আপেল আঙুর মাল্টা প্রভৃতি বিদেশি ফল তো বটেই, আম কাঁঠাল কলার মতো দেশি ফলের ভিড়েও কালো জাম বড়ই উপেক্ষিত! অথচ এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানলে বুঝতে পারবেন এতদিন জামকে অবজ্ঞা করে কী ভুলটাই না করেছেন!
আসুন জানি যে ১০টি কারণে আপনি কালো জাম খাবেনঃ
১. হার্টের রক্ষাকবচ!
কালো জামকে রাখুন হৃদয়ের মণিকোঠায়, হৃৎপিণ্ড সুস্থ থাকবে!
এর শাঁসকে বেগুনি রঙ দিয়েছে অ্যান্থোসায়ানিন নামক যে এন্টি-অক্সিডেন্ট তা হার্টের ধমনী পরিষ্কার রাখে।
অ্যান্থোসায়ানিন ছাড়াও এতে থাকা অ্যান্থোসায়ানিডিন রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে এবং অক্সিডেশন প্রতিরোধের মাধ্যমে হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে।
এছাড়াও এর পটাশিয়াম উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধের মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।
২. ক্যান্সার প্রতিরোধী
জামের ‘অ্যান্থোসায়ানিন’ কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিকেল থেকে রক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সারও প্রতিরোধ করে।
কালো জামের নির্যাস জরায়ু মুখ ও স্তন ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি রোধ এবং কোষগুলোকে ধ্বংস করতে সক্ষম। Journal of Cancer Research and Therapeutics-এ ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জাম বীজের নির্যাস ৪৯.৫৭% ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম বলে উল্লেখ করা হয়।
৩. ডায়াবেটিস প্রতিরোধক
কালো জামের ভেতরে বসে আছে ডায়াবেটিসের ডাক্তার! শুনে হাসি পাচ্ছে? তাহলে শুনুন জাম বীজের কীর্তি!
জাম খেয়ে ফুঁ করে ফেলে দেন যে বীজ, তার মধ্যেই আছে ‘জাম্বোলিন’ (Jamboline) ও ‘জাম্বোসিন’ (Jambosine) নামে ডায়াবেটিস-রোধী দুটো উপাদান।
এই বীজ ব্লাড সুগার লেভেল ৩০ শতাংশ [A1] কমাতে পারে বলে প্রমাণিত হয়েছে একটি ক্লিনিকেল গবেষণায়
৯৯ জন টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীর ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, রোজ ১০ গ্রাম করে জাম বীজ গুঁড়ো টানা ৩ মাস সেবনে রক্তে শর্করা ৩০% পর্যন্ত কমতে পারে।
৪. হজমক্ষমতা বর্ধক
বদহজম? পেট ফাঁপা? কোষ্ঠকাঠিন্য? জাম খান।
জামে আছে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার, যা লিভারকে সক্রিয় করে এবং হজমক্ষমতা বাড়ায়।
দূর করে কোষ্ঠকাঠিন্যও।
৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও নিরাময়
আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসায় শত বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে কালো জাম।
রোগ নিরাময়ের পাশাপাশি জামে থাকা ভিটামিন বি-১, বি-২, বি-৩, বি-৬ এবং ভিটামিন সি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
৬. ত্বক উজ্জ্বল করে
সৌন্দর্য সচেতনদের জন্যেও কালো জাম সেরা! এর অ্যাস্ট্রিনজেন্ট (astringent) ত্বককে রাখে দাগমুক্ত ও টানটান। আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষগুলোকে রক্ষা করে বুড়িয়ে যাওয়া থেকে। দূর করে ব্রণও।
ভেতর থেকে জ্বলে ওঠা গ্লো— এটাই দেয় কালো জাম। তাই একে ‘ন্যাচারাল গ্লো বুস্টার’ বলাই যায়!
৭. শরীর ঠান্ডা রাখে
আয়ুর্বেদের একটি কথা হলো, যে মৌসুমে যে ফল জন্মায় সেটাতে থাকে সেই মৌসুমের জন্যে স্বস্তি। জামের ক্ষেত্রে কথাটি শতভাগ সত্যি!
প্রচণ্ড গরমে শরীর ঠান্ডা রাখে জাম। কারণ এর ৮৮ শতাংশই পানি। এ ছাড়াও আছে পর্যাপ্ত ফসফরাস ও আয়োডিন যা দেহে এনে দেয় শীতলতার অনুভূতি।
৮. ন্যাচারাল ডিটক্স
ডিটক্সপ্রেমীদের জন্যেও কালো জাম আশীর্বাদ! কারণ এতে থাকা উচ্চমাত্রার অ্যান্থোসায়ানিন ও ফেনলিক যৌগ ফ্রি-র্যাডিক্যাল ধ্বংসের মাধ্যমে দেহকে করে বিষাণুমুক্ত ও ঝরঝরে।
৯. জন্ডিস নিরাময়
গ্রীষ্মে প্রকোপ বাড়ে জন্ডিসের। বাঁচার উপায় কী?
উপায় কালো জাম! কারণ এটি লিভারের কার্যকারিতা বাড়িয়ে জন্ডিস প্রতিরোধ করে এবং জন্ডিস-পরবর্তী সুস্থতায় ‘লিভার টনিক’ হিসেবে কাজ করে।
১০. রক্তশূন্যতা নিরাময়
জাম রক্তশূন্যতার প্রাকৃতিক দাওয়াই। জামে থাকা আয়রন ও ভিটামিন সি রক্ত পরিশোধন করতে সহায়তা করে এবং রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর মাধ্যমে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা দূর করে।
তবে জাম খাওয়ার আগে যেসব সতর্কতা মানা জরুরি
- অনেক উপকারি হলেও মাত্রাতিরিক্ত খাবেন না।
- পাকা জাম বেশিক্ষণ সংরক্ষণ করা যায় না বলে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী এতে ফরমালিন মেশায়। তাই বিষমুক্ত করতে জাম খাওয়ার আগে লবণ পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখুন।
- খালি পেটে জাম খাবেন না।
- জাম খাওয়ার ২ ঘণ্টা আগে-পরে দুধ খাবেন না।
কালো জাম গ্রীষ্মের ফল। সাধারণত মে মাসের শেষ থেকে শুরু হয়ে জুন–জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। এই মৌসুমে যখনই সুযোগ পাবেন, প্রতিদিন ডায়েটে রাখুন কালো জাম। আপনি থাকবেন সুস্থ সতেজ প্রাণবন্ত।
