এ ইউ দৌলা
আজ অনেক দিন পেরিয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সেই সমাজ যৌতুকের অভিশাপ থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ২০০০ সালের কাছাকাছি সময় থেকে যৌতুকবিরোধী নানা সামাজিক প্রচার ও সচেতনতায় মনে হয়েছিল, নতুন প্রজন্ম যৌতুক গ্রহণ করাকে নিশ্চয়ই অত্যন্ত ঘৃণা করে, যৌতুককে নিশ্চয়ই নির্লজ্জ আচরণ মনে করে। কিন্তু একটি ঘটনা আমাকে হতভম্ভ করে দিল।
গত সপ্তাহে প্রায় ৬৫ বছর বয়সী একজন মানুষ আরেকজন মুরুব্বিকে সাথে নিয়ে দেখা করতে এলেন। তারা কিছু একটা বিচার নিয়ে এসেছেন। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না যে কিসের বিচার, কী সমস্যা, আর আমিই বা তাদেরকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি। আজকাল চারপাশে এত গল্প, এত অদ্ভুত সব ব্যাপার ঘটে যে ইচ্ছা করেই আমি নিজেকে গল্প-গুজব থেকে কিছুটা দূরে রাখি। তাই তাদের সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব কথা শেষ করতে চাইলাম; কফি আর কুকিজ সামনে এগিয়ে দিয়ে জানতে চাইলাম, তারা কেন এসেছেন।
বয়স্ক ভদ্রলোকটি গাইবান্ধা থেকে এসেছেন। তিনি জানালেন, তাঁর নাতনির সঙ্গে পাশের গ্রামের এক যুবকের বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলেটি একটি দপ্তরে চাকরি করে; বিয়ে পাকা, ছেলের মা অনুষ্ঠান করে মেয়েটিকে বিয়ের নাকফুল পরিয়েছেন। ২০ আগস্ট বিয়ের তারিখ; ছেলের বাবা জানিয়েছেন, ৬০ জন বরযাত্রী নিয়ে তারা বিয়েতে আসবেন। মেয়ের পরিবারও সেই অনুযায়ী সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে বরপক্ষ আর বিয়েতে আসেনি। তারা আর কোনো যোগাযোগ করছেন না, ফোন ধরছেন না; তাই তারা এসেছেন, যেন আমি কারো মাধ্যমে এই ছেলেকে খুঁজে বের করি।
ঘটনাটি আমায় বেশ কষ্ট দিল; কেন মানুষেরা এমন অন্যায় করে তা মাথায় এল না। বললাম, ‘হয়তো এটাই ভালো হয়েছে। বিয়ের আগেই যদি বুঝতে পারেন যে এই পরিবার বা এই ছেলে দায়িত্ববান মানুষ নন, তাহলে সেটিই তো ভালো। বিয়ের পর একটি সন্তান হওয়ার পরে যদি বুঝতেন, তখন সমস্যাটি আরও বড় হয়ে যেত। হয়তো এটিই আল্লাহর রহমত।’
আমার কথা শুনে ভদ্রলোক কিছুটা সম্মতি জানালেন, কিন্তু তাঁর মুখের কষ্ট দূর হলো না। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি বললেন, ‘আমরা সামাজিকভাবে ছোট হয়ে গেলাম। অনেক টাকাও ক্ষতি হলো।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কত টাকা ক্ষতি হলো?’
বৃদ্ধ বললেন, প্রায় ২২ লাখ টাকা।
আমি চমকে উঠলাম। ‘২২ লাখ টাকা! এত টাকা খরচ হবে কেন?’
তিনি জানালেন, বিয়ের আয়োজনের পাশাপাশি ছেলেকে যৌতুক হিসেবে দেওয়ার জন্য সাত লাখ টাকা, একটি অ্যাপাচি মোটরসাইকেল, দুই ভরি স্বর্ণ এবং আরও নানা জিনিসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এসবের জন্য পরিবারের কিছু জমিও বিক্রি করতে হয়েছিল।
অভুত লাগল, সত্যিই মানুষ এদেশে কত অদ্ভুত ধরণের অন্যায়ের শিকার হচ্ছে প্রতিদিন! অনেকেই সরকারের সমালোচনা করেন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যর্থতাকে সরকারের দুর্বলতা হিসেবেই তুলে ধরেন তারা; কিন্তু আমরা যে নির্লজ্জ আচরণের সমাজ সৃষ্টি করেছি সেই বিষয়ে কোনো সচেতনতা কিংবা দায় গ্রহণ করার অনুভব আমাদের নেই। যাই হোক, বিভিন্ন স্থানে কথা বলে শেষ পর্যন্ত ছেলেটিকে খুঁজে পেলাম। কথা বলে যতটুকু বুঝলাম, সম্ভবত ছেলেটির পরিবার অন্য কোথাও থেকে আরও বেশি অঙ্কের যৌতুকের প্রস্তাব পেয়েছে এবং সেই কারণেই পূর্বনির্ধারিত বিয়েটি থেকে সরে গেছে।
ব্যাপারটা আমাকে গভীরভাবে বিচলিত করেছে। যে অভিশাপ থেকে সমাজ মুক্ত হয়েছে বলে বিশ্বাস করেছিলাম, সেই বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার কষ্ট মুচড়ে দিল আমায়। পুরুষ মানুষ হিসেবে আরেকজন পুরুষের এমন নির্লজ্জ আচরণে নিজের কাছেই অপমানিত বোধ করছি। জগতের সব নারীর সম্মানে আমার মাথা নত হয়ে আসছিল। একটি মেয়েকে বিয়ে করার বিনিময়ে টাকা, মোটরসাইকেল, স্বর্ণ কিংবা নানা জিনিসপত্রের দাবি করছেন একজন পুরুষ; তিনি কি আসলেই মানুষ নাকি কোনো বন্য? একজন মানুষ কীভাবে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটিকে অর্থ বিনিময়ের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে? একটি পরিবার কীভাবে এমন একটি দাবিকে গ্রহণযোগ্য মনে করতে পারে?
ছেলেটিকে বললাম, ‘তোমরা এমন অন্যায় কেন করলে? বিয়েতে অনিচ্ছুক, এই ব্যাপারটা ক’দিন আগেই জানিয়ে দিতে পারতে।’
ছেলেটি আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘বিয়ে তো করি নাই, তাহলে অন্যায় কীভাবে হলো?’
মনোযোগ হলো জগতে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, তাই আর কথা বাড়ানোর ইচ্ছে হল না, লাইন কেটে দিলাম।
সেই রাতে বারবার ‘হৈমন্তী’র কথা মনে পড়ছিল। হয়তো গল্পটি অনেক দিন ধরে পাঠ্যবইয়ে নেই। অথবা থাকলেও হয়তো আগের মতো শিক্ষক নেই যারা কিশোর অন্তরের কারিগর ছিলেন। কিংবা গল্পটিকে একটু একটু করে পড়ানোর যে কৌশল ছিল সেটা বদলে এখন শুধু মার্কস পাওয়ার জন্য কয়েক লাইনের সারাংশে আটকে গেছে হৈমন্তী। হয়তো প্রযুক্তি যুগের প্রভাবে গল্পের জায়গা নিয়েছে কয়েকটি চুম্বক লাইন, কয়েকটি পরীক্ষামুখী নোট। গল্পের ভেতরে লুকিয়ে রাখা সেই নৈতিক শিক্ষা হয়তো জিপিএ-৫ এর আগ্রাসনে নীরবেই হারিয়ে গেছে।
পরীক্ষা, নম্বর, সেরা স্কুলের তালিকা-এসব প্রতিযোগিতা এখন শিক্ষার মূল লক্ষ্য থেকে জাতিকে কতটা দূরে সরিয়ে দিয়েছে তার গবেষণা কেউ করেছেন কিনা জানি না। কিংবা হয়তো আমরা সত্যিই জানি না যে, কীভাবে শিশুদের শিক্ষা দিতে হয়। শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক প্রযুক্তি এসেছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায়, কিন্তু কেন আমাদের শিশু-কিশোররা তাদের নৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারছে না, কেন কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কেন শিশু কিশোররা অশোভনিয় শব্দ ব্যবহারকে স্বাভাবিক মনে করছে, তা নিয়ে অনেক শ্রম দেয়া দরকার।
লেখক: মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক
