ভূমিকা সম্প্রতি সাভারে এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় সমাজ ফুঁসে উঠেছে। পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার পর মাত্র চার কার্যদিবসে বিচার শেষ করে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা যেমন ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা দেখিয়েছে, তেমনি রাহেলার ২২ বছরের নিরব ন্যায়বিচারের অপেক্ষা আমাদের আইনব্যবস্থার দুর্বলতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
সর্বশেষ ধর্ষণের ঘটনা: সাভারের নারী ঢাকার সাভারের কাউন্দিয়া এলাকায় এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিবেশী সাইফুল ইসলাম রানা (৩৬), মজিবর রহমান (৪৮) ও ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরসহ পাঁচজন স্বামী অনুপস্থিত থাকার সুযোগে ওই নারীর ঘরে প্রবেশ করে পালাক্রমে ধর্ষণ করে এবং আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে। বিষয়টি কাউকে জানালে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় । পরে শনিবার সন্ধ্যায় ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয়রা বিষয়টি জানতে পেরে প্রধান আসামি রানাকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে অপর দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে ।
ভয়াবহতার চিত্র পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে ৫ হাজার ৪৪৮টি। একই সময়ে ঢাকা মহানগরের থানাগুলোতে হয়েছে ৪১৩টি মামলা। এর মধ্যে মাত্র ৬৫টির অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে এবং ১০টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত এখনো শেষ হয়নি ।
ঢাকায় গত তিন মাসে শুধু ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার সংখ্যা ১৭৮টি। এর মধ্যে নারী ধর্ষণ ১১৫টি এবং শিশু ধর্ষণ ৬৩টি । তদন্তে বিলম্বের কারণ আইনে ধর্ষণ মামলার তদন্ত ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ মামলায় তা মানা হয় না ।
মেডিকেল রিপোর্টের জটিলতা তদন্ত বিলম্বের প্রধান কারণ হচ্ছে মেডিকেল ও ডিএনএ রিপোর্ট না পাওয়া। এই রিপোর্ট পেতে অনেক সময় ১২ মাস পর্যন্ত পেরিয়ে যায়। ধর্ষণ মামলায় মেডিকেল রিপোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ—ভুক্তভোগীর শরীরে যৌন নির্যাতনের আলামত, আঘাতের চিহ্ন, ডিএনএ নমুনা এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য যাচাইয়ের জন্য এ রিপোর্ট প্রয়োজন ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা না গেলে আদালতে আবেদন করে সময় বাড়িয়ে নেওয়া হয়। অনেক মামলায় ডিএনএ টেস্ট ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বেশি সময় লেগে যায় । ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোস্তাক রহিম স্বপনের মতে, ধর্ষণ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে তাগাদা দিতে হবে। সময়মতো প্রতিবেদন না পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিবেদন সংগ্রহ করে মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে ।
গণমাধ্যমের ভূমিকা: আলোচনায় এলে দ্রুত বিচার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেসব ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে কিংবা মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়, সেসব ক্ষেত্রে তদন্ত তুলনামূলক দ্রুত এগোয়। কিন্তু আলোচনার বাইরে থাকা অধিকাংশ মামলার তদন্তে গতি পায় না । পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মাত্র চার কার্যদিবসে বিচার শেষ করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রযন্ত্র চাইলে দ্রুত বিচার সম্ভব ।
আইন ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। তদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা, প্রসিকিউশন ও বিচারিক পর্যায়ে কোথায় কী সমস্যা রয়েছে তা চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে সমাধান করতে হবে। অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিচারক, তদন্ত কর্মকর্তা ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও বৃদ্ধি করতে হবে ।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু মেডিকেল রিপোর্টের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ডিএনএ প্রমাণ না মিললেও শরীরে আঘাতের চিহ্ন, পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণ এবং সাক্ষ্য যদি যৌন সহিংসতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেগুলোকেও বিচারিক মূল্যায়নের আওতায় আনা উচিত ।
সাভারের রাহেলা: ২২ বছরের অবিচার ২০০৪ সালের আগস্টে সাভারের গার্মেন্টসকর্মী রাহেলা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। ধর্ষকরা তাকে বাঁচতে দেয়নি। একদল জানোয়ার পালাক্রমে ধর্ষণ করে কুপিয়ে মৃত মনে করে জঙ্গলে ফেলে যায়। দুদিন পর যখন তারা দেখে সে বেঁচে আছে, পেট্রোল ঢেলে তার গায়ের কাপড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারও তিনদিন পর যখন উদ্ধার করা হয় তখন সে সজ্ঞানেই ছিল—যেখানে গলার স্পাইনাল কর্ড কেটে গিয়েছিল। রাহেলা নাম উল্লেখ করে ধর্ষকদের শনাক্ত করলেও পুলিশ তাদের ধরতে পারেনি। আগামী মাসে এই ঘটনার ২২ বছর পূর্তি হবে, ধর্ষকরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
করণীয় ও সমাধানের পথ আইনি সংস্কার · ধর্ষণ মামলার তদন্ত ১৫ দিনে ও বিচার ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান কার্যকর করা · ডিএনএ পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জনবল সংকট নিরসন · মেডিকেল রিপোর্ট দিতে সময়সীমা নির্ধারণ ও বিলম্বের জন্য জরিমানার বিধান সামাজিক সচেতনতা · গণমাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনা প্রচারে আরও সোচ্চার ভূমিকা · ধর্ষকের পক্ষে ওকালতি বর্জনের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা · ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা প্রদানে বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন বিচার ব্যবস্থায় গতিশীলতা · প্রতিটি ধর্ষণ মামলার তদন্ত ও বিচার পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু · মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো · ভুক্তভোগীদের জন্য ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের কার্যক্রম জোরদার উপসংহার বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি সমাজকে অপরাধীদের চারণক্ষেত্রে পরিণত করে।
রাহেলার ২২ বছরের অপেক্ষা, পল্লবীর শিশুর দ্রুত বিচার—এই দুই ঘটনা আমাদের আইনব্যবস্থার দুই চরমকে তুলে ধরে। সমাজের প্রতিটি নাগরিককে সোচ্চার হতে হবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে, এবং প্রশাসনকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আরও গতিশীল ভূমিকা রাখতে হবে। তবেই সমাজে অশুভ শক্তির কাছে শুভ শক্তি পরাজিত হবে না, ন্যায়ের পক্ষে সমাজে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে।
Sent
Compose
Write to Sultana Naznin
