এ ইউ দৌলা
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর, ২০২৬,
লবণের প্রধান উপাদান হলো সোডিয়াম ক্লোরাইড, যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য বিকল্পহীনভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আপনি ভাতের বদলে আলু বা কলা খেয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন; মাছ-মাংস না হলেও শুধু কিছু ডাল কিংবা বাদাম হলেই চলবে, কিন্তু লবণের কোনো বিকল্প নেই। লবণ আমাদের শরীরে ইলেকট্রোলাইট তৈরি করে শরীরের হাইড্রেশন ও পানির ভারসাম্য ঠিক রাখে। আমাদের ব্রেইন থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যে কমান্ড পাঠানো হয়, তা স্নায়ুর মাধ্যমে আদান-প্রদানের জন্য ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল বইয়ে নেওয়ার জন্য লবণের সোডিয়াম সবচেয়ে বেশি দরকারি। হাত-পা নাড়াচাড়া করা, হাঁটাচলা করা কিংবা হৃৎপিণ্ডের অবিরাম স্পন্দনের জন্য লবণের মিনারেলগুলো মূল চালক হিসেবে কাজ করে। রক্তনালিতে রক্তের চলাচল এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতেও সোডিয়ামের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে, যার ঘাটতিতে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। পাকস্থলীতে খাবার হজমের জন্য হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরিতে লবণের মধ্যে থাকা ক্লোরাইড অত্যন্ত জরুরি। তাই, এত গুরুত্বপূর্ণ এই লবণ শুধু লবণ হলেই চলবে না; হতে হবে বিশুদ্ধ, খাওয়ার উপযোগী ও নিরাপদ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই খাবারের প্লেটের সামান্য লবণটুকু কি কখনো যুদ্ধের অস্ত্র হতে পারে? লবণের সাথে কি কেউ কোনো মারাত্মক রাসায়নিক মিশিয়ে দিতে পারে, যা খেয়ে মানুষ দীর্ঘমেয়াদে ভয়ংকর সব প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হতে পারে? শত্রুরা কি উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাদের জনগণকে অসুস্থ করে দিয়ে তাদের দেশের ক্লিনিকগুলোর ব্যবসা বাড়ানোর কোনো কৌশল করতে পারে?
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেয়, যার বাজারমূল্য মাত্র ২০ পয়সা; কিন্তু এর আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে জাতির জন্য ভয়ংকর স্বাস্থ্যবিপর্যয়। সোডিয়াম ও ক্লোরাইডের পাশাপাশি লবণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আয়োডিন। থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন অবশ্যই দরকার, যা শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ এবং শারীরিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাজারে যে খাদ্যলবণ বিক্রি হচ্ছে, তার মাঝে কি সত্যি নির্দিষ্ট পরিমাণে আয়োডিন আছে?
বিপদ কোথায়?
লবণ মানেই পরিষ্কার সাদা সোডিয়াম ক্লোরাইড বা রান্নার নুন বলে মনে করি। কিন্তু বাস্তবে বাজারে আরও অনেক ধরনের লবণ পাওয়া যায়, যেগুলো শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত হয়। টেক্সটাইল শিল্পে কাপড়ের রং পাকা করার জন্য কম মূল্যের লবণ ব্যবহৃত হয়, কাঁচাচামড়া সংরক্ষণের জন্য চামড়াশিল্পে প্রচুর পরিমাণে লবণ লাগে। তাছাড়া সাবান তৈরি, ডিটারজেন্ট, পেপার ও পাল্প ইন্ডাস্ট্রি এবং বিভিন্ন রাসায়নিক কারখানায় কস্টিক সোডা বা ক্লোরিন উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে কম দামের শিল্পগ্রেডের লবণ ব্যবহার করা হয়।
খাদ্যলবণ আর শিল্পে ব্যবহৃত লবণের মধ্যে গুণগত মান ও রাসায়নিক বিশুদ্ধতার দিক থেকে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। খাদ্যলবণ সরাসরি শরীরে প্রবেশ করায় এটি অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় পরিশোধিত ও নিরাপদ হতে হয়। অন্যদিকে, টেক্সটাইল বা চামড়াশিল্পে ব্যবহৃত লবণগুলোতে বিশুদ্ধতার চেয়ে কম খরচে উৎপাদন করাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফলে শিল্পগ্রেডের লবণে ক্যাডমিয়াম, সিসা, আর্সেনিক বা পারদের মতো বিষাক্ত হেভি মেটাল, অতিরিক্ত সালফেট এবং নানা ধরনের রাসায়নিক থেকে যায়। চামড়া সংরক্ষণ বা কাপড় রং করার কাজের জন্য এই উপাদানগুলো ক্ষতিকর না হলেও, মানুষের শরীরের জন্য এগুলো সরাসরি মারাত্মক বিষ। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পলবণ খাওয়ার ফলে দেহে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
শিল্পলবণে থাকা সিসা শিশুদের স্নায়বিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর; ক্যাডমিয়াম কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে; পারদ স্নায়ুতন্ত্রের জন্য বিষ; আর্সেনিক বিভিন্ন গুরুতর রোগ এবং ক্যানসারের অন্যতম কারণ। তাই বিপদ শুরু হয় তখনই, যখন খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী নয় এমন লবণ খাদ্যলবণ হিসেবে বাজারে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় অথবা খাদ্যলবণ উৎপাদনের মান ঠিক রাখা হয় না।
লবণ প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় মান ঠিক না থাকলে তার মধ্যে ক্ষতিকর কেমিক্যাল থেকে যেতে পারে। যেমন, অপদ্রব্য দূর করার জন্য ব্যবহৃত সোডিয়াম কার্বনেট, কস্টিক সোডা এবং অ্যান্টি-কেকিং এজেন্টের অবশিষ্টাংশ যদি সঠিকভাবে দূর করা না হয়, তবে তা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। আবার উল্টো দিক থেকেও ঝুঁকি থাকে; অতিরিক্ত রিফাইনিংয়ের ফলে লবণের প্রাকৃতিক উপকারী মিনারেলগুলোও সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।
বাংলাদেশে লবণের মান নিয়ন্ত্রণ কতটুকু সম্ভব হচ্ছে?
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৫ লাখ টন লবণের চাহিদা আছে, যার মধ্যে শিল্পলবণ প্রায় ১৫ থেকে ১৭ লাখ টন এবং খাদ্যলবণ প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টন। খাদ্যলবণের খুচরামূল্য প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা হলেও শিল্পলবণের মূল্য মাত্র ১৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যে। তাই কম দামি শিল্পলবণকে খাদ্যলবণ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা রোধ করতে বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো একাধিক সরকারি সংস্থা কাজ করছে। কিন্তু তাদের পথচলায় রয়েছে নানা ধরনের তীব্র সংকট:
বিশাল বাজার ও সীমিত জনবল
দেশের লবণের বাজার অত্যন্ত বিস্তৃত। হাজার হাজার ছোট-বড় ডিলার, পাইকারি বাজার ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকানে নিয়মিত নজরদারি চালানো সম্ভব হয় না। অনেক সময় অনিবন্ধিত বা ছোট আকারের অবৈধ কুটিরশিল্পে গোপনে লবণের প্যাকেটজাতকরণ চলে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বা ভোক্তা অধিকারের জেলা পর্যায়ের জনবল এতটাই সীমিত যে, একটি পুরো জেলা মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।
ল্যাবরেটরি ও প্রযুক্তির ঘাটতি
লবণে থাকা হেভি মেটাল যেমন সিসা, পারদ বা ক্যাডমিয়াম কিংবা রাসায়নিক দূষণ খালি চোখে ধরা যায় না; এর জন্য উন্নত ল্যাব টেস্ট প্রয়োজন। কিন্তু দেশের সব অঞ্চলে তাৎক্ষণিকভাবে নমুনা পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার বা আধুনিক যন্ত্রপাতির তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
পরীক্ষাপ্রক্রিয়ায় ত্রুটি ও দুর্নীতির সুযোগ
বর্তমানে নমুনা পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সাজানো যে, সেখানে দুর্নীতি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। যখন কোনো ইন্ডাস্ট্রি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানো হয় এবং ল্যাব টেস্টের খরচ বাবদ অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জমা দিতে বলা হয়, তখন ব্যবসায়ীদের পক্ষে ল্যাব টেকনিশিয়ান বা রিপোর্ট প্রস্তুতকারীদের প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি হয়।
সরবরাহশৃঙ্খলে নজরদারির অভাব
শিল্পলবণ আমদানির পর বা কারখানা থেকে বের হওয়ার পর তা নির্দিষ্ট গন্তব্যে (যেমন টেক্সটাইল মিলে) পৌঁছাচ্ছে, নাকি মাঝপথেই কোনো অসাধু সিন্ডিকেটের হাতবদল হয়ে প্যাকেটজাত খাদ্যলবণের কারখানায় চলে যাচ্ছে—তার ওপর রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং বা মনিটরিং ব্যবস্থার অভাব রয়েছে।
আইনি দীর্ঘসূত্রতা
প্রভাবশালী অসাধু চক্র নানা উপায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের চোখ ফাঁকি দেয়। আইনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে অপরাধীরা দ্রুত জামিন পেয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যা কার্যকর প্রতিরোধে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
কেন এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন?
একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু সামরিক অস্ত্র বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; সুস্থ মানুষ, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং মেধাবী নাগরিকই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যের মাধ্যমে ক্ষতিকর দূষক মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে তা জনস্বাস্থ্যকে পঙ্গু করে দেয়, যা দেশের অর্থনীতি ও মানবসম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আঘাত হানে। তাই খাদ্যনিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার বিস্তৃত কাঠামোর বাইরে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
আবার মানদণ্ডেও এর গুরুত্ব অসীম। লবণ দূষণের কারণে নানারকম ভয়ংকর রোগে আক্রান্ত মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষায় প্রতিবছর রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ খরচ হয়, প্রচুর অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। তাই যদি শুধুমাত্র লবণের মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আজই ইনভেস্ট করা যায়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সেই সুফল বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে ফিরে আসবে।
শত্রু প্রবেশ ঠেকাতে দেশের সীমান্তে যেমন অস্ত্র হাতে বাহিনী পাহারা দেয়, তেমনি দেশের মানুষের খাবারের প্লেটে কী প্রবেশ করছে—তাও জাতীয় নিরাপত্তার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রশ্ন। একটি বন্দুকের গুলি তাৎক্ষণিক একজনের জীবন কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু রাসায়নিক আগ্রাসন তিলে তিলে কোটি মানুষের জীবনে নীরব ধ্বংস ডেকে আনে। তাই, এটাকে লড়াই হিসেবে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আতঙ্ক বা গুজব নয়; বরং প্রয়োজন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ।
আর তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সমাজের প্রতিটি মানুষের সাথে সাথে বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের অন্তরে আত্মসম্মানবোধকে শক্ত করে জাগিয়ে তোলা, যে আত্মসম্মান তাকে কিছু বেশি মুনাফার জন্য নির্লজ্জ আচরণ করতে অন্তরের গভীর থেকে বাধা দেয়; যে লজ্জা তাকে দেশের অগণিত শিশুর কথা মনে করিয়ে দেয়।
আধুনিক বিশ্বে জাতীয় নিরাপত্তা কেবল ভৌগোলিক সীমানা রক্ষার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের জনগণকে সুস্থ, সক্ষম ও নিরাপদ রাখাটাই প্রকৃত নিরাপত্তা। আর সেই নিরাপত্তা খাবারের প্লেট থেকেই শুরু হওয়া দরকার।
(লেখক ও গবেষক)
