বাচ্চা খেতে চায় না? মোবাইল দেখিয়ে খাওয়ানোর বদলে এটা করুন, সে নিজেই খাবে!

জন্মের পর প্রথম ৬ মাস মায়ের বুকের দুধই শিশুর জন্যে আদর্শ খাবার। ৬ মাস পর থেকে ঘরে তৈরি নানান পুষ্টিকর খাবারই একটু একটু করে সে খেতে শুরু করতে পারে। সাধারণত এই সময়টাতেই মায়েদের চিন্তা সবচেয়ে বেশি 

শিশু যদি ডিম সেদ্ধ খেতে না চায়, তাহলে মা তার সামনে নিয়ে আসেন ডিম পোচ। সেটাও খেতে না চাইলে হাজির করেন ডিম ভাজি। সেটাও খেতে না চাইলে ডিম মামলেট। একটি ডিম খাওয়ানোর জন্যে তৈরি থাকে আরো তিনটি বিকল্প ডিম। অথচ যদি এমন হতো যখন যে খাবার তার সামনে আনা হতো সে তা-ই মজা করে খেয়ে নিত! ভাবছেন, সত্যি বলছেন?

জ্বী, একেবারে প্রমাণিত সত্যি কথা!

এজন্যে করুন ছোট্ট একটি কাজ 

প্রতিদিন আপনার সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় মাথায় বিলি কাটতে কাটতে আপনি সুর করে বলবেন শুধু একটি কথা- “তুমি খু-উ-ব ভালো, খাবার দিলেই খেয়ে ফেলো!” 

সন্তান ঘুম থেকে উঠলেও বলুন এ কথাটি। কিছুদিন বলেই দেখুন না, বুঝবেন, কথা কত শক্তিশালী হতে পারে।

সেইসাথে আপনাকে বাদ দিতে হবে আরেকটি কথা।

“জানেন, আমার বাচ্চা একদম খেতে চায় না। দেখুন না কত হালকা হয়ে গেছে। পেটটা কত নেমে গেছে!” 

তারচেয়ে বরং বলুন, “জানেন আপা, আমার মেয়েটা মিষ্টি কুমড়া ভাজি এত পছন্দ করে। আর পুঁই শাক পেলে তো বলে খাবো খাবো!”

“সন্তান খায় না”- কথাটা ভুলেও বলবেন না!

কারণ প্রতিটি শিশুর আছে আত্মসম্মানবোধ। সবার সামনে যখন তার সম্পর্কে অভিযোগ, আক্ষেপ করা হয়-সে খায় না, খেতে চায় না, তখন তা তার সম্মানে আঘাত হানে। সে তখন হয়ে ওঠে আরো জেদি এবং শুরু করে না খাওয়ার নানা টালবাহানা। 

তাই সে না খেতে চাইলেও অন্যদের সামনে সবসময় বলুন, “আমার বাচ্চা খায়”; এটুকুও যদি বলতে না চান তাহলে একেবারে মৌন থাকুন। ওর খাবারের খতিয়ান তো কেউ জানতে চাইতে আসে নি! অন্যদের সামনে শিশু কোনো খাবার না খেলে বেজারমুখে নয়, হাসিমুখে বলুন- “মনে হয় একটু পরে খাবে!”

হতে পারে একটু পরে খিদে লাগলে নিজেই এসে আপনাকে বলবে, “আম্মু খাবো” 

পারলে খাওয়ানোর আগে তার সাথে দৌড়াদৌড়ি করুন। এক্সারসাইজ খিদে বাড়ায়।

খেতে না চাইলে কী করবেন? 

কখনো খেতে গিয়ে সে যদি ‘না’ বলে বড়জোর দু’বার চেষ্টা করুন। ডাইনিং টেবিলে বসা থাকলে চলে আসুন খাটে। কিংবা জানালার ধারে দাঁড় করান। অথবা বারান্দায় নিয়ে বসান। রাস্তা দেখান, রিকশা/গাড়ি দেখান, আকাশ দেখান, বিমান দেখান, কাক দেখান। 

তবে কার্টুন দেখিয়ে, মোবাইল/ট্যাব বা এ জাতীয় ডিভাইসের সাহায্য নিয়ে তাকে খাওয়াবেন না। এগুলো আপনার যতটা না উপকার করবে তারচেয়ে ক্ষতি করবে বেশি।

মোবাইল দেখিয়ে খাওয়ানোর ক্ষতি

মোবাইলে ভিডিও দেখিয়ে মায়েরা এই যে একঘণ্টা ধরে বাচ্চাকে খাওয়ান, তাতে যতটা না পুষ্টি বাচ্চা খায়, তারচেয়ে বেশি খায় রেডিয়েশন। শুধু তাই নয়, এই যে অভ্যাস গড়ে উঠবে, শেষ পর্যন্ত মোবাইল/ট্যাব না পেলে খেতেই চাইবে না। 

আর সেই খাওয়া তার শরীরে কেজি কেজি মাংস বাড়াবে, কিন্তু সুঠাম স্বাস্থ্য গড়বে না। সে কী খাচ্ছে, খাবারটির স্বাদ-গন্ধ কেমন, রঙের তফাৎ কতটা এগুলোকে বুঝতে দিতে তাই খাওয়ার সময় সব ধরনের স্ক্রিনকে না বলুন।     

শিশুরা বৈচিত্র্য পছন্দ করে

তাই একই সবজি একেকদিন খানিকটা ভিন্ন ধাঁচে রান্না করে দিন। সেই সাথে তাকে নিয়ে কাঁচাবাজারে যান। সবজি চেনান। খাওয়ার সময়ও শাক-সবজি খেলে কী উপকার তা তাকে বলুন।

জাগ্রত অবস্থায় বলুন, সবচেয়ে কাজে আসবে ঘুমের আগে-পরে তন্দ্রা ভাবের সময়টায় বরলে। কারণ, অবচেতন মনকে কথা শোনানোর সবচেয়ে সুন্দর সময় সেটি। আর একবার অবচেতন মনে তথ্য গেঁথে গেলে সে নিজেই বলতে শুরু করবে- “ফলে বাড়ে বল, শাকে বাড়ে মল!”

শুধু শাক কেন, করলাও খেতে চাইবে শখ করে। লেবু-পানি ঢকঢক করে গিলবে, চিনির মতো বিষ মিশিয়ে দেয়ার জন্যে আবদার করবে না। 

এগুলো গল্পের মতো শোনাচ্ছে, তাই না! কিছুদিন চর্চা করে দেখুন। আপনিও আরেকজন মায়ের কাছে এই গল্প করতে পারবেন।

১. ইতিবাচক বার্তা ও অবচেতন মনের প্রভাব “শিশুরাও আত্মসম্মানবোধে আঘাত পায়” এবং “ঘুমের সময় অবচেতন মনে বার্তা দেওয়া কাজে আসে”—এই ধারণাগুলি মনোবিজ্ঞানের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর আত্মসম্মানবোধ: শিশুরা সবার সামনে খাবার না খাওয়ার জন্য সমালোচিত হলে তারা আরও জেদি হয়ে ওঠে । ইতিবাচক উৎসাহ দেওয়া বেশি কার্যকর, যা আপনার পরামর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ।

অবচেতন মনের শক্তি: ঘুমের আগে ও পরে তন্দ্রাভাবের সময় অবচেতন মন বেশি গ্রহণশীল থাকে বলে মনে করা হয় । এই সময়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে ।

২. মোবাইল দেখিয়ে খাওয়ানোর ক্ষতি ও বিকল্প মোবাইল দেখিয়ে খাওয়ানো সহজ মনে হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে স্পষ্ট মত দিয়েছেন ।

শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি: মোবাইল দেখতে দেখতে শিশু বুঝতেই পারে না কী খাচ্ছে বা কখন পেট ভরেছে, যা স্থূলতার কারণ হতে পারে । এটি শিশুর খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও রং সম্পর্কে ধারণা নষ্ট করে এবং পরবর্তীতে ডিভাইস ছাড়া খেতে অস্বীকৃতি জানায় ।

কার্যকর বিকল্প: খাওয়ানোর সময় শিশুকে রান্নার কাজে অংশ নেওয়া অথবা খাবারকে আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো বেশি কার্যকর।

৩. শিশু খেতে চায় না: কারণ ও সমাধান শিশুর খেতে না চাওয়ার পেছনে সাধারণত জোরাজুরি, খাবারে বৈচিত্র্যের অভাব বা অতিরিক্ত স্ন্যাকসের অভ্যাস দায়ী ।

খাওয়ানোর কৌশল: বিশেষজ্ঞরা বারবার খেতে জোর না করে , খাবারের ধরণ ও স্বাদ পরিবর্তন করে , এবং শারীরিক পরিশ্রম (দৌড়াদৌড়ি) বাড়িয়ে ক্ষুধা তৈরি করার পরামর্শ দেন।

ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য: UNICEF এবং WHO-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৬ মাস থেকে ২ বছর বয়সী শিশুকে দিনে কমপক্ষে ২-৩ বার পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে । এটি নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ বাংলাদেশে এখনও ৫ বছরের কম বয়সী ২৮% শিশু খর্বকায় এবং ১০% কৃশকায় ।

অবচেতন মনের কার্যপ্রণালী তন্দ্রাভাবের সময় অবচেতন মন ইতিবাচক বার্তা গ্রহণে বেশি সক্ষম। মোবাইল দেখিয়ে খাওয়ানোর ক্ষতি খাবারের স্বাদ বোধ নষ্ট, অতিরিক্ত খাওয়ানোর প্রবণতা ও ভবিষ্যতে ডিভাইস আসক্তি তৈরি হয়। জাতীয় পুষ্টি পরিস্থিতি ৫ বছরের কম বয়সী ২৮% শিশু খর্বকায় এবং ১০% কৃশকায় (বাংলাদেশ)।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বিশ্বব্যাপী ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩০ লক্ষ শিশু স্থূল। খাদ্যাভ্যাস উন্নয়নে করণীয় খাবারে বৈচিত্র্য, শারীরিক পরিশ্রম, পারিবারিক পরিবেশে খাওয়ানো এবং জোর না করা। আপনার প্রতিবেদনে এই তথ্যগুলো যুক্ত করলে এটি যেমন তথ্যভিত্তিক হবে, তেমনি পাঠকদের সচেতন করতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।