পাওনা টাকা আদায়ের চক্করে পড়বেন না

পাওনার ধরন কত রকম?

তো আসলে পাওনা টাকা কী? টাকা নানানভাবে পাওনা হতে পারে। এক হচ্ছে, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে পাওনা হতে পারে। আপনি কোথাও কাজ করছেন চুক্তিতে সেখানে পাওনা হতে পারে। আপনি বিনিয়োগ করেছেন সেখানে পাওনা হতে পারে। আবার কাউকে ধার দিয়েছেন সেটাও পাওনা হতে পারে।

তো টাকা যদি পাওনা হয় টাকা আদায় করা এবং আদায় করার চক্করে পড়া দুটো কিন্তু আলাদা জিনিস। ধরুন আপনি কোথাও কাজ করেছেন কাজের বিনিময়ে আপনার পাওনা হয়েছে সেই পাওনা একরকম। সেটা যদি চুক্তিপত্র থাকে, দলিল দস্তাবেজ থাকে, লিখিত পড়িত থাকে সেটা আদায় করাটা সহজ।

কিন্তু যখন আপনি টাকা ধার দিচ্ছেন তখন আপনার টাকাটা অন্যের হাতে চলে যাচ্ছে। তখন এটা আদায় করতে পারবেন না আদায় করার চক্করে পড়বেন এটা নির্ভর করে যাকে দিচ্ছেন তার ওপরে এবং কেন দিচ্ছেন তার ওপরে।

ধারগ্রহীতাদের পাঁচ ক্যাটাগরির রূপরেখা

যেরকম ধরুন কাউকে টাকা ধার দেয়া এটা আমরা পাঁচটা কারণে দিতে পারি। মানে যারা ধার চায় তাদেরকে আপনি পাঁচটা গ্রুপে ভাগ করতে পারেন।

এক হচ্ছে, হঠাৎ প্রয়োজনে খুচরা ধার। ছোটখাটো প্রয়োজন। খাবার কিনতে হবে যানবাহনে ভাড়া দিতে হবে স্কুলের বেতন দিতে হবে এগুলো হচ্ছে ছোটখাটো দৈনন্দিন প্রয়োজনের ধার। হঠাৎ টাকা নাই এটাকে ছোট খুচরা ধার আমরা বলতে পারি।

দুই হচ্ছে, বড় ধরনের কেনাকাটায় ধার যে, একটা জিনিস কিনবে বা একটা কাজ করবেন কেউ পুরো টাকাটা তার হাতে নাই। তার আংশিক আছে আংশিক তাকে ধার করে এই প্রয়োজনটাকে সে পূরণ করতে পারে। কীরকম? নিজের যা আছে এর সাথে দুইজন তিন জনের কাছ থেকে সে টাকা ধার করে তার প্রয়োজনটা পূরণ করতে পারে। তাহলে এটা কয় নম্বর হলো? দুই নম্বর।

তিন নম্বর হচ্ছে, হঠাৎ বিপদে পড়ে ধার যে, দুর্ঘটনা হলো বা দৈবদুর্বিপাক হলো বা কোনো সংকটে পড়ে গেল এক্সিডেন্টে পড়ে গেল বা হঠাৎ টাকা হারিয়ে গেল বা চুরি হলো বা ডাকাতি ছিনতাই হলো। এটা হচ্ছে তিন নম্বর যে, আকস্মিক বিপদে পড়ে তাকে এই টাকাটাকে ধার করতে হলো।

চার নম্বর হচ্ছে, ধারে অভ্যস্ত। এরা বেহিসেবী ব্যয় করে। আয়ের সাথে তাদের ব্যয়ের কোনো হিসাব করে না। বিলাসী পণ্যের পেছনে এরা ব্যয় করে এবং ধার করাটাই নেশা। কারো কাছ থেকে ধার পাওয়াটা এটা তারা একটা ক্রেডিট মনে করে যে, ধার করতে পারল। এরা আবার খুব বাকপটু হয় কথাবার্তায় খুব শার্প। খুব গোছালো আরকি পটিয়ে ফেলে।

পটিয়ে ফেলা বোঝেন তো? মানে কনভিন্স করে ফেলে। এমনভাবে উপস্থাপন করবে আপনার মনে হবে যে আপনি টাকাটা দিয়ে নিজে ধন্য হচ্ছেন এবং এদের কথায় সমবেদনা জাগ্রত হয় তাড়াতাড়ি এবং অনেক সময় দেখা যায় যে, আরেকজন আপনার কাছে টাকা জমা রেখেছে সেই জমা টাকা আপনি তাকে ধার হিসেবে দিয়ে দিচ্ছেন। এরা খুব ধারে নেশাগ্রস্ত এবং ধার করাটাই এদের আনন্দ আরকি। ধার যে করতে পারছে এটাই আনন্দ এটা নিয়ে তাদের কোনো বিকার নাই।

আবার বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে ধার দেয়া যে, আমি অমুক জায়গায় বিনিয়োগ করছি আপনিও বিনিয়োগ করেন। ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে একমাসে আপনি আরো পাঁচ লাখ টাকা পেয়ে যাবেন। ২৫ লাখ টাকা হয়ে যাবে।

তো এটা আসলে ধার না এটা হচ্ছে প্রতারকের মিষ্টি কথা এরা অধিকাংশ সময় প্রতারক। এবং আরেকটা ধার হয় অসংক্রামক ব্যাধি লাইফ স্টাইলের বিভ্রান্তির কারণে এখন যেটা হচ্ছে অসংক্রামক ব্যাধি। যেরকম ক্যান্সার ডায়াবেটিস হৃদরোগ উচ্চ রক্তচাপ কিডনির প্রবলেম ফ্যাটি লিভার। এই রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে নিজের সব বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়ে অন্যের কাছ থেকে ধার করা।

এবং আবার বন্ধুবান্ধবরাও আত্মীয় স্বজনরাও এই ধারটাকে উৎসাহিত করে। আচ্ছা একটু চেষ্টা করো না বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করো। বিদেশে আর দেশে একই চিকিৎসা। তবে বিদেশে গেলে মিষ্টি কথা শোনা যায় আর দেশে মিষ্টি কথাটা কম শোনা যায়। এটা করতে গিয়ে ধারড়ে

ধারদাতার বাস্তবতা : গোপাল ভাঁড়ের শিক্ষা

এবং এই যে অভ্যস্ত ধার যেটাকে আমরা চার নম্বর বলেছিলাম। যে ধার করতে অভ্যস্ত ওরা। এরা বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং এদের যখন আপনি ধার দেবেন কী অবস্থা হবে? এটা নিয়ে গোপাল ভাঁড়ের বিখ্যাত গল্প আছে।

গোপাল মোটামুটি কথাবার্তায় খুব পটু ছিলেন, না… কী ছিলেন? বোকা ছিলেন? পটু হাঁ গুড। তো কথাবার্তা যে পটু তার ধার নিতে কিন্তু অসুবিধা হয় না সে ধার জোগাড় করে ফেলে। একজনের কাছ থেকে ধার না নিলেন এই কালকে দিয়ে দেবেন বলে। সেতো কালকে গেল। কালকে যখন গেল বলে যে আচ্ছা আগামী কাল দেবো আজকে তো টাকা নাই।

এই চক্কর কীভাবে পড়ে? প্রত্যেক দিন বলছে যে আগামী দেবো আগামী দেবো আরকি। এবং সেও যায় ঐ যে যারা কথাবার্তায় পটু হয় তারা কিন্তু অন্যের কথা ককখনো রাগ করে না। আপনি যত কটু কথা বলবেন, সে তার পটু কথা দিয়েই আপনাকে সামাল দেবে।

তো যাচ্ছে একদিন মানে শেষ পর্যন্ত পাওনাদার ধরে বসলো ভালোভাবে তো গোপাল বলল যে আগামীকাল আসো বাসায়, তোমার টাকা পরিশোধের একটা ব্যবস্থা আমি করব।

তো পরদিন সকালবেলা যখন পাওনাদার গোপালের বাসায় গেল। যাওয়ার সাথে সাথে গোপাল আম খেয়ে আমের দুটো আঁটি (আঁটি বোঝেন তো? বিচি) তার থালার মধ্যে রাখলো। তো তাকে দেখেই বলে যে, তুমি ঠিক সময়ে এসেছ। তোমার পাওনা টাকার ব্যবস্থা আমি করছি এখন বলে এই আঁটি দুটো নিয়ে গেল উঠানের কোণায় কী করবে? মাটিতে পোতার জন্যে।

তো সেতো বিস্মিত! বলে যে, আমি এলাম! টাকা পরিশোধের একটা ব্যবস্থা করবে বলে আমাকে এনেছ আর তুমি গেলে আমের বিচি মাটিতে পুততে কারণটা কী? বলে যে, আমি তো তোমার টাকা পরিশোধেরই ব্যবস্থা করছি। কীভাবে? এই যে দেখতে পাচ্ছ না আমের বিচি লাগিয়েছি। এটা থেকে গাছ হবে। গাছ থেকে আম হবে। বছর বছর আম বিক্রি করব এবং বছর বছর তোমার টাকা শোধ হবে।

এবং বাকি যা থাকবে যখন ৪০ বছর পার হবে আমের গাছটা অনেক বড় হবে এটাকে কেটে তক্তা বানিয়ে বাকি সমস্ত টাকা আমি শোধ করে দেবো। তো তাহলে এই টাকা আদায় করতে কত বছর লাগবে তার? ৪০ বছর।

তো বিলাসী জীবনযাপন যারা করে এবং যারা কথায় পটু এইরকম ভাঁড়দের কিন্তু অভাব নাই।

এবং যারা টাকা ধার করে বেড়ায়, দেয়ার এক্সপার্ট তারা খুব মিষ্টি কথা বলে টাকা ধার করে এবং শোধ করার সময়ও খুব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে যাতে আপনি খুব বেশি রাগ করতে না পারেন এবং তারা সবসময় পিছলে যায়। তাদেরকে ধরা খুব মুশকিল।