রুটিন শুরু করুন শৈশব থেকে

একজন বৃদ্ধ মালী, প্রতিদিন খুব যত্ন করে বাগানের সব গাছে পানি দেন। একদিন একটি ছোট ছেলে তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি প্রতিদিন একই সময়ে গাছে পানি দেন কেন? গাছ তো কথা বলতে পারে না। একদিন ভুলে গেলেও ওরা কিছু বলবে না। বৃদ্ধ মালী হেসে বললেন, গাছ কখনো অভিযোগ করে না। তারা শুধু ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা বন্ধ করে দেয়।”

বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। ছেলেটি বড় হয়ে আবার সেই বাগানে এলো। সে দেখল, বাগানটি অসংখ্য ফুলে ফলে ভরে আছে। সেই বৃদ্ধ মালীর সাথে আবার তার দেখা হলো। বৃদ্ধ মালী তখন তাকে বললেন, ‚মাঝে মাঝে পানি দিলে গাছের শুধু পাতা বাড়ে। কিন্তু নিয়মিত পানি দিলে তা শেকড়কে শক্ত করে। আসলে যে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই নিয়ম ও রুটিনের মধ্যে বড় হয়, তাদের শেকড় আরো গভীর আরো মজবুত হয়।

প্রকৃতির দিকে একটু খেয়াল করে দেখুন তো! সূর্য কি কখনো উঠতে দেরি করে? ঋতুগুলো কি কখনো তাদের সময় ভুলে যায়? প্রকৃতি চলে তার এক সুনির্দিষ্ট রুটিন বা ছন্দে। আমরাও এই প্রকৃতিরই অংশ। আমাদের শরীরের ভেতরেও একটা জৈবছন্দ আছে। আমরা যদি প্রকৃতির ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারি, তবে আমাদের জীবনটাও অনেক সুন্দর ও গোছানো হয়ে যায়।

অনেকে ভাবেন, রুটিন মানেই বুঝি ঘড়ির কাঁটা ধরে রোবটের মতো চলা। আসলে তা নয়। রুটিন শুধু সময়সূচি নয়, রুটিন হলো আমাদের জীবনের ছন্দ। কোন কাজটা কখন করব, কতক্ষণ করব এবং এরপর কী করব, কোনটার পর কোন কাজ – তার একটি সুন্দর পরিকল্পনার নামই রুটিন। একজন মানুষ যখন নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলেন, তিনি সারাদিনে অনেক বেশি কাজ করতে পারেন। আর রুটিন না থাকলে দিনশেষে দেখা যায়- সময় তো গেল, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না।

শিশুকে দিতে চাই যত্ন, রাখো তার তালে তাল,
গল্প বলো, শোনাও গান, খেলার ছন্দে মেলো কাল।
পার্কে যাওয়া, মেলামেশা, আত্মীয়-বাড়ি দেখা,
ছোট্ট এ ছন্দেই বাঁধে ভবিষ্যতের রেখা।

আপনি যদি চাও শিশু গড়ে সুন্দর রীতি,
প্রথম নিজে রুটিন মানো, ধরো নিজের প্রীতি।
প্রার্থা-ধ্যান, ব্যায়াম-কাজ নির্দিষ্ট সময়ে করো,
তবেই শিশু শিখবে যেন নিয়মে বাঁচা ধরো।

উপদেশে নয়, অনুকরণে জাগে শিশুর চেতনা,
অগোছালো ঘর কভু দেয় না সুন্দর প্রেরণা।
তাই নিজের ছন্দে বাঁধো নিজের প্রতিদিন,
শিশুর ছন্দ নিজেই হবে সোনার জীবন বিনিময়ে।

কেন এই রুটিন বা জীবনের ছন্দটা একেবারে শৈশব থেকেই শুরু করা প্রয়োজন?

শৈশবে রুটিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

এমআইটি (MIT)-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্কের ৯০% বিকাশ ঘটে জীবনের প্রথম ৫ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ এই সময়ে একটি শিশু যে অভ্যাস গড়ে তোলে, তা সারাজীবন তার সাথে থেকে যায়। শিশুর মন হলো নরম কাদা-মাটির মতো। কাঁচা থাকতে আপনি যে আকার দেবেন, শুকিয়ে গেলে সেটাই স্থায়ী হবে।

১. রুটিন শিশুকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেয় : আসলে শিশুদের কাছে জগতটা খুব বড়। যখন তার জীবনে একটি নির্দিষ্ট ছন্দ থাকে∑ নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, খাওয়া, পড়াশোনা, খেলা এবং ঘুম । শিশুকে তখন বারবার ভাবতে হয় না∑ আমাকে এখন কী করতে হবে? সে সহজেই দিনের ছন্দের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারে। এভাবে রুটিন শিশুর মনে আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলে।

২. নিয়ম পরিবারে দৈনন্দিন বিরোধ কমিয়ে দেয় : মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে অনেক সময় খুব ছোটখাটো বিষয়ে বারবার বিরোধ লাগে। যেমন বাচ্চারা অনেকসময় নানা অজুহাত দেয় যে আর পাঁচ মিনিট খেলতে দাও, বা এখন ঘুমাব না, বা আজ পড়তে ইচ্ছে করছে না ইত্যাদি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই যদি তার মনে রুটিন সেট হয়ে যায়, তাহলে দৈনন্দিন কাজগুলো আর মা-বাবার আদেশ থাকে না, এটা হয়ে যায় জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। আর যখন একটি পরিবারে সবাই একটি ছন্দের মধ্যে জীবনযাপন করে, তখন পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।

৩. রুটিন শিশুকে আরো মেধাবী করে গড়ে তোলে : যখন জীবনের মৌলিক কাঠামো স্থির থাকে, তখন মনকে আর বিশৃঙ্খলা নিয়ে ভাবতে হয় না। ফলে শিশুর মন পায় সৃষ্টিশীলভাবে ভাবার ও শেখার সুযোগ। ইতিহাসের অনেক বড় চিন্তাবিদ, শিল্পী ও গবেষকের জীবনেও দেখা যায়, তাদের জীবনে ছিল একটি দৃঢ় দৈনন্দিন নিয়ম। আমরা যদি শিশুদের নিয়মিত রুটিনের মধ্যে রাখি∑ যেমন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম, খাওয়া বা খেলা তবে তাদের মস্তিষ্কের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।

  • জাপানের দিকে তাকালে আমরা এর চমৎকার প্রমাণ পাই। জাপানে শিশুদের পার্কে নিয়ে গিয়ে পাতা কুড়াতে বলা হয়, নিজের ক্লাসরুম এমনকি টয়লেট পর্যন্ত নিজেদের পরিষ্কার করতে শেখানো হয়। এই ছোট ছোট রুটিন তাদের শেখায় কোনো কাজই ছোট নয়, সব কাজই সম্মানের।
  • সিঙ্গাপুরের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা দিনের শুরুতে ‚Classroom Cleaning Time” পালন করে নিয়মিত। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই— নিজেদের ডেস্ক পরিষ্কার করে। শ্রেণিকক্ষ গুছিয়ে রাখে। ময়লা ডাস্টবিনে ফেলে। সিঙ্গাপুরের পরিবারগুলোতে অনেক বাবা-মা শিশুদের ছোটবেলা থেকেই একটি সহজ নিয়ম শেখান ‚Pack your bag tonight.“ অর্থাৎ, পরদিন স্কুলে যাওয়ার ব্যাগ আগের রাতেই গুছিয়ে রাখা।
  • আর ফিনল্যান্ডে শিশুরা ৭ বছর বয়সে স্কুলে যায়, কিন্তু তার আগে থেকেই খেলার মাধ্যমে তাদের রুটিন শেখানো হয়। ফলাফল? এই তিনটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ পৃথিবীর সেরা।

ঘুম ও মস্তিষ্কের বিকাশ

শৈশবে রুটিনের সবচেয়ে বড় অংশটি হলো ঘুম। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শিশুর মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। নিউরোসায়েন্টিস্ট আদ্রিয়ান রেইন (Adrian Raine) খুব সুন্দর একটি কথা বলেছেন, ‚ঘুম হচ্ছে মস্তিষ্কের হাউজকিপিং সিস্টেম।“ অর্থাৎ ঘুমালে মস্তিষ্ক নিজে নিজেই গুছিয়ে যায়।

নিয়মিত ঘুমের রুটিন আমাদের ‰সার্কাডিয়ান রিদম’ বা দেহঘড়িকে স্থিতিশীল রাখে এবং গ্রোথ হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে। প্রতিদিনের শেখা বিষয় দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি সংরক্ষণে সাহায্য করে। তাই আমাদের শিশুদের নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে জেগে ওঠা এই রুটিন সুনির্দিষ্ট করতে হবে। ঘুমানোর একঘণ্টা আগে এবং ঘুম থেকে ওঠার একঘণ্টা পরেও কোনো স্ক্রিনের সংস্পর্শে না রাখা এই আবহ বজায় রাখতে হবে।

পাশাপাশি, ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিশুদের ‰ডোপামিন সার্কেল’ থেকে বের করে ‰সেরোটোনিন সার্কেল’-এ নিয়ে যেতে হবে। শুধু ‰নেয়ার বা পাওয়ার আনন্দ’ (Reward of taking) এটি হলো ডোপামিন সার্কেল যা মানুষকে অশান্ত করে, আর ‰দেয়ার বা দানের আনন্দ’ (Reward of giving) এটি হলো সেরোটনিন সার্কেল যা মনকে প্রশান্ত করে। এছাড়া শিশুকে অপচয় রোধ করার শিক্ষা শৈশব থেকেই দিতে হবে।

আমাদের ভুল ও বাস্তবতা :

আমরা আমাদের শিশুদের ক্ষেত্রে কী করি? আমরা শৈশবে রুটিনের ব্যাপারে খুব শিথিল থাকি। ভাবি, ‚আহা! বাচ্চা মানুষ, আরেকটু ঘুমাক।” সকালে আমরা নিজেদের কাজের সুবিধার্থে বাচ্চাকে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমাতে দিই, আবার রাতেও তারা আমাদের সাথে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে।

সমস্যাটা শুরু হয় যখন বাচ্চা স্কুলে ভর্তি হয়। হঠাৎ করে তাকে সকাল ৭টায় ঘুম থেকে তোলার যুদ্ধ শুরু হয়। তখন শিশু ও বাবা-মায়ের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। রাতে ঘুমাতে চায় না, সকালে উঠতে চায় না। এরপর স্কুলে গিয়েও সে রুটিন মেলাতে পারে না। এই যে সময়ের কাজ সময়ে না করার অভ্যাস, এর প্রভাব পড়ে তার পরবর্তী জীবনে। সে ট্রেন মিস করে, ক্লাস মিস করে, খারাপ রেজাল্ট করে।

তাই আমাদের শুরু করতে হবে একেবারে শৈশব থেকে। কারণ সেই সময়েই ব্রেনের প্রোগ্রামিং সবচেয়ে ভালো হয়। 

আমাদের করণীয়

অভিভাবক হিসেবে শিশুর শৈশব থেকে রুটিন শুরু করার প্রাথমিক দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে।  আসুন, আমরা কয়েকটি ছোট ছোট পদক্ষেপ গ্রহণ করি:

১. নির্দিষ্ট সময়ে ‘পটি’ ট্রেনিং : ঘুম থেকে জাগার পর বা খাওয়ার পর শিশুদের ‘পটি’ করার বা ‘প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার’ একটা সময় থাকে। আমরা যদি একটু খেয়াল করে সেই নির্দিষ্ট সময়ে তাদের টয়লেটে নিয়ে যাই, তবে খুব দ্রুত তাদের এই রুটিনটি তৈরি হয়ে যায়।

২. ঘুমের রুটিন : শিশুকে রুটিন অনুসরণ করানোর আগে আমাদের নিজেদের রুটিন ঠিক করতে হবে। আপনি নিজে মোবাইল নিয়ে বসে থেকে যদি সন্তানকে বলেন, ‚যাও ঘুমিয়ে পড়ো“ ∑ সে কখনোই ঘুমাবে না। বরং তার ঘুমের পরিবেশ আমাদেরই তৈরি করে দিতে হবে। বাতি নিভিয়ে, ঘর অন্ধকার করে তাকে নিয়ে শুতে হবে।
সকালে উঠে আমরা নিজেরা বিছানা গোছাব, তাকেও ডাকব চাদরটা টেনে দিতে সাহায্য করার জন্যে। তাকে নিয়ে আমরা প্রার্থনা করব, মেডিটেশনে বসব বা হাঁটতে যাব। ঘরের কাজ করার সময় তাকেও ছোট একটি খেলনা পিঁড়ি বা আটার খামির দিয়ে বসিয়ে দেবো। সে কাজের আনন্দ পাবে এবং রুটিন আপনা-আপনিই তৈরি হয়ে যাবে।

৩. শিশুর বিকাশে যা যা প্রয়োজন তারও রুটিন তৈরি করুন : একটি শিশুর সুন্দর বিকাশের জন্যে পরিজনের সংস্পর্শের কোনো বিকল্প নেই। এটিও ঠিক করে নিতে হবে শিশুর সাথে কখন আপনি গল্প করবেন, তাকে গল্প শোনাবেন। খেলাধুলার জন্যে তার কোন সময়টা নির্দিষ্ট থাকবে। আত্মীয়-বন্ধু পরিজনদের সাথে তাকে নিয়ে মাসের কোন দিন দেখা করতে যাবেন। সপ্তাহে কোন দিন তাকে পার্কে নিয়ে যাবেন। অন্য শিশুদের সাথে মেশার সুযোগ করে দেবেন। তাকে নিয়ে দিন বা রাতের কোন সময়ে বই পড়ে শোনাবেন অর্থাৎ সবকিছুরই একটি সুন্দর রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন।

৪. মা-বাবার ব্যক্তিগত রুটিন : শিশুরা উপদেশ শুনে শেখে না, তারা অনুকরণ করে শেখে। আমরা বাবা-মায়েরা যদি রুটিন অনুসরণ না করি, তবে আমাদের জীবন ও পরিবারে বিশৃঙ্খলা থাকবে। আর সেই অবস্থায় শিশুর রুটিন করা বা ধরে রাখা কখনোই সম্ভব হবে না। রুটিন শুধু শিশুদের জন্যই ভালো নয়, এটি অভিভাবক হিসেবেও জীবনকে সহজ করে তোলে। আমাদের নিজেদের প্রার্থনা, মেডিটেশন বা ব্যায়াম – সবকিছু একটি নির্দিষ্ট সময়ে ও নিয়মিত করতে হবে।

উপসংহার

তাই আসুন, আমরা নিজেরা রুটিন মেনে চলি এবং আমাদের সন্তানদের জীবনটাও শৈশব থেকেই সুন্দর রুটিনের ছন্দে গড়ে তুলি। এই ছোটবেলার তৈরি হওয়া অভ্যাসই তাদের ভবিষ্যতের জীবনকে সহজ, স্বাস্থ্যকর ও সফল করে তুলবে।