এ ইউ দৌলা
ফ্রিডম, লিবার্টি, আর স্বাধীনতা—আমাদের জীবনের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা। আমরা না খেয়ে থাকতে পারি, সমস্যা নেই; কিন্তু স্বাধীনতা আমার চাই। আমরা রাজপ্রাসাদের বন্দী জীবন চাই না। আমরা চাই স্বাধীনতা, মাটির কুঁড়েঘর হলেও স্বাধীনতা যেন থাকে। আমরা উড়তে চাই, ঘুরতে চাই, যা ইচ্ছে তাই করার স্বাধীনতা চাই। সত্যি বলতে কি, এই একটি মাত্র শব্দ, এই একটি আকাঙ্ক্ষাতেই যেন আটকে আছে জগত। ইতিহাস জুড়ে রক্তের বন্যা বয়ে গেছে শুধু এই স্বাধীনতার জন্য। জগৎজুড়ে যত যুদ্ধ, যত বিদ্রোহ, যত বিপ্লব, তার সব কিছুর মূলে ঐ একটি অনুভব: পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্তি চাই আমরা। শব্দটি এতটাই শক্তিশালী যে, পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রের রাজনীতিই এখন এই একটি শব্দকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
“আমরা আপনাকে আরও স্বাধীনতা দেব।
আমাদের সরকার আপনাকে আরও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা এনে দেবে।
আমরা আপনাকে বাক স্বাধীনতা দেব, আমরা আপনাকে দেব আপনার ইচ্ছের স্বাধীনতা।”
এগুলোই আধুনিক রাষ্ট্রের সব রাজনীতির মূল স্লোগান। কিন্তু কখনো কি একটু গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, স্বাধীনতা আসলে কী? স্বাধীনতার সংজ্ঞা কি? এই ছোট্ট শব্দটির মূল অনুভবে আসলেই কি লুকিয়ে আছে?
১৮০৬ সালের ১৪ অক্টোবর ইয়ে না শহরের সারা আকাশ কাঁপছিল কামানের গর্জনে। নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী তখন জার্মানির মাটিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে। রাস্তার ওপর পড়ে আছে সৈন্যের মৃতদেহ আর ভেঙে পড়া ঘোড়ার গাড়ি। জানালার কাঁচ ভাঙার শব্দে কেঁপে উঠছে সারা শহর। ঠিক সেই চরম নৈরাজ্যের মাঝে একটি নিভৃতে ঠান্ডা ঘরে বসে ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী এক মানুষ। তাঁর নাম গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল।
টেবিলে ছড়িয়ে আছে কাগজের স্তূপ। কালির দোয়াত থেকে বারবার কলম ডুবিয়ে তিনি লিখে চলেছেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের শেষ পাতাগুলো; বইটির নাম ‘দ্যা ফেনমেনলজি অব স্পিরিট’। হেগেলের তখন কোনো স্থায়ী চাকরি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান কিন্তু বেতন প্রায় শূন্য। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য উত্তরাধিকার শেষ হওয়ার পথে। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি এক জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। বাইরের কামানের গর্জন আর ঘরের ভেতরের কলমের ঘর্ষণের মধ্যে এক অদৃশ্য সুতোর টান; তিনি লিখছিলেন স্বাধীনতার কথা। লিখছিলেন এমন এক সত্যের কথা, যা পরে ইউরোপের পুরো দর্শনচিন্তাকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
হেগেল যখন এই বইটি লিখছিলেন তখন ফরাসি বিপ্লব যে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কেন বীভৎস গিলোটিনে পরিনত হল, সেই প্রশ্নটি তাঁকে তাড়া করে ফিরছিল। তিনি দেখেছিলেন মানুষ যখন কোনো নিয়ম ছাড়া স্বাধীনতা ভোগ করতে চায় তখন তা কত ভয়ঙ্কর ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়। নিয়ম না মানা মানুষের হাতে স্বাধীনতা নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে ফেলে। হেগেল বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীনতা মানে কোনো আকাশকুসুম কল্পনা নয়। স্বাধীনতা মানে হলো অন্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ন্যায়ের মানদণ্ডে নিজেকে চেনা।
মানুষ একা একা কখনো স্বাধীন হতে পারে না। আপনি যদি নিজেকে স্বাধীন করতে চান তবে আপনাকে অন্য একজনের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। এখানে হেগেল মনিব, ভৃত্য এবং তাদের চিরন্তন দ্বন্দ্বের একটি রূপক গল্প বলেছেন। মনিব শুধু ভোগ করে আর ভৃত্যের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায় করে। অন্যদিকে ভৃত্য ভয়ে ভয়ে প্রতিদিন বাধ্য হয়ে কাজ করে। সে কাঠ কাটে আর মাটিকে ফসলে রূপান্তর করে। কিন্তু ধীরে ধীরে ভৃত্য তার কাজের ভেতর দিয়েই সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে; নিজের চিন্তাকে সে বাস্তবে রূপ দেয়। মনিব যখন শুধু ভোগ করে জীবন শেষ করে, তখন ভৃত্য তার শ্রমের সৃষ্টিশীলতায় এক গভীর স্বাধীনতা অর্জন করে। মনিব বল প্রয়োগ করে ভৃত্যের যে স্বীকৃতি আদায় করে সেই স্বীকৃতির মাঝে কোনো সততা থাকে না, সেটা কেবল ভয় থেকে আসা আনুগত্য। মনিব এই মিথ্যা স্বীকৃতি নিয়ে মিথ্যা তুষ্টির জীবন যাপন করে। কিন্তু ভৃত্যই আসলে প্রকৃত স্বাধীন মানুষ, কেননা তার শ্রম আর চিন্তায় থাকে মুক্ত সৃজনশীলতার আনন্দ। হেগেল বললেন, মানুষ যখন নিজের কাজের ভেতর দিয়ে সত্যই কোনো ছাপ রাখার সামর্থ্য অর্জন করে, তখনই সে প্রকৃত স্বাধীন সত্তা হয়ে ওঠে।
হেগেলের দর্শনের মনস্তাত্ত্বিক দিক হলো অসুখী চেতনা বা অসুখী মানুষ তৈরির প্রক্রিয়া। মানুষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, যা তাকে নিরন্তর অশান্ত রাখে, সেটিকেই স্বাধীনতার সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন হেগেল। তিনি বললেন, মানুষের মন নিজেকে সবসময় দুই ভাগে বিভক্ত করে রাখে। একদিকে সে তার বর্তমান বাস্তবতাকে দেখছে, অন্যদিকে সে নিজের ভেতরেই একটি আদর্শ সত্তা তৈরি করে রেখেছে। মানুষ যখন নিজের এই বর্তমান সীমাবদ্ধ সত্তাকে নগণ্য মনে করে আর ওই কাল্পনিক নিখুঁত আদর্শের পেছনে ছোটে, তখনই সে অসুখী অনুভব করতে থাকে। মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যা দেখে তা হলো তার অসম্পূর্ণতা। তার চোখ কখনোই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জীবন্ত মানুষটির মাঝে যে অসাধারণ শক্তি আছে তা দেখতে পায় না। সে কেবল খোঁজে যা তার নেই। যা নেই তা পাওয়ার যে নেশা, সেটিই মানুষের স্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়। মানুষ তখন নিজের বর্তমানকে বন্দিশালা মনে করে আর অজানাকে মনে করে মুক্তি।
হেগেলের মতে, মানুষ তার নিজের ভেতরের এই অসীমতাকে বাইরের কোনো কিছুর ভেতর খুঁজতে গিয়েই ফাঁদে পড়ে। আমরা মনে করি, কোনো দূরবর্তী সাফল্যের ভেতরেই আসল সুখ ও স্বাধীনতা লুকিয়ে আছে। আমরা বর্তমানের আমিকে অস্বীকার করি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ওই সফলতার অনুভব আসলে অন্তহীন ইলুশন। একটি মিটলে আরেকটি সামনে এসে হাজির হয়। তাই মানুষ যখন সেই ইলুশন বুঝতে পারে, তখনই এই বিভাজন মুছে যায়।
এখানেই লুকিয়ে আছে স্বাধীনতার সংকট। যে মানুষ নিজের যা আছে তাকে ভালোবাসতে পারে না, যে নিজের বর্তমানকে তুচ্ছ করে কোনো কাল্পনিক চিন্তার ফাঁদে বন্দি হয়ে থাকে, সে কি কখনো স্বাধীন হতে পারে? স্বাধীনতা মানে হলো নিজের বর্তমান অসম্পূর্ণতাকে মেনে নিয়ে সেই অসম্পূর্ণতার ভেতরেই পূর্ণতাকে খুঁজে বের করার শক্তি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের যা নেই তা খোঁজার পরিবর্তে, নিজের যা আছে সেটিকে নিজের শক্তির উৎস হিসেবে গ্রহণ করাই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা। কি নেই এমন চিন্তার অভ্যাস থেকেই জন্ম নেয় পরনির্ভরশীলতা। আমরা বর্তমানকে তুচ্ছ করে যা নেই তার পেছনে ছুটে যে পরাধীনতার জন্ম দিই, তা বাইরের কোনো শেকলের চেয়েও কঠিন। হেগেল বললেন, আয়নায় যা নেই তা খোঁজা বন্ধ করে, যা আছে সেই বর্তমান অস্তিত্বের সাথে সন্ধি করাই হলো স্বাধীনতার ভিত্তি।
হেগেলের চিন্তাগুলো তাঁর নিজের জীবনের ভাঙন আর ইতিহাসের সংকটের ভেতর দিয়ে ম্যাচিউর হয়ে উঠেছিল। তিনি বুঝেছিলেন, আমরা স্বাধীনতা বলতে যা বিশ্বাস করতে শিখেছি তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সত্য নয়। এটা একটা ইলুশনের মধ্যে হৈচৈ কিংবা সংগ্রাম। তাই মানুষ যখন জ্ঞানের অনুসন্ধান করে, আর যখন সেই ইলুশন ভেঙে পড়ে এতদিনের বিশ্বাসগুলো ভেসে যেতে থাকে, তখন সে নিজের ভেতরে নিজেই যেন ভেঙে যায়। আর সেই প্রতিটি ভাঙনের কষ্টের ভেতর দিয়েই নতুনের জন্ম হয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, স্বাধীনতা কোনো একবারে পাওয়ার বিষয় নয়, স্বাধীনতা একটি ভাঙ্গা গড়ার চলমান প্রক্রিয়া।
স্বাধীনতা কি সত্যিই স্বাধীনতা?
কেউ বলছেন বাকস্বাধীনতা, কেউ বলছেন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, আবার কেউ বলছেন ইচ্ছের স্বাধীনতা। কিন্তু হেগেলের কাছে এই সব এক ধরণের বিমূর্ত অনুভব, যা শেষ পর্যন্ত কোনো প্রকৃত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে না। তিনি বলছেন যতক্ষণ না পর্যন্ত স্বাধীনতা সংস্কৃতিতে পরিণত হতে পারছে, ততক্ষণ তা কেবলই একটি খোলস মাত্র। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ততক্ষণই স্বাধীন, যতক্ষণ তার নাগরিকরা নিজেদের কাজের মাধ্যমে সেই রাষ্ট্রকে ধারণ করতে পারছে।
হেগেলের এই তত্ত্বের গভীরতা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন আধুনিক রাষ্ট্রগুলো বারবার সংকটে পড়ে। যখনই কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ওপর এমন কোনো কাঠামো চাপিয়ে দেয় যা তাদের কাজ কিংবা প্রত্যাশার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, তখনই সেখানে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। আবার যখন নাগরিকরা কোনো দায়িত্ব ছাড়াই কেবল অধিকারের জন্য চিৎকার করে, তখনও সেই রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে।
আজকের এই দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে যেখানে প্রযুক্তি প্রতিদিন মানুষকে নতুন নতুন পরাধীনতার শিকল পড়াচ্ছে, সেখানে হেগেলের এই চিন্তাধারা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। হেগেলের মনিব ভৃত্যের তত্ত্ব আজকের দিনেও জীবন্ত। আমরা প্রতিনিয়ত অন্যের কাছ থেকে স্বীকৃতির ভিখারি হয়ে বেঁচে আছি। অথচ আমরা ভুলে যাচ্ছি যে আমাদের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের ভেতরে। হেগেল তার লেখায় যে যুগান্তকারী বার্তা দিয়ে গেছেন তা হলো, ভাঙন, ক্ষতি আর পরাজয়গুলোই আমাদের স্বাধীনতার পথ। আমরা যখন পরাজিত হই তখন আমরা নতুন করে জন্ম নিই। আমরা যখন ভেঙে পড়ি তখন আমরা নতুন করে নিজেদের গড়ে তুলি। আর এই নতুন করে গড়ে তোলার নামই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা। পর্ব-১
স্বাধীনতা কি সত্যিই স্বাধীনতা? ইতিহাসের সেরা দার্শনিকগণ স্বাধীনতা শব্দটির গভীর থেকে গভীরে গিয়ে কীভাবে চিন্তা করেছিলেন, সে সম্পর্কে জানতে পড়ুন আগামী পর্ব।
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)
