধাগুলোর দিকে লক্ষ্য রাখলাম। তখন তো সেল ফোনের যুগ নয়, সে জন্যে ভদ্রলোকের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার কোন উপায় ছিল না; তা ছাড়া আমি তাঁকে সন্দেহও করিনি। যথারীতি রাতের খাবারের সময় অতিথিকে ভালোভাবে খাইয়ে তাঁকে মশারি পর্যন্ত টানিয়ে দিলাম। ক্লান্তির জন্যে ভোরে উঠতে একটু দেরি হয়ে গেল; হল মসজিদের আজানও শুনতে পাইনি বলে নামাজে যেতে পারিনি।
কোনদিকে না তাকিয়ে ওয়াশ রুমে গেলাম; তারপর নিচে গেলাম ক্যান্টিনে কি খাবার আছে তাই দেখতে। ফিরে এসে দেখি ভদ্রলোক নেই। ভাবলাম ওয়াশ রুমে গেছেন। দীর্ঘ সময় না আসাতে তাঁকে খুঁজতে সেখানে গেলাম; কিন্তু দেখলাম কেউ নেই। তাড়াতাড়ি রুমে এসে দেখতে পেলাম, রুমমেটরা তখনো ঘুমাচ্ছে। আমার চাবিটা টেবিলের ওপর ছিল; দেখা গেল ড্রয়ারটা খোলা। বেশ কিছু টাকা সেখানে রাখা ছিল; স্বাভাবিকভাবেই তা নেই। আর আমার খুব শখের লুঙ্গিটা তাঁকে পরতে দিয়েছিলাম; সেটাও আগন্তুক অনুগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। কাউকে কিছু জানালাম না; কারণ এ ধরণের লস্ দিতে আমি কিঞ্চিৎ অভ্যস্ত। তবে ওই রুমমেট বাড়ি থেকে আসার পর শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, তাঁর এ রকম কোন ভাই আছেন কি না। আমার স্নেহভাজন রুমমেট না সূচক জবাব দিলেন। বুঝতে পারলাম, কোন এক ঠান্ডা মাথার প্রতারকের সেবার ভার নিয়েছিলাম আমি।
আমাদের এলাকার এক স্নেহভাজন ছোটভাই একই ব্লকের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তাঁর এক চাচা মাঝে মাঝে আসতেন ভাতিজা’র কাছে। জীবনে ভালোবাসার এক জটিল ধারায় তাঁর যে কিছুটা মানসিক সমস্যা ছিল, তা ওই ছাত্রের রুমমেটরা সহ জানতাম মাত্র কয়েকজন। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা কারণেই অনেকে দেরিতে ঘুমাতে যান। সে জন্যে মাঝরাতের ঘুমটা খুব গভীর হয়ে থাকে; সর্বত্রই বিরাজ করে পিন পতন নিরবতা।
তো একদিন এমনই এক মাঝরাতে, অনুমান দু’টো আড়াইটা বাজে; হঠাৎ প্রচন্ড আর্ত চিৎকার। অনেকেই চমকে উঠলেন- গভীর উদ্বেগে, উৎকন্ঠায়। কেন না রাজনৈতিক বা অন্যান্য কারণে অনেক সময় অনেক অঘটন ঘটে যেতে পারে। তবে ঘুমের রেশ কেটে যেতেই বুঝতে পারলাম আমাদের ব্লকের ওই ছোট ভাইয়ের রুম থেকেই এমন চিৎকার ভেসে আসছে। আমাদের হলটি উত্তর-দক্ষিণ এই দু’ব্লক মিলিয়ে মোট দশতলা বিল্ডিং; ছাত্রদের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। আমরা সবাই ছুটলাম নির্দিষ্ট রুমের দিকে; অন্যান্য রুমের অনেক ছাত্র ছুটে এলেন; সাথে সাথে ছুটে এলেন আবাসিক শিক্ষকবৃন্দ।
এখানে প্রসঙ্গত বলছি, সে সব সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দের একাধিকজন পরবর্তীকালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জেনেছি। যা হোক, আমি তো মনে মনে ভয় পাচ্ছিলাম ব্যাপারটা যদিও মানবিক; কিন্তু ওই অসুস্থ ভদ্রলোক তো বহিরাগত; সে জন্যে যদি তাঁর ভাতিজার সিট সংক্রান্ত কোন সমস্যা হয়! কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, তাঁর রুমমেটদের কথা বাদই দিলেও অন্যান্য ছাত্রদের চোখে মুখেও বিন্দুমাত্র বিরক্তির চিহ্নমাত্র নেই।
সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দের সবাই খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তক্ষুনি বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রের যে কোন একজন চিকিৎসক পাঠানোর জন্য টেলিফোনে অনুরোধ করা হল। অল্প সময়ের মধ্যে চিকিৎসক এসে ব্যবস্থাপত্র দেয়ার পর কয়েকজন ছাত্র ছুটলেন নীলক্ষেতের দিকে; কোনো দোকান থেকে ওষুধ আনা যায় কি না সে জন্যে।
আমার এলাকার ছোট ভাইটি দেখি মুখের ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছেন; আর আমার দু’চোখে অশ্রু চিক্ চিক্ করছে অসীম কৃতজ্ঞতায়। মনে হচ্ছিল, আমার এলাকার ওই ভদ্রলোক যেন সকলের আত্নার আত্নীয়, পরম প্রিয়জন।
অথচ তার আগে আমি লজ্জাবোধ করছিলাম এই ভেবে যে, এই বুঝি আমাদের উপজেলা, জেলা নিয়ে নানা কথা উঠবে। ভাবলাম, মানুষের মধ্যে এত ভালোবাসা, এত আবেগ কোথায় থাকে ! চারদিকে এত হানাহানি, মারামারিি, এত অশান্তি; তার মধ্যেও আলোবাসার বাগানের লাল গোলাপটি এমন করে কি ভাবে ফোটে ! তবে হতাশা নিয়ে শুনেছি, আমাদের সময়ের বেশ পরে আমাদের সেই হলটিতে, সেই ‘গণরুম’টিতে নাকি অনেক অশান্তি হয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক হৃদয়বিদারক ঘটনাটির কথা শুধু ভাবি। একই দেশ, একই আলো হাওয়ায় বেড়ে উঠা কিছু কিছু মানুষ কেন এত নিষ্ঠুর হয়! একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানব সন্তানকে অপ্রমাণিত চুরির অভিযোগে পিটিয়ে, এরপর তাঁকে খাবার খাইয়ে, পুনরায় নির্মমভাবে নির্যাতন করে কি ভাবে হত্যা করা হল? আর যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ‘মজা’ দেখলো, তারা কি রক্ত মাংসের মানুষ? মনুষ্যত্ববোধ বলে কি তাদের মধ্যে কিছুই ছিল না? বুয়েট-এর আবরার ফাহাদ -এর ‘মেধাবী’ হত্যাকারীদের পরিণতি কি একবারও কারো মনে পড়ে নি? এ ক্ষেত্রে হল প্রশাসনেরও কি কিছুই করার ছিল না? হায় ! আমার স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ সব দেখে শুনে, তোমার নিরেট হৃদয় কি একটুও কম্পিত হয় না?
( নিবন্ধকার পেশায় ব্যাংকার। রচনাকাল – ২১শে সেপ্টেম্বর’২০২৪, মুজগুন্নী আ/এ, খুলনা। ছবি – সংগৃহীত )
আমরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম- শেখ শাহাদাৎ হোসেন
