ইতিবাচক চিন্তার জালে বন্দি সমাজ: ‘ভালো থাকার মন্ত্র’ যতক্ষণ না ভাঙছে ‘অন্যের চোখে শাস্তি’ দেখার সংস্কৃতি

‘অটোসাজেশন’ আর ‘মনের জোর’-এ অন্যায় বন্ধ হয় না; প্রয়োজন প্রকাশ্য ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, না হলে পাবে না সমাজের পীড়িতরা বিচারের রায়।

“ভালো ভাবব, ভালো বলব, ভালো করব, ভালো থাকব”—চার লাইনের এই অটোসাজেশন সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত বিকাশের ওয়ার্কশপে দারুণ জনপ্রিয়। সম্প্রতি কোয়ান্টাম মেথড কোর্সের প্রচারেও ‘এপ্লাইড পজিটিভ সাইকোলজি’র নামে এই পদ্ধতিকে ‘মনের শক্তি বাড়ানোর অব্যর্থ মন্ত্র’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু ভালো ভাবনা আর ইতিবাচক উচ্চারণে কি কোনো সমাজের অন্যায়, নিপীড়ন বা অবিচারের প্রতিকার সম্ভব?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতিবাচকতার এই আত্মপ্রচার যতক্ষণ না ভাঙছে ‘অপরাধীকে চোখের সামনে শাস্তি দেখার’ সামাজিক ঐতিহ্য, ততক্ষণ প্রকৃত বিচার কখনোই সম্ভব নয়।

‘সাদাকায়ন’ বা অনুপ্রেরণামূলক লেখাগুলোতে প্রায়ই শোনা যায়—নিজেকে প্রতিদিন ‘ভালোর মন্ত্র’ শোনাতে, অটোসাজেশনের পুনরাবৃত্তি করতে। কিন্তু এই পন্থা একান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সমাজের বিস্তারিত কাঠামোতে যখন একজন প্রতারক, নির্যাতনকারী বা অপরাধী পেয়ে যান সহজ মুক্তি, তখন ভুক্তভোগীর ‘ভালো থাকা’ শুধু আত্মপ্রবঞ্চনায় পরিণত হয়। প্রকৃত ন্যায়ের জন্য প্রয়োজন—অন্যের চোখে শাস্তি (public & exemplary punishment), যাতে অপরাধী বুঝতে পারে তার কৃতকর্মের দৃশ্যমান মূল্য আছে। এই ‘দৃষ্টি মূলক শাস্তি’ বলতে বোঝায়—

· প্রকাশ্যে অপরাধের স্বীকারোক্তি ও প্রায়শ্চিত্ত,
· সামাজিকভাবে দৃষ্টান্ত স্থাপন (উদাহরণ সৃষ্টি),
· আইনি প্রক্রিয়ায় কঠোর ও দ্রুত শাস্তি যা সবাই দেখে।

তবে বর্তমান সমাজে ইতিবাচক চিন্তার আগ্রাসন এত বেশি যে ‘ক্ষমা করুন’, ‘ভালো থাকুন’, ‘নেতিবাচকতাকে এড়িয়ে চলুন’-এর ছদ্মবেশে অপরাধী ও অন্যায়কারীরা প্রায়শই ছাড় পেয়ে যান। এর ফল—পীড়িত ব্যক্তি বারবার বলতে বাধ্য হন ‘আমি ভালো থাকব’, অথচ তাঁর প্রাপ্য ন্যায় অধিকার আদায় হয় না।

সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যেখানে কোনো পরিবারের মেয়ে নির্যাতনের পরও সমাজের বড় অংশ তাকে ‘ইতিবাচক থাকতে’ পরামর্শ দেয়, অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে তাকে ‘নেতিবাচক ও রাগী’ বলে গালাগালি দেওয়া হয়। অথচ ওই অপরাধী যদি একদিনের জেলও ভোগ করত, যদি তাকে জনসমক্ষে লজ্জিত হওয়ার ব্যবস্থা করা হতো—তাহলে হয়তো আরও দশজন নির্যাতন কমে যেত। অটোসাজেশনের পুনরাবৃত্তি শুধু ব্যক্তির মনের সুরক্ষা দেয়, তা কখনোই অপরাধীকে পরিবর্তন করে না।

‘কোয়ান্টাম মেথড’ বা ‘পজিটিভ সাইকোলজি’ শিক্ষা নিতে আপত্তি নেই, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গেই সমাজকে শেখাতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সংস্কৃতি। যতক্ষণ না পর্যন্ত—

· শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের ‘ভালো থাকার পাশাপাশি সক্রিয় নাগরিক হতে’ পাঠ দেওয়া হয়,
· মিডিয়া ও পত্রপত্রিকায় ‘ইতিবাচক চিন্তার ফাঁদ’ চিহ্নিত করে প্রতিবেদন ছাপা হয়,
· প্রশাসন ও আইন প্রকাশ্য শাস্তিকে ‘নিষ্ঠুরতা’ না বলে ‘ন্যায়ের অনুষঙ্গ’ হিসেবে দেখে,
ততক্ষণ সমাজের পীড়িত মানুষেরা রায় পাবেন না। এই প্রতিবেদন লেখার কারণ একটাই—আপনি যতই ‘ভালো ভাবুন’, অন্যায়কারী যদি শাস্তি না পায়, তাহলে সেই ‘ভালো থাকা’ একটি বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়।

‘ভালো থাকতে চাইলে প্রথমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে চোখ খুলুন। প্রতিটি অপরাধীকে জনসমক্ষে শাস্তি দেখার অভ্যাস তৈরি করুন। তাহলেই সত্যিকারের সমাজ পাবে তার রায়।’

আপনারা যারা প্রতিদিন ‘অটোসাজেশন’ করেন, একবার ভেবে দেখুন—আপনার ‘ভালো থাকার মন্ত্র’ কি কোনও দুর্বলের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে? না হলে এই জাল ছিঁড়ে ফেলার সময় কি আসেনি?