আমরা অনেকেই স্মার্টফোন ব্যবহার করি। সারাদিন ব্যবহারের পর যখন ফোনের চার্জ কমে আসে, তখন আমরা কী করি? আমরা চার্জার খুঁজি, তাই না? কারণ চার্জ ছাড়া এই দামি ফোনটি অচল। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, আমাদের এই শরীর আর মনেরও একটা —চার্জ’ বা —এনার্জি লেভেল’ আছে? একটু খেয়াল করলে আমরা বুঝব যে, কিছু মানুষের সাথে কথা বলার পর আমাদের খুব হালকা লাগে, মনে হয় নতুন উদ্যম পেলাম, মনে হয় জীবনটা খুব সুন্দর। এরাই হলো আমাদের জীবনের —চার্জার’ বা ইতিবাচক মানুষ। আবার কিছু মানুষ আছে, যাদের সাথে মাত্র কয়েক মিনিট কথা বললে মনে হয় মাথার ভেতরটা ভারি হয়ে গেছে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে, আর জীবনের সব আশা যেন নিভে গেছে। এরা হচ্ছেন নেতিবাচক মানুষ।
আজকের এই সাদাকায়নে আমরা জানব, কেন ভালো থাকার জন্যে সফল হওয়ার জন্যে নেতিবাচক মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং কেন ইতিবাচক মানুষের সঙ্গ আমাদের জন্যে অক্সিজেনের মতো প্রয়োজন।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
ইতিবাচক সঙ্গ কেন এত জরুরি? আসুন ইতিহাসের পাতা থেকে একটি ঘটনা জানি।
চীনের অন্যতম দার্শনিক মেনসিয়াস। কনফুসিয়ান দর্শনের বিকাশধারীদের একজন। ছোটবেলায় তিনি বাবাকে হারান। মা একাই বড় করছিলেন তাকে। তারা প্রথমে যে বাড়িতে থাকতেন, তার পাশে ছিল একটি কবরস্থান। মা দেখলেন, ছোট্ট মেনসিয়াস সারাদিন কবর খোঁড়া আর কান্নাকাটির অভিনয় করছে। মা ভাবলেন,‚না, এটা আমার সন্তানের জন্য সঠিক জায়গা নয়।” তিনি বাসা বদলালেন। এবার বাসা নিলেন বাজারের পাশে। কয়েকদিন পর দেখা গেল, মেনসিয়াস ব্যবসায়ীদের মতো চিৎকার করছে, দরদাম করছে আর ঝগড়া করছে। মা এবারও চিন্তিত হলেন। তিনি আবার বাসা বদলালেন। এবার এলেন একটি বিদ্যালয়ের পাশে। এখানে মেনসিয়াস দেখল ছাত্ররা পড়াশোনা করছে, একে অপরকে সম্মান জানাচ্ছে, ভদ্রভাবে কথা বলছে। মেনসিয়াসও তাদের অনুকরণ করতে শুরু করল। মা তখন শান্ত হয়ে বললেন, ‚এটাই আমার সন্তানের জন্যে সঠিক জায়গা।” সেই মেনসিয়াসই বড় হয়ে চীনের দার্শনিক হয়েছিলেন। কারণ ছিল – সঠিক সঙ্গ ও পরিবেশ।
বিজ্ঞান কী বলে?
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বা Neuroscience বলছে, আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরনের কোষ আছে যার নাম —Mirror Neurons‘ বা —আয়না কোষ’। এই কোষগুলোর কাজ হলো —কপি’ করা। আমরা যখন কোনো নেতিবাচক বা হতাশ মানুষের সাথে থাকি, আমাদের মস্তিষ্ক অজান্তেই তার হতাশা কপি করে নেয়। আমাদের শরীরে —কর্টিসল’ বা স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। অন্যদিকে, আমরা যখন কোনো উদ্যমী ও আশাবাদী মানুষের সাথে থাকি, আমাদের মস্তিষ্কে —ডোপামিন’ ও —সেরোটোনিন’ নিঃসৃত হয়। আমরা না চাইলেও তাদের ভালো গুণগুলো আমাদের ভেতরে চলে আসে।
শ্বাশ্বত ধর্মের বাণী:
মহানবী রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন ‚সৎ সঙ্গী হলো আতর বা সুগন্ধি বিক্রেতার মতো। সে তোমাকে সুগন্ধি উপহার দেবে, অথবা তার পাশে থাকলেও তুমি সুঘ্রাণ পাবে। আর অসৎ সঙ্গী হলো কামারের হাপরের মতো, যার স্ফুলিঙ্গ হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, অথবা তুমি দুর্গন্ধ পাবে” (বোখারী)। এর অর্থ হলো, ভালো মানুষ সব সময়ই আপনাকে কিছু না কিছু ভালো দেবে।
বাইবেলের প্রবাদবাক্যে (হিতোপদেশ ১৩:২০) স্পষ্ট বলা হয়েছে: ‚জ্ঞানী লোকের সঙ্গে চলো, জ্ঞানী হও; কিন্তু বোকাদের সঙ্গী হলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।” অর্থাৎ, সঙ্গ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনের গন্তব্য নিজেই নির্ধারণ করি।
গীতাতেও —সৎসঙ্গ’-এর কথা বলা হয়েছে যা মানুষকে মুক্তির পথে রাখে।
বাধা ও বাস্তবতা
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কেন ইতিবাচক মানুষ খুঁজে পাই না? বা পেলেও তাদের সাথে থাকতে পারি না?
আমাদের সমাজের একটি বড় ব্যাধি হলো – পরচর্চা আর অভিযোগ। আমরা যখন বন্ধুদের আড্ডায় বসি বা অফিসের লাঞ্চ টাইমে কলিগদের সাথে বসি, তখন আমাদের আলোচনার বিষয় কী হয়? ‚দেশের অবস্থা খারাপ”, ‚বস খারাপ” এই ধরনের নেতিবাচক আলোচনাই বেশি হয়। যারা এই কথাগুলো বলে, তারা নিজেরা তো আলস্যে ভোগেই, আমাদেরকেও অলস বানিয়ে দেয়। এরা আমার সাফল্যে খুশি হয় না, বরং খুঁত ধরে।
আমরা ভাবি, ‚ওরা আমার ছোটবেলার বন্ধু” বা ‚কলিগ” এদের সাথে না মিশলে কেমন দেখায়! কিন্তু মনে রাখতে হবে নেতিবাচক মানুষ আর মৃত মানুষের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। মৃত মানুষ যেমন নড়াচড়া করতে পারে না, নেতিবাচক মানুষও আমাদের সামনে এগোতে দেয় না।
স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলছে, জীবনে সাফল্যের ৮৫% নির্ভর করে আপনি কাদের সাথে মিশছেন বা আপনার —সোশ্যাল স্কিল’-এর ওপর। বাকি মাত্র ১৫% হলো আপনার ডিগ্রির দক্ষতা।
অথচ আমরা ডিগ্রি অর্জনে বছরের পর বছর সময় দিই, কিন্তু সঠিক মানুষ নির্বাচনে এক মিনিটও সময় দিই না।
করণীয় : সমাধানের পথ
তাহলে এই নেতিবাচকতার চক্র ভেঙে আমরা কীভাবে ইতিবাচক থাকব? এর সমাধান কী?
১. সঠিক সঙ্ঘ বা কমিউনিটি বেছে নিন : একা একা ভালো থাকা খুব কঠিন। স্রোতের বিপরীতে একা সাঁতার কাটলে আমরা ক্লান্ত হয়ে যাব। আর ইতিবাচকতা একটি লাইফস্টাইল। একা একা এর চর্চা ধরে রাখা কঠিন। এজন্যেই মহামানবরা এবং এখনকার সময়ে বিজ্ঞান বলছে, তুমি একটি কমিউনিটির সাথে থাকো। আমরা ভাগ্যবান কোয়ান্টাম নামে একটি ইতিবাচক সঙ্ঘ পেয়েছি। এখানে নেতিবাচক চর্চা নয় বরং ইতিবাচকতা ও কল্যাণশক্তিতে ভরপুর এক আশাবাদী সঙ্ঘ। আমাদের জীবনে যখন নেতিবাচকতা আসে এবং কোনো কারণে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই এই সঙ্ঘের ইতিবাচক মানুষগুলো আমাদের জীবন চলার পথকে সুগম করে।
শ্রদ্ধেয় গুরুজীকে একবার এক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করেছিলেন, ‚গুরুজী, আমি জানি আমার লক্ষ্য কী, কিন্তু বারবার আমি পথ হারিয়ে ফেলি। আমি কী করব?” গুরুজী উত্তর দিয়েছিলেন, ‚সাদাকায়নে নিয়মিত যাবেন। সঙ্ঘ থেকে কখনো দূরে থাকবেন না। যে সঙ্ঘ থেকে দূরে গেছে, সে লক্ষ্য থেকেও দূরে চলে গেছে।”
কোয়ান্টামে প্রতি সপ্তাহে দেশের ২২৫ টি স্থানে সকাল ৯টা – ১০টা একঘণ্টাব্যাপী একটি প্রোগ্রাম পরিচালিত হয় তার নাম সাদাকায়ন। ইতিবাচকতা ও কল্যাণশক্তিতে ভরপুর পুরো সপ্তাহ জুড়ে একজন মানুষ যেন উদ্দীপ্ত থাকতে পারে এজন্যে এ আয়োজন। জীবনধর্মী আলোচনা, মেডিটেশন ও পরস্পরের জন্যে শুভকামনার সমন্বয়ে একটি অনবদ্য প্রোগ্রাম। আসলে কেউ যখন সাদাকায়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হন, তিনি ধাপে ধাপে কল্যাণ থেকে, মেডিটেশন থেকে, নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেন। এজন্যে ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রামে নিয়মিত অংশ নেয়াটা ভালো থাকার জন্যেই খুব বেশি প্রয়োজন।
গবেষণাও বলছে সেই কথা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অন মেন্টাল ইলনেস বলছে, সঙ্ঘে বা কোনো কমিউনিটিতে একাত্ম থাকলে ব্যক্তির মধ্যে লেগে থাকার সামর্থ্য সৃষ্টি হয়। সঙ্ঘের অন্যদের উৎসাহ ও সমমর্মিতা তাকে এগিয়ে যেতে এবং ভালো অভ্যাসগুলো ধরে রাখতে সহযোগিতা করে।
করোনাকালে সারা পৃথিবীতে যে সঙ্ঘটা সবচেয়ে আশাবাদী ও স্ট্রেসমুক্ত ছিল তা হলো কোয়ান্টাম। কারণ আমরা পরস্পরের সাথে সংযুক্ত ছিলাম। এজন্যে কোয়ান্টামে সবসময় সংযুক্ত থাকতে হবে। আমাদের সুস্থ ও ভালো থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।
২. নিয়মিত মেডিটেশন করুন ও অন্যকে মেডিটেশন করতে উদ্বুদ্ধ করুন : কে ইতিবাচক আর কে নেতিবাচক – এটা বুঝব কীভাবে? এটা বোঝার জন্যে দরকার প্রজ্ঞা বা অন্তর্দৃষ্টি। নিয়মিত মেডিটেশন বা কোয়ান্টাম মেথড চর্চা করলে আমাদের প্রজ্ঞা বাড়িয়ে দেয়। মেডিটেশন আমাদের মানসিক শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। তখন নেতিবাচক মানুষের কথা আমাদেরকে আর প্রভাবিত করতে পারবে না। এজন্যে মেডিটেশনকে জীবনের অনুষঙ্গ মনে করুন। নিয়মিত চর্চা করুন।
যারা এখনো আমাদের এই মূল কোর্সে অংশ নেন নি, তাদের জন্য সুসংবাদ। আগামী ১৬, ১৭, ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কোয়ান্টাম মেথড কোর্সের ৪৯৯(W)-তম ব্যাচ। আপনার পরিচিত, প্রিয়জন – যাদের আপনি ভালো রাখতে চান, তাদের এই কোর্সে আমন্ত্রণ জানান। আগামী ফেব্রুয়ারি ও মার্চে কোনো কোর্স থাকবে না। কোয়ান্টাম মেথড কোর্স করে অনেক মানুষ তাদের নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে দূর করে ইতিবাচক হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছেন। আর কোয়ান্টাম মেথড কোর্সে একজন মানুষ চারদিন ইতিবাচক পরিমণ্ডলে থেকে ভালো থাকার সূত্রগুলো সহজেই আয়ত্ত করতে পারেন। তাই পরিচিতদেরকে এই কোর্সে উদ্বুদ্ধ করুন। ভালোর অনুরণন, ইতিবাচকতার অনুরণন ছড়িয়ে দিন চারপাশে।
৩. নিজেকে ও সন্তানকে ভালোকাজে ব্যস্ত রাখুন : একটি কথা আছে, ‚অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।” যখনই হাতে কোনো কাজ থাকে না, তখনই মাথায় নেতিবাচক চিন্তা আসে। কোয়ান্টামের মতো সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের কাজে নিজেকে যুক্ত করুন। অন্যকে সাহায্য করুন। দাতা হোন। যে দেয়, তার মন সবসময় বড় থাকে। এখন সারাদেশে দান সংগ্রহের করসেবা চলছে। এই করসেবায় সময়, শ্রম বিনিয়োগ করুন। বিশেষত শিক্ষার্থীদের কোয়ান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করুন। সন্তান লালনে আমরা কতই না চিন্তা করি। কিন্তু সন্তানকে একটি ভালো সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে উৎসাহিত করি না।
উপসংহার : আজ আমরা ২০২৫ সালের একদম শেষ শুক্রবারে এখানে সমবেত হয়েছি। সামনেই ২০২৬ সাল। নতুন বছর। আসুন, আজ আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিই। আগামী বছর আমরা কাদের সাথে চলব? যারা আমাদের স্বপ্নকে ছোট করে, তাদের সাথে? নাকি যারা আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখায়, তাদের সাথে? আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি – আমরা হবো সুগন্ধি বিক্রেতার মতো। আমাদের সংস্পর্শে এসে যেন মানুষ বাঁচার আনন্দ খুঁজে পায়। আমরা নেতিবাচকতার অন্ধকার দূর করে ইতিবাচকতার আলো ছড়াব।
সবসময় ভালোর সাথে থাকুন। ইতিবাচক মানুষদের সাথে থাকুন। পরম করুণাময় আমাদের সহায় হোন।
