স্মার্টফোন না জুয়ার মেশিন?

প্রায় দেড় দশক আগের তথ্য বলছিল, একজন মানুষ দিনে গড়ে ১০০-১৫০ বার মোবাইল ফোন চেক করেন। ২০১৬ সালে তা দাঁড়ায় ২,৬১৭ বারে! কিন্তু সর্বশেষ তথ্য বলছে, আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্করা এখন দিনে গড়ে ১৮৬ বার ফোন চেক করেন। এটি ২০২৪ সালের ২০৫ বার থেকে ৯ শতাংশ কম, অর্থাৎ মানুষ আগের চেয়ে ফোন চেক করা কমিয়েছে। কিন্তু কমিয়েছে মানেই কি চিন্তার কারণ নেই? বরং এর পেছনের কারণ ভাবাচ্ছে—কারণ একই জরিপে দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ মানুষ ঘুম থেকে ওঠার ১০ মিনিটের মধ্যেই ফোন হাতে নেন, আর ৭৫ শতাংশ বাড়িতে ফোন রেখে বেরোতে অস্বস্তিবোধ করেন।

গত কয়েক বছরে ‘প্রযুক্তি আসক্তি’ নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। ২০২৫ সালে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই মোবাইল ফোনের উচ্চ আসক্তিতে ভুগছে, আর ২৫ শতাংশ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আসক্ত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ শিশুর এই আসক্তি ধরা পড়েছে।

জেনারেশন জেডের (১৯৯৭-২০১২)-এ যারা জন্মেছে তাদের দৈনিক স্ক্রিন টাইম ২০২৫ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ ঘণ্টা ৪৩ মিনিটে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৪.৮ শতাংশ বেশি।] কানাডার কুইবেকে ২০২৫-২৬ সালে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা দিনে গড়ে ৩ ঘণ্টা ৪১ মিনিট সামাজিক মাধ্যমে কাটান, যা আগের বছরের তুলনায় ৫১ মিনিট বেশি।

ফেসবুকের দৈনিক ব্যবহারকারী এখন ২.১১ বিলিয়ন, আর মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ৩.০৭ বিলিয়ন।

এই তথ্যগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং সিলিকন ভ্যালির গুটিকয় চতুর প্রোগ্রামার ও ডিজাইনার জেনেবুঝেই এসব পণ্য তৈরি করছেন যাতে মানুষ এতে আসক্ত হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তিবিদ ট্রিস্টান হ্যারিস গুগলের প্রাক্তন প্রডাক্ট ম্যানেজার, বর্তমানে ‘সেন্টার ফর হিউম্যান টেকনোলজির’ সহপ্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলছেন, “স্মার্টফোন আর জুয়ার মেশিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।” তিনি বলেন, জুয়ার মেশিনের হাতল ঘোরালে যেমন অনিশ্চয়তা থাকে, তেমনি নোটিফিকেশন আইকন দেখলেও আমরা জানি না ভেতরে আসলে কী আছে। এই অনিশ্চয়তাই আসক্তি তৈরি করে।

ফেসবুকের সাবেক প্রেসিডেন্ট শন পার্কার ২০১৭ সালে স্বীকার করেছিলেন, “আমি ও মার্ক জাকারবার্গ বুঝতাম আমরা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছি। আমরা সচেতনভাবে তা করেছি।” তিনি বলেছিলেন, “ঈশ্বর জানেন এটা আমাদের শিশুদের মস্তিষ্কের কী করছে।” ] নির ইয়ালের ‘Hooke’ বইতে ‘ভ্যারিয়েবল রিওয়ার্ড’ কৌশলের কথা বলা হয়েছে—মানুষ যখন অনিশ্চিত পুরস্কার পায়, তখন তার আকর্ষণ বেড়ে যায়। এই কৌশল ব্যবহার করেই লাইক, কমেন্ট বা ফলোয়ার দেওয়া হয়।

লাল নোটিফিকেশন ব্যাজের গল্পটিও জানা দরকার। ফেসবুক যখন নীল রঙের ব্যাজ ব্যবহার করত, তখন কেউ সেভাবে নোটিফিকেশনে ক্লিক করত না। পরে লাল ব্যাজ ব্যবহার করা হলে ক্লিকের হার ব্যাপক বেড়ে যায়।

মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, লাল রঙ মানুষের মস্তিষ্কে জরুরি অবস্থার সংকেত দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মনোযোগ আকর্ষণ করে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এই সত্য ভালোভাবেই জানে এবং ব্যবহার করে। প্রযুক্তি স্রষ্টারা নিজেরা ব্যবহার করেন না ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, যে সব টেক মোগল আমাদের স্ক্রিন বিক্রি করেন, তারা নিজেরা নিজেদের সন্তানদের এসব থেকে দূরে রাখেন। স্টিভ জবস তাঁর সন্তানদের আইপ্যাড ব্যবহার করতে দেননি।

বিল গেটসের সন্তানরা ১৪ বছর বয়সের আগে স্মার্টফোন পায়নি। ফেসবুকের ‘লাইক’ বোতামের স্রষ্টা লিয়া পার্লম্যান আজ চিত্রকর ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী, আর তাঁর ফেসবুক দেখার জন্য তিনি অন্য কাউকে ভাড়া করেন। জাস্টিন রোজেনস্টাইন তাঁর কম্পিউটারকে রেডিট ব্লক করে রেখেছেন এবং স্ন্যাপচ্যাটকে ‘হেরোইন’ নামে ডাকেন। 48] ২০২৫ সালে কানসাস অ্যাটর্নি জেনারেল স্ন্যাপচ্যাটের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন, যেখানে দাবি করা হয়, ‘স্ন্যাপস্ট্রিকস’–এর মতো ফিচার ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের আসক্তির জন্য তৈরি।

স্ন্যাপচ্যাট নতুন ‘গ্রুপ স্ট্রিকস’ চালু করেছে, যা আসক্তির মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। ইউটিউবের অটোপ্লে ফিচারকে আসক্তির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইউকে’র অফকম। ডোপামিন ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা রামজি ব্রাউন স্পষ্টই বলেছেন, “আমরা অ্যাপ ব্যবহারকারীদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে উদ্দীপ্ত করি যাতে তারা আসক্ত হয়ে থাকে।” লাইক কখন দেখাবে, তা নির্ধারণে বিশেষ অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী প্রত্যাশার চেয়ে বেশি লাইক পেয়ে আরও বেশি অ্যাপ ব্যবহার করতে চায়। বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধ উদ্যোগ ফ্রান্স ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম দফায় একটি আইন পাস করেছে, যাতে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে এবং স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের কথাও বলা হয়েছে।

চীন ইতোমধ্যেই ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য অনলাইন গেম খেলার সময় সপ্তাহে মাত্র ৩ ঘণ্টা নির্ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্য ও শহর সামাজিক মাধ্যম কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। টেক দৈত্যদের মধ্যে গুগলের সাবেক ইঞ্জিনিয়ার ট্রিস্টান হ্যারিস আজ সারা পৃথিবীতে ঘুরে বক্তৃতা দিয়ে মানুষকে সচেতন করছেন। আর রামজি ব্রাউন এখন ‘মিশন কন্ট্রোল এআই’ নামের কোম্পানি চালান, যেখানে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন।

বিষয়টা আসলে মনোযোগ দখলের যুদ্ধ। লাস ভেগাসের জুয়ার কৌশল আর গেমিফিকেশনের মিশেলে আজ ক্যালিফোর্নিয়ার মাত্র কয়েকটি কোম্পানির পঞ্চাশেক তরুণ প্রোগ্রামার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কোটি কোটি মানুষ কীভাবে তাদের সময় কাটাবে। আর এ যুদ্ধে জয়ের একমাত্র পথ হলো সচেতন হওয়া—আমাদের ফোন আসলে কী, আর সেটা আমাদের কাছ থেকে কী কেড়ে নিচ্ছে, তা বোঝা। ফ্রান্সের আইন প্রণেতারা যেমন বুঝেছেন, চীন যেভাবে আইন করে ফেলেছে—আমরাও কি একটু ভেবে দেখি না, এই স্মার্টফোনটি কি সত্যিই আমাদের ‘স্মার্ট’ করছে, না ধীরে ধীরে জুয়ার মেশিনে পরিণত করছে?