১. হাতে লেখা বনাম ল্যাপটপে নোট: স্মৃতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
UCLA-এর অধ্যাপক ড্যানিয়েল ওপেনহেইমারের গবেষণাটি (Mueller & Oppenheimer, 2014) ২০২৩-২৪ সালে এসে নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, হাতে লেখার যে সুবিধা পাওয়া যায়, তা হয়তো আগের মতো সরাসরি নয়।
২০১৪ সালের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, ল্যাপটপে নোট নেওয়ার চেয়ে হাতে নিলে ধারণাগত জ্ঞান বেশি মনে থাকে, কারণ ল্যাপটপে নকল করার প্রবণতা বেশি থাকে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় এই ফলাফল পুরোপুরি নিশ্চিত হচ্ছে না। ২০২৩ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি গবেষণায় হাতে লেখার এই সুবিধা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা যারা বেশি নোট নিয়েছেন, তারা ভালো করেছেন—তা হাতে লেখা হোক বা টাইপ করা।
২. স্মার্টফোনের নিছক উপস্থিতি: ‘ব্রেইন ড্রেইন’ তত্ত্ব
২০১৭ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, স্মার্টফোন ব্যবহার করার সময় না হলেও, শুধুমাত্র আপনার পকেটে বা আশেপাশে ফোনটি থাকলেই আপনার মনোযোগ ও জ্ঞানীয় সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
ফোনটি না দেখার জন্য আমরা যে ইচ্ছাশক্তি বা মনোযোগ ব্যয় করি, তা আমাদের মস্তিষ্কের সীমিত জ্ঞানীয় সম্পদ (cognitive capacity) ব্যবহার করে ফেলে। ফলে অন্য কোনো কাজের জন্য মস্তিষ্কের সেই সম্পদ কমে যায়। ফোন ব্যবহারে যারা বেশি আসক্ত, তাদের ওপর এই প্রভাব আরও তীব্র।
৩. অ্যালগরিদম, ডোপামিন ও ‘দুষ্টচক্র’: নতুন অন্তর্দৃষ্টি
ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার ‘দুষ্টচক্র’ সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছে, তার পেছনের বিজ্ঞান এখন আরও স্পষ্ট।
অ্যালগরিদমিক ডোপামিন ইকোনমি’ : ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় এই ধারণা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের অ্যালগরিদম আমাদের প্রতিটি ক্লিক, স্ক্রল, থামার সময় (dwell time) বিশ্লেষণ করে এবং সেই অনুযায়ী কনটেন্ট দেখায়। এটি আমাদের মস্তিষ্কের পুরস্কার-প্রক্রিয়াকে (reward-learning circuitry) ব্যবহার করে আমাদের আসক্ত করে তোলে।
শর্ট-ফর্ম ভিডিওর প্রভাব: টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলসের মতো ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওগুলো তাত্ক্ষণিক ডোপামিন দেয়, যা ‘ডোপামিন ট্র্যাপ’-এর মতো কাজ করে। এর ফলে মনোযোগের ব্যাঘাত (attention deficits), স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া, এবং একাডেমিক উদাসীনতা (academic burnout) বাড়তে পারে।
মস্তিষ্কের পরিবর্তন: প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কিশোর-কিশোরী দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটায়। দীর্ঘমেয়াদী এই অভ্যাস মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে (সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অংশ) পরিবর্তন আনতে পারে, যা আবেগপ্রবণতা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বাড়ায়।
বর্তমান প্রজন্মকে ‘বিক্ষিপ্ত, অশান্ত ও অস্থির’ বলার পেছনে বিজ্ঞান এখন আরও জোরালো প্রমাণ দিচ্ছে। শুধু স্মার্টফোন ব্যবহার নয়, এর নিছক উপস্থিতি আমাদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়—একে বলে ‘ব্রেইন ড্রেইন’।
অন্যদিকে, টিকটক বা ইনস্টাগ্রাম রিলসের মতো শর্ট-ফর্ম ভিডিওগুলোর অ্যালগরিদম আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমকে এমনভাবে হাইজ্যাক করে যে এক সময় আমরা গভীর মনোযোগ ও চিন্তার ক্ষমতা হারাতে বসি।
বিশেষজ্ঞরা একে ‘অ্যালগরিদমিক ডোপামিন ইকোনমি’ বলছেন, যা আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল করে এবং আবেগপ্রবণতা বাড়িয়ে তোলে। আর তাই, নিকোলাস কার যেমনটি আঁচ করেছিলেন, ইন্টারনেট আমাদের চিন্তাকে ভাসাভাসা করে দিচ্ছে—এই সত্যটি এখন আর শুধু তত্ত্ব নয়, বরং নিউরোসায়েন্সে প্রমাণিত এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
