বিনয়, কৃতজ্ঞতা ও ত্যাগ: মুমিনের প্রকৃত উচ্চতা

আমরা প্রায়ই ভাবি, ত্যাগ মানে বুঝি হেরে যাওয়া। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে, ত্যাগ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সাধ্যমতো কিছু বিলিয়ে দেওয়া। এটি কখনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি চরিত্রের এক অনন্য শক্তি।

১. ত্যাগ হলো ইমানের পরিচয় আমরা ভাবি ত্যাগ মানে হেরে যাওয়া। কিন্তু কোরআন বলছে, ত্যাগ মানে আল্লাহর জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:

*وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ* “তারা নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও অন্যদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়।” [সূরা হাশর: ৯]
*لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ* “তোমরা কখনোই কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা ভালোবাসো তা থেকে ব্যয় করো।” [সূরা আলে ইমরান: ৯২]

ত্যাগীরা কখনো প্রতিদান চায় না। তাদের বৈশিষ্ট্য কোরআনে এভাবে এসেছে:

*إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا* “আমরা তো তোমাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই খাওয়াই, তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।” [সূরা ইনসান: ৯]

২. অন্যের ত্যাগকে ছোট করা – নিজের বিবেককে ছোট করা যে ব্যক্তি অন্যের অবদানকে অস্বীকার করে, সে মূলত আল্লাহর নেয়ামতকেই অস্বীকার করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

*مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللَّهَ* “যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।” [আবু দাউদ: ৪৮১১, তিরমিজি: ১৯৫৪ – সহিহ]

আর অকৃতজ্ঞতার পরিণাম ভয়াবহ। আল্লাহ বলেন:

*لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ* “যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি বড় কঠিন।” [সূরা ইবরাহিম: ৭]

সময় কারো পক্ষে নয়, সময় সত্যের পক্ষে। আল্লাহ বলেন, প্রতিটি কর্মের হিসাব হবে:

*وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ* “আর তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে বেখবর নন।” [সূরা বাকারা: ৭৪]

৩. অহংকার ক্ষণিকের, বিনয় চিরস্থায়ী যে অন্যের ত্যাগের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে অহংকার করে, সে ভুলে যায় সিঁড়ি ছাড়া সে উপরে উঠতে পারত না। রাসূল (সা.) বলেছেন:

*مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ، وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا، وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ* “দানে সম্পদ কমে না, ক্ষমা করলে আল্লাহ বান্দার সম্মান বাড়িয়ে দেন, আর যে আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন।” [সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮]

অহংকারীর ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি:

*لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ* “যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” [সহিহ মুসলিম: ৯১]

৪. শেষ কথা: তিনটি গুণ যা মানুষকে বড় করে আপনি যে তিনটি কথা বলেছেন, এটাই ইসলামের সারাংশ: বিনয় (Tawazu): নিজেকে ছোট ভাবা। কৃতজ্ঞতা (Shukr): যে উপকার করেছে তার প্রতি এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। বিবেক (Taqwa): এই বিশ্বাস রাখা যে – কর্মফল কখনো পিছু ছাড়ে না।

*فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ • وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ* “অতএব, কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও সে দেখতে পাবে।” [সূরা যিলযাল: ৭-৮]

তাই যে আপনার জন্য ত্যাগ করেছে, তার সিঁড়িকে সম্মান করুন, ভাঙবেন না। কারণ মানুষ ভুলে গেলেও, আল্লাহ ভোলেন না।