ভালো ছাত্র হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া বেশি প্রয়োজন
লেংঙি ম্রো
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ৬ অক্টোবর ২০২৪
আমার অব্যক্ত কথা
কলেজে পড়ার সময় প্রায়ই চিন্তা করতাম—কোয়ান্টাম আমার পেছনে এত টাকা খরচ করছে, আমি কেমন করে সেটা শোধ করব? কোয়ান্টামের প্রতি আমার যে ঋণ, সেটা অর্থের মূল্যে পরিমাপযোগ্য নয়। কিন্তু কোনো না কোনো উপায়ে সেই ঋণের রিটার্ন দিতে হবে। যখন একাকী থাকতাম তখন এ বিষয়গুলো আমার মনে চিন্তার উদ্রেক ঘটাত।
আমি স্বভাবগতভাবে একটু চিন্তা করতে ভালবাসি। কেননা আমি উপলদ্ধি করেছি, আমি যখন কোনো বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি তখন কোনো না কোনো প্রশ্নের সমাধান, নতুন নতুন উদ্ভাবনী আইডিয়া পেয়েছি। বলতে পারেন এটা মেডিটেশনের ইফেক্ট। যা-হোক, দিনকয়েক এসব বিষয়ে চিন্তা করার পরে আমার বোধোদয় হয়। আমি বুঝলাম, ভালো মানুষ হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
ভালো ছাত্র হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া অধিকতর প্রয়োজন। কোয়ান্টামের মূল শিক্ষা এটাই। ভালো মানুষ হতে হবে। আমি তখন মনস্থির করলাম—সুযোগ পেলে জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসব। তাহলে কোয়ান্টামের প্রতি আমার যে ঋণ রয়েছে সেটা কিছুটা হলেও শোধ করতে পারব।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রসঙ্গ
আমি চিন্তা করলাম, মানুষের জন্যে কাজ করতে গেলে নিজের একটা অবস্থান থাকা প্রয়োজন। আমি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পাই তাহলে ফিরে গিয়ে জুমচাষ করতে হবে। তাই আমাকে যে-কোনো মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নবম-দশম শ্রেণিতে কিছুটা ধারণা পেয়েছিলাম। কিন্তু চান্স পেতেই হবে এমন মনোবল তখনো তৈরি হয় নি। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় ঢাকা থেকে কোয়ান্টামের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক আমাদের কলেজে এসে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা ও অনুপ্রেরণা দিয়ে যেতেন। তাদের অনুপ্রেরণামূলক কথা শুনলে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যেত। এমনভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে যেতাম, মনে হতো যেন দিনরাত পড়াশোনা করি।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজির গুরুত্ব বুঝাতে ইমরান ভাই (কোয়ান্টামের স্বেচ্ছাসেবক) আমাদের প্রতিদিন ইংরেজিতে ফ্রি হ্যান্ড রাইটিং চর্চা করা আর ভোকাবুলারি শেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমি টানা তিন মাস ফ্রি হ্যান্ড রাইটিং চর্চা করতাম। আর ইংরেজি শব্দ খাতায় লিখে লিখে মুখস্থ করতাম। আমার কাছে এসব কাজ বিরক্তিকর লাগত না; বরং উপভোগ করতাম।
আমি ক্লাস সেভেন থেকে রিডার্স ডাইজেস্ট, কারেন্ট ওয়ার্ল্ড পড়ে এসেছি। যার ফলে ইংরেজি আমার কাছে অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় সহজ লাগত আর সাধারণ জ্ঞান পড়তে খুব ভালো লাগত। যে কথাটা না বললে সারাজীবন আক্ষেপ রয়ে যাবে সেটা হচ্ছে—নবম শ্রেণির শুরুতে আমাদেরকে হিসাবের ডেবিট-ক্রেডিট মানে ব্যবসায় শিক্ষা ধরিয়ে দেয়া হলো। আমার খুব ইচ্ছে ছিল সায়েন্সে পড়ার। কিন্তু সেটা হয় নি। স্কুলে তখন সায়েন্স ছিল না।
কর্মাস থেকে পালানোর জন্যে এইচএসসি-র পরে মনস্থির করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মাসের সাবজেক্ট নিয়ে পড়ব না। যেই ভাবা সেই কাজ। এইচএসসি পরীক্ষার পর আমরা খুব সম্ভবত তিন বা সাড়ে তিন মাসের মতো
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি নেয়ার সময় পেয়েছিলাম। এখানে একটা কথা বলে রাখি, আমাদের আগের ব্যাচের বড় ভাইয়েরা চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করেছিলেন। আমাদেরকে চট্টগ্রামে নিয়ে যায় নি, তাই আমরা শুরুর দিকে খুব মন খারাপ করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আদৌ চান্স পাব কিনা এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতাম আর মন খারাপ করতাম। যা-হোক, সৃষ্টিকর্তার নামে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে ও সকলের দোয়ায় আমি চান্স পেলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে।
আমার নিজস্ব কোচিংয়ের যাত্রার গল্প
তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ২০১৭ সালের জুলাই মাসের ১৭ তারিখ। সেদিন বিকেলে মেসে গিয়ে দেখি আমাদের রুমে চার জন অতিথি। তারা সবাই ম্রো জনগোষ্ঠীর। তারা আমার রুমমেটদের সাথে আলাপ করছিল। তাদের সাথে আলাপে যোগ দিয়ে জানতে পারলাম তারা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ের জন্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসেছে। ক্যাম্পাস থেকে শহরের কোনো একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হবে। চট্টগ্রাম শহরের ব্যাপারে তাদের আইডিয়া কম।
তাই তাদের বললাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। ক্যাম্পাস থেকে প্রতিদিন কোচিংয়ে যাওয়া—আসা করা কষ্টকর হবে। পড়াশোনা করার সময় পাবে না। সব মিলিয়ে তোমাদের জন্যে খুব চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে। আমার কথা শুনে তারা চিন্তিত হয়ে যায়। তাদেরকে বললাম, তোমাদের দুইটা অপশন দেবো। তোমরা শহরে গিয়ে কোচিং করতে পারো। অথবা তোমরা যদি চাও আগামীকাল থেকে আমার কাছে পড়তে পারো। এটার জন্যে আমাকে কোন সম্মানী দিতে হবে না। ফ্রি-তে পড়াব। একথা বলে তাদেরকে ১০ মিনিট ভাবার সময় দিলাম। ১০ মিনিট চিন্তাভাবনা করার পরে তারা জানায় আমার কাছে পড়বে।
আমি তাদেরকে নিয়মকানুন বলে দিলাম। প্রস্তুতির কলাকৌশল শিখিয়ে দিলাম। শুরুতে চার জন হলেও পরে আরো তিন জন তাদের সাথে যোগ দেয়। মোট সাত জন ছাত্রকে নিয়ে প্রফেশনালি কোচিং জগতে আমার পদার্পণ। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সাত জন থেকে পাঁচ জন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়।
তাদের চান্স পেতে দেখে আমার কনফিডেন্স আরো বেড়ে যায়। এরপরের বছর প্রায় ১৫ জনকে পড়াই। এদের মধ্য থেকে ২/৩ জন পারিবারিক সমস্যার
কারণে বাড়িতে চলে যায়। সেই বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে ১০ জন চান্স পায়। এরপর এটা নিয়ে ‘সারাবাংলা’ নিউজে আমি একটি সাক্ষাৎকার দেই। সেই সাক্ষাৎকারটা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী আমার উদ্যোগের ব্যাপারে জানতে চান, আমার গল্প শোনার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করেন। মূলত তখন থেকে আমার পরিচিতি বাড়তে শুরু করে। দেখা গেছে ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষার ভাইভাতেও স্যারেরা একাডেমিক প্রশ্ন যতটা না জিজ্ঞেস করেন, তার চেয়ে আমার কোচিং কেমন চলছে, কতজন চান্স পেয়েছে এসব ব্যাপারে জানতে চান।
কোচিংয়ের বাইরে পরিচিতদের রেফারেন্স ছাড়া আলাদাভাবে আমি কাউকে পড়াই নি। কোচিং থেকে মোট ৫২ জন শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতে সক্ষম হয়েছে, যা আমার জীবনের সেরা অর্জনগুলোর মধ্যে একটি। আমার এসব অর্জনের পেছনে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের অবদান অনস্বীকার্য। কেননা ফাউন্ডেশন না থাকলে আমি কিছুই হতাম না। আমার আইডেন্টিটি সৃষ্টি হতো না।
নিজেকে যে জায়গায় দেখতে চাই
অনার্স থার্ড ইয়ার পর্যন্ত আমার ইচ্ছে ছিল উচ্চশিক্ষার জন্যে ইউরোপে পাড়ি জমাব। প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। ইউরোপে যাওয়ার জন্যে থার্ড ল্যাংগুয়েজ হিসেবে স্প্যানিশ ভাষাও প্রায় তিন মাস রপ্ত করার চেষ্টা করেছিলাম।
এরপর অনেক ভেবেচিন্তে মনস্থির করলাম স্কলারশিপের জন্যে চেষ্টা করব না। দেশেই থাকব। বিসিএস দেবো, একজন ভালো সরকারি কর্মকর্তা হবো। এখন সেই পথেই আছি। জানি না এই পথের শেষ কবে হবে। চেষ্টা চলছে, চলবে।
[ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘সব সম্ভব’ বই থেকে ]
