রুটিন ও মেডিটেশনের শক্তি এনে দিয়েছে সাফল্য

রুটিন ও মেডিটেশনের শক্তি এনে দিয়েছে সাফল্য

অংসাইনু মার্মা

মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অন্যদের সাফল্যের গল্প জানা নিজের সাফল্যের জন্যে যথেষ্ট নয়। লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে বাধাবিপত্তি আসবেই। সঠিক গাইডলাইন পেয়েও তা যদি মেনে না চলি তবে লাভ হয় না। আমার জীবন থেকে আমি তা-ই উপলদ্ধি করেছি। আমি জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষা পাশ করেছিলাম বান্দরবানে ডন বস্কো উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। স্কুলটা সব দিক দিয়ে ভালো এবং শিক্ষকেরাও ভালো গাইডলাইন দিতেন।

কিন্তু আমি সেই গাইডলাইন পালন করতাম না। কারণ মা-বাবা কাজের কারণে আমার থেকে অনেক দূরে থাকতেন। আমাকে শাসন করার মতো কেউ না থাকায় ইচ্ছেমতো সময় অপচয় করতাম। ক্লাস শেষ হলে বন্ধুদের সাথে এদিক-সেদিক ঘুরতে যেতাম। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, আমার পড়াশোনার প্রতি ভালবাসা ছিল। আমি সবসময় ক্লাসে প্রথম হতে চেয়েছি। শিক্ষকদের সাথেও ভালো সম্পর্ক রাখতাম, যাতে আমি তাদের কাছ থেকে কিছু শিখতে পারি। হলোও তা-ই। পরীক্ষার আগে কয়েক মাস শিক্ষকদের কথা মেনে চলার চেষ্টা করেছিলাম। দশম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে গেলাম। স্বাভাবিকভাবেই স্কুলের সকল শিক্ষক আমার থেকে ভালো কিছু আশা করা শুরু করলেন। বিশেষ করে তারা এ প্লাস আশা করতেন। কারণ আমাদের স্কুল থেকে এর আগে শুধু একজন বড় বোন এ প্লাস পেয়েছিলেন।

আমার লক্ষ্য সেটাই ছিল অথচ এসএসসি-তে যে সকল বিষয় আমি বুঝতাম এবং পারতাম সেই বিষয়গুলোতে ভালো রেজাল্ট আসে নি। জীবনে একটা ধাক্কা খেলাম। সবার আশা যেখানে এ প্লাস সেখানে পেলাম ৪.৭৮। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে একটাই প্রচলিত কথা, ‘অনার্স’ না হলে ‘ডিগ্রি’। যদি কোনো সিনিয়রদের জিজ্ঞেস করতে যাই, বলে ভালো রেজাল্ট করার দরকার নেই, রেজাল্ট খারাপ হলেও ডিগ্রিতে ভর্তি হতে পারবে। এরকম একটি পরিবেশ থেকেও যে আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারব তা কল্পনাতীত ছিল। আমাকে তখন পথ দেখানোর মতো কেউ ছিল না।

আমি ছোটবেলায় কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে ভর্তি হতে চেয়েছিলাম। দুই দুইবার চেষ্টা করেছিলাম ভর্তি হতে। কিন্তু আমি ভর্তি হতে পারি নি। শেষ পর্যন্ত বাবা এসএসসি পাশ করার পর আমাকে কলেজে ভর্তি করে দিলেন।

আগেই বলেছিলাম, সফল হতে হলে একটা গাইডলাইন থাকা খুবই জরুরি। আমার ক্ষেত্রে সেই গাইডলাইন হচ্ছে কোয়ান্টাম কসমো কলেজ। এখানে যখন ভর্তি হলাম, প্রথমদিনেই অনেক কিছু লক্ষ করলাম, যেগুলো ছিল অজানা এবং জীবনে কখনো কল্পনাও করি নি। কী চমৎকার রুটিন!

পড়ালেখার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা থাকা অনেক ভালো। আমার সাথে হয়েছিল এটা। হোস্টেলে তো সবাইকে একই নিয়ম পালন করতে হয়। একসাথে পড়তে হয়, একসাথে খেতে হয়। আমি দেখলাম কয়েকজন আমার সাথে লড়াই করতে নেমেছে, আমি যদি তিন ঘণ্টা পড়ি সে চার ঘণ্টা পড়ে। আর আমি যদি সকাল ৫টায় ঘুম থেকে উঠি, সেও ঝটপট উঠে যায়। আমিও আমার আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দিলাম। সারাদিনের যে ক্লান্তি, সেটা আমাকে স্পর্শও করতে পারে নি। শুধু একটাই চিন্তা থাকত পড়তে হবে।

কলেজের নিয়মকানুন আমার অগোছালো জীবনটাকে পুরোপুরি সুশৃঙ্খল করতে বাধ্য করল। আমিও সেই নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে পড়লাম। যথেষ্ট বিশ্রাম, পড়াশোনা, খাবার, খেলাধুলা ইত্যাদি নিয়মের মধ্যে আমি দিন অতিক্রম করেছিলাম। যতই দিন যাচ্ছিল ততই শিখছিলাম।

একসময় ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে জানার কৌতূহল সৃষ্টি হলো। এটা কী? কীভাবে চান্স পাব? কীভাবে পড়তে হবে? হঠাৎ একদিন আমাদের কলেজের অধ্যক্ষ ভর্তি পরীক্ষার সহায়ক কিছু বই দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বইগুলো পড়তে এতই ভালো লেগেছিল যে, সেগুলো ছাড়তে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু কলেজের বিভিন্ন পরীক্ষার জন্যে অনেক সময় পড়া বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তারপরও আমি যতটুকু সময় পেয়েছিলাম পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ঐ বইগুলো পড়ার চেষ্টা করতাম। কলেজে থাকার সময় ক্যাম্পাসের শাহীন ভাই, তিনি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, তিনি এ সম্পর্কে আরো ধারণা দিলেন। তখন থেকে আমার একটাই লক্ষ্য ছিল—আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাব।

এরপর আমি যখন কলেজের ২য় বর্ষে উঠলাম, তখন অলি ইসলাম নামে এক বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯৯ তম হয়েছিল। এই খবর শুনে আমিও প্রতিজ্ঞা করলাম—মেধাতালিকায় আমাকেও থাকতে হবে।

আমার একটা রুটিন ছিল এবং আমি প্রতিদিন সেটা অনুসরণ করতাম। অনেক পরিশ্রমের পর আমি স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮৯ তম হলাম। আমার এই সফলতার পেছনে শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করছি।

আর নিয়মিত মেডিটেশনের গুরুত্ব অনেক। আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি, মেডিটেশনের শক্তি আজ আমাকে সাফল্য এনে দিয়েছে। সেই সাথে সকলের দোয়া ও আশীর্বাদ সবসময় আমার সাথে ছিল। যারা আগামীতে ইউনিভার্সিটি ভর্তির প্রস্তুতি নিবে, তারা যদি নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা করে মনছবি ঠিক রাখতে পারে তাহলে সাফল্যকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। আর এর সাথে অবলোকন করতে হবে জীবনের লক্ষ্য—আমি কী হতে চাই!

[ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘সব সম্ভব’ বই থেকে ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *