জাপানে শিশু শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের রুটিনে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের জন্যে সময় বরাদ্দ থাকে। দেশটিতে সারা দিনের সব ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা যখন বাড়ি ফেরার জন্যে প্রস্তুত; তখন হয়তো তাদের শিক্ষকের আহ্বান- ‘ওকে, সবাই শোনো আজকের ক্লিনিং রোস্টার। প্রথম ও দ্বিতীয় সারি শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করবে।
তৃতীয় ও চতুর্থ করিডোর, সিঁড়ি আর পঞ্চম লাইনে যারা আছো- তারা টয়লেটগুলো পরিষ্কার করবে।’ শিক্ষার্থীরা জানে যে, তাদের স্কুল তাদেরকেই পরিষ্কার করতে হবে, যে কারণে তারা নোংরা করে না। শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাসেবী হয়ে কমিউনিটি ক্লিনিং-এ অংশ নেয়। স্কুলের কাছে রাস্তা থেকে ময়লা-আবর্জনাও সরিয়ে ফেলে তারা। সড়ক সংলগ্ন অধিবাসীরাও একাজে অংশ নেয়। ঘরের সামনের সড়কের ময়লা সরাতে কারও জন্যে তারা অপেক্ষা করে না। শিশুদেরকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় বাইরে থেকে এসে হাত ধোবে এবং গরম পানি দিয়ে গার্গল করে নেবে। যে কারণে জাপানে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব কম থাকে। জাপানীদের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর পেছনে পরিচ্ছন্নতার ভূমিকা অপরিসীম।
সংক্রামক রোগ ও অসুস্থতার অন্যতম কারণ : অপরিচ্ছন্নতা
আমরা জানি যে, সকল সংক্রামক ব্যাধির মূলে রয়েছে অপরিচ্ছন্নতা। ডেঙ্গু রোগ বিস্তারের অন্যতম কারণ হচ্ছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, যেখানে এডিস মশা সহজে বংশ বিস্তার করে। অপরিচ্ছন্নতার কারণে কোনো কোনো বাসস্থনের ভেতরের বায়ু দূষণের মাত্রা বাইরের বায়ু দুষণের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, শুধু নিয়মিত এবং সঠিক উপায়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস ডায়রিয়া এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের হার ৪০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
আমরা অনেকেই শুনে থাকি পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা কোনো না কোনোভাবে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছেন। এদের অর্ধেকের বেলায় পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটে নিজের বাড়িতেই। মূলত এ দুর্ঘটনাগুলো ঘটে অপরিচ্ছন্ন পিচ্ছিল বাথরুমে পা পিছলে এবং বাসায় ছড়ানো ছিটানো জিনিসের কারণে। আসলে যে ঘর যত পরিচ্ছন্ন সে ঘরের মানুষগুলোর সুস্থ থাকার সম্ভাবনা সবসময় বেশি থাকে। স্ট্রেস বা মানসিক চাপ এখনকার আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা দেখেছেন, যাদের ঘর অপরিচ্ছন্ন এবং জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, তাদের দেহে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে তারা অল্পতেই বিষণ্ণতা ও হতাশায় আক্রান্ত হন। তাই বলা যায়, অপরিচ্ছন্নতা মানসিক অবসাদেরও একটি বড় কারণ। আসলে পরিচ্ছন্নতা একটি অভ্যাস ও চর্চার বিষয়। এর জন্যে প্রয়োজন একটু সচেতনতা। এবার আমরা দেখি, পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ধর্ম কী বলে?
ধর্মের শিক্ষা : পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আমাদের ধর্মবিশ্বাসকেও সংহত করে। রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‚পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।” ইসলাম ধর্মে পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অর্থাৎ বিশ্বাসের অর্ধেক বলা হয়েছে। নবীজী (স) এর হাদীসের একটি বড় অংশ জুড়ে শুধু এই ব্যক্তিগত যত্নায়ন ও শুদ্ধাচার সম্পর্কিত। কোয়ান্টামের একটি পডকাস্টে ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানী এম শমসের আলী বলেছিলেন, নবীজী (স) বলেছেন, ‚পানির পাত্রে ফুঁ দেবে না।“ এটা কতটা বৈজ্ঞানিক। কারণ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময় শরীর থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো দূষিত পদার্থ বেরিয়ে যায়। এটা যেন সুপেয় পানিটাকে দূষিত না করে দেয়। অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে নবীজী (স) ১৪০০ বছর আগেই তার সাহাবাদের শিখিয়ে গিয়েছেন যখন বিজ্ঞানও হয়তো সেভাবে কিছু বলে নি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‚তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখো। আর অপরিচ্ছন্নতা-অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো।” (সূরা মুদাসসির)। ইসলাম ধর্মে নামাজের আগে ৫ বার ওজু করার কথা বলা হয়েছে।
শুধু ইসলাম নয়, সনাতন বা অন্যান্য ধর্মেও প্রার্থনার আগে গোসল ও হাত-মুখ ধুয়ে নেয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
পবিত্র বাইবেলে উল্লেখ আছে, ‚তোমাদের দেহ পবিত্র আত্মার মন্দির।”
অর্থাৎ, আমরা যখন আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখি, তখন আমরা আসলে স্রষ্টার দেওয়া আমানতের সম্মান রক্ষা করি।
পরিচ্ছন্নতা সাফল্যকে আকৃষ্ট করে
শুধু সুস্থতাই নয়, আমাদের কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের জন্যেও পরিচ্ছন্নতা প্রয়োজন। যে-কোনো কাজে সাফল্যের ভিত্তি হলো মনোযোগ। আর অপরিচ্ছন্ন বা অগোছালো পরিবেশে মনোযোগ দেয়া খুবই কঠিন। আপনার অফিসের টেবিল যদি ফাইলপত্র অগোছালো থাকে, তবে ফাইল খুঁজতেই আপনার অনেক সময় নষ্ট হবে। অন্যদিকে, যিনি গুছিয়ে কাজ করেন, তিনি সহজেই বসের বা সহকর্মীদের নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠেন। আমরা অনেকেই ঘরের পরিচ্ছন্নতার কাজকে এড়িয়ে চলি বা ছোট কাজ মনে করি। কোয়ান্টামে আমরা বলি, ঘর পরিষ্কার করুন, মন পরিষ্কার হবে। সিঙ্গাপুর একটি ছোট্ট রাষ্ট্র, কিন্তু সেখানে রাস্তাঘাটে একটুও ময়লা নেই। সিঙ্গাপুরকে বলা হয় Green & clean city. পরিচ্ছন্ন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
আমরাও সচেতন হতে শুরু করেছি : আমরাও সচেতন হতে শুরু করেছি। আশার কথা হলো সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের সমর্থকেরা স্টেডিয়ামের গ্যালারি পরিষ্কার করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। কয়েকশ দর্শকের এই পরিচ্ছন্নতা ও দায়িত্বশীল আচরণ পৃথিবীর সামনে ২০ কোটি বাংলাদেশির মর্যাদা ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি উঁচুতে তুলে ধরেছে। আসলে পরিচ্ছন্নতা শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, এটি একটি জাতির সংস্কৃতি ও সচেতনতার পরিচয়।
কোথায় কোথায় পরিচ্ছন্নতাকে গুরুত্ব দেবো?
১. ব্যক্তি জীবনে পরিচ্ছন্নতা : রোগব্যাধি বিস্তারের একটি বড় পথ হলো আমাদের মুখ। কারণ মুখে যদি জীবাণু থাকে খাবারের সাথে ঐ জীবাণু দেহে প্রবেশ করবে। তাই মুখের যত্নায়নে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আর টয়লেট ব্যবহারের পর তা এমনভাবে পরিষ্কার করে আসুন, যাতে পরবর্তী জনের ব্যবহার করতে কোনো অসুবিধে না হয়।
এ প্রসঙ্গে মাদার তেরেসার একটি ঘটনা বলি। একবার তিনি রেলগাড়িতে যাওয়ার পথে বারবার টয়লেটে যাচ্ছিলেন। একজন জানতে চাইল তিনি অসুস্থ বোধ করছেন কি না। মাদার তেরেসা বললেন, ‚শরীর ভালো, কিন্তু এখন যেহেতু বসে আছি, তাই বারবার টয়লেটে গিয়ে ময়লা পরিষ্কার করে দিচ্ছি, যাতে অন্য যাত্রীরা পরিচ্ছন্ন টয়লেট ব্যবহার করতে পারে।“
২. পারিবারিক জীবনে পরিচ্ছন্নতা : পরিবারের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব শুধু মায়ের নয় বরং এটি পরিবারের ছোট বড় সবার সম্মিলিত যৌথ দায়িত্ব। শিশু সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই ঘর পরিষ্কারের কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করুন। দুই-আড়াই বছরের শিশুকে বলুন মেঝের কাগজের টুকরোটি ডাস্টবিনে ফেলতে। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সে স্বাবলম্বী হয়ে উঠে। হার্ভার্ডের ৭৫ বছরের গবেষণা বলছে, যে শিশুরা ঘরের কাজ করে তারা পরবর্তী জীবনে সফল ও সুখী হয়। আমরা অনেক সময় শিশুদের উপদেশ দিই কিন্তু নিজেরা তা অনুসরণ করি না। মনে রাখতে হবে শিশুরা তা-ই করে যা সে বড়দের করতে দেখে।
আমাদের করণীয়
তাহলে আমাদের কাজ শুরু হোক আজ থেকে, এখন থেকে।
১. অপ্রয়োজনীয় জিনিসকে চিহ্নিত করে তা বের করে ফেলুন : ঘরবাড়ি ও কর্মক্ষেত্রকে পরিচ্ছন্ন রাখার প্রথম ধাপ হলো অপ্রয়োজনীয় জিনিস চিহ্নিত করে তা বের করে দেয়া। শুধু এ-কাজটি করলেই দেখা যাবে, যেসব পণ্যে চারপাশ ঠাসা আছে বছরের পর বছর, তার অধিকাংশই বাইরে বের করে দেয়া যাবে সহজেই। মেরি কল্ডোর বিখ্যাত বই The life changing magic of Tidying up বইতে খুব সুন্দরভাবে বলেছেন, আমরা যখন অপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্র সরিয়ে ফেলি, তখন শুধু ঘর নয় মনও হালকা হয়।
২. দিন শুরু করুন বিছানা গোছানোর মধ্য দিয়ে : সকালে ঘুম থেকে জেগে নিজের বিছানাটা যত্ন নিয়ে গুছান। এই আপাত ছোট কাজ নিয়মানুবর্তিতা ও গভীর মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ ভালোভাবে করার সক্ষমতা প্রকাশ করে। উইলিয়াম ম্যাকরাভেন এর বিখ্যাত বই Make your bed : little things that can change your life তে তিনি খুব সুন্দরভাবে বলেছেন, আপনি যদি ছোট ছোট দায়িত্ব ভালোভাবে সামলাতে না পারেন, বড় চ্যালেঞ্জগুলোতে সফল হওয়া আপনার জন্যে কঠিন হয়ে পড়বে?
৩. সব একদিনে করে ফেলব এই নীতি নয়, ছোট থেকে শুরু করুন : অনেকেই ছুটির দিনের জন্যে সব কাজ জমিয়ে রাখেন। একদিনে সব কাজ নয়। শুরু করুন ছোট থেকে। আজ একটি ড্রয়ার গুছান, কাল আলমারি একটু সাজান। এই ছোট ছোট সাফল্যই আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে।
৪. মনকে পরিচ্ছন্ন রাখতে নিয়মিত মেডিটেশন করুন : পরিচ্ছন্নতার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আমাদের মন। মন যদি পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র না হয় তবে শুধু পারিপার্শ্বিক পরিচ্ছন্নতা আমাদের শান্তি ও স্বস্তি দিতে পারবে না। মনের এই আর্বজনা দূর করার সেরা উপায় হলো মেডিটেশন। মেডিটেশন ঈর্ষা, বিদ্বেষ, রাগ-ক্ষোভ রূপী নেতিবাচক আবেগ থেকে মনকে মুক্ত করে। মেডিটেশন ভালো ভাবনায় মনটাকে পূর্ণ করে। কোয়ান্টামে আমরা বলি, মন ভালো তো সব ভালো। এজন্যে নিয়মিত মেডিটেশন করুন।
বক্তিগত ও পারিবারিক সুস্থতার পাশাপাশি দেশের সুনাগরিক হিসেবে দেশটাকে পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সচেতন হোন।
আসুন, আমরা সবাই ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে পরিচ্ছন্ন থাকি। প্রিয় স্বদেশ হয়ে উঠুক আরও সুন্দর, আরও বাসযোগ্য।
