অকেজো সিসি ক্যামেরা, বাড়ছে চুরি-ছিনতাই; নাগরিক সেবায় চরম ভোগান্তি
আজিজুর রহমান, আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
প্রতিষ্ঠার এক দশক পেরিয়েও ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা পৌরসভা নানা সীমাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত। জনবলের তীব্র সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবার কারণে পৌরবাসী দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বিশেষ করে, গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে কার্যকর সিসি ক্যামেরা ও পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাবে চুরি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধ বেড়ে চলেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
২০১৬ সালের ১৬ এপ্রিল ‘খ শ্রেণির’ পৌরসভা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদই এখনও শূন্য। এর জেরে সেবাগ্রহীতাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
চুরি-ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে নেই কার্যকর টহল
সম্প্রতি উপজেলা কেন্দ্রীয় মসজিদের ওজুখানা থেকে এক গণমাধ্যমকর্মীর দুটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিক ইকবাল হোসেন জানান, জোহরের নামাজ পড়ার সময় দেড় লাখ টাকা মূল্যের মোবাইল দুটি চুরি যায়। থানায় সাধারণ ডায়েরি করেও এখন পর্যন্ত ফোন উদ্ধার হয়নি।
তিনি বলেন, “উপজেলা পরিষদ, পৌর সদর বাজার, কেন্দ্রীয় মসজিদ, থানা কিংবা হাসপাতাল সড়ক—কোথাও কার্যকর সিসি ক্যামেরা নেই। ক্যামেরা থাকলে চোর শনাক্ত ও মোবাইল উদ্ধার সহজ হতো।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিন আগে সোনালী ব্যাংকের সামনে এক গ্রাহকের টাকা ছিনতাই হয়েছে। হাসপাতাল গেট ও আশপাশের এলাকায়ও প্রায়ই চুরি-ছিনতাই ঘটছে, কিন্তু বেশিরভাগ ঘটনারই সুরাহা নেই।
জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
মানবাধিকার ও গণমাধ্যমকর্মী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “শুধু সাংবাদিকের মোবাইল চুরিই নয়, ব্যাংকের সামনে ছিনতাই, হাসপাতাল এলাকায় চুরি—এসব নিয়মিত ঘটছে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। দ্রুত সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।”
সচেতন নাগরিক মোরাদ হোসেন তালুকদার যোগ করেন, “পৌরসভা প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ। বাজার ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিকাংশ সিসি ক্যামেরাই অকেজো। সড়কে পর্যাপ্ত আলো নেই। সন্ধ্যার পর চোর, ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। নারী হয়রানি, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিনোদনকেন্দ্রের অভাব তো আছেই।”
জনবল সংকট ভীষণ, শূন্য ৬০টির বেশি পদ
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ‘খ শ্রেণির’ এই পৌরসভায় অনুমোদিত জনবল ৭৬ জন। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। সচিব, উপসহকারী প্রকৌশলী, স্বাস্থ্য পরিদর্শকসহ ৬০টির বেশি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সহকারী প্রকৌশলী জাকারিয়া আলম বলেন, “জনবল সংকটের পাশাপাশি আর্থিক সংকটও আছে। তাই নষ্ট সিসি ক্যামেরা মেরামত সম্ভব হয়নি। তবে দ্রুত নতুন ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। কন্ট্রোল রুম থানায় স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনায় আছে। জনবল নিয়োগে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন দরকার, যা প্রশাসনিক কারণে সম্ভব হচ্ছে না।”
দুর্গম পৌর ভবন বাড়াচ্ছে ভোগান্তি
শহর থেকে ২-৩ কিলোমিটার দূরে কুসুমদি এলাকায় নতুন পৌর ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সেবা পেতে বাড়তি ভাড়া গুণতে হচ্ছে নাগরিকদের। অনেকে মনে করেন, ভবনের অনুপযুক্ত অবস্থানও ভোগান্তির বড় কারণ।
থানা ও প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি
আলফাডাঙ্গা থানার ওসি ফকির তাইজুর রহমান বলেন, “আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সিসি ক্যামেরা না থাকা দুঃখজনক। কার্যকর ক্যামেরা থাকলে অপরাধ শনাক্ত অনেক সহজ হয়। অকেজো ক্যামেরা ও সৌরবাতি সচল করতে পৌর প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করব।”
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত নুর মৌসুমী বলেন, “মসজিদ থেকে মোবাইল চুরির ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা দ্রুত নষ্ট ক্যামেরা মেরামতের উদ্যোগ নেব। বর্তমান জনবল নিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে। নতুন পৌরসভা হিসেবে ধীরে ধীরে সব সুযোগ বাড়বে।”
প্রত্যাশা নাগরিকদের
আলফাডাঙ্গাবাসী আশা করছেন, দীর্ঘদিনের জনবল সংকট নিরসন, সিসি ক্যামেরা ও সড়কবাতি সচল এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।
তারিখ: ০৯/০৬/২০২৬
মোবাইল: ০১৭২৭১৮৩৩৯৩
