হালদার কার্পজাতীয় মাছের জীবন-রহস্য উদঘাটন

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদীর কার্পজাতীয় মাছের পূর্ণাঙ্গ জিনোম বিন্যাস বা জীবন-রহস্য উদঘাটন হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিসার্চ এন্ড ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞ, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)-এর অধ্যাপক ড.. এএমএএম জুনায়েদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একদল গবেষকের দীর্ঘ গবেষণার ফসল হিসেবে এ জীবন-রহস্য উন্মোচন সম্ভব হয়।

গবেষক দলে ছিলেন নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি গবেষক ড. বাতেন ও চীনের কারিগরি সহায়তা প্রতিষ্ঠান বিজিআই এবং চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় (চবি), সিভাসু ও গ্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষার্থী।

১৬ নভেম্বর ২০২১ সকালে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর উদ্যোগে এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে এসব তথ্য প্রদান করা হয়। এতে হালদা নদীর ৪টি কার্প জাতীয় মাছ রুই, কালিবাউস, কাতলা ও মৃগেলের পাশাপাশি এ নদীর বিশেষ ডলফিন, স্থানীয়ভাবে পরিচিত শুশুকের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকুয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, চার প্রজাতির কার্প মাছ ও বিপন্নপ্রায় শুশুকের জিনোম সিকোয়েন্স তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন-এনসিবিআই’র ডাটা ব্যাংকে জমা দেয়া হলে তারা এর অনুমোদন দিয়েছে। বর্তমান গবেষণায় বেসলাইন ডাটাবেজ সৃষ্টি করা সম্ভবপর হয়েছে।

এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে যেকোনো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জীন নিয়ে গবেষণা সহজতর হবে। অনুষ্ঠানে আরো বলা হয়, ডলফিন এবং কার্পজাতীয় মাছের বংশবৃদ্ধি বা মানসম্মত উৎপাদনের ক্ষেত্রে জিনগত ত্রুটি দূর করার জন্যে এবং এর পাশাপাশি প্রজননের ধরণ, পারস্পরিক অভিযোজনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-গবেষণার মাধ্যমে উদঘাটনের জন্যে জিনোম বিন্যাস সম্পর্কিত ডাটাবেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রান্সজেনেসিস, মিউটেশন বা ক্রোমোসোমাল মেনিপুলেশনের মাধ্যমে মাছের জিনোম বিন্যাস করে হালদা নদীর প্রাকৃতিক কিছু কার্প প্রজাতির জিনোম সিকুয়েন্সিং করতেই বর্তমান গবেষণাটি করা হয়েছে। এর ফলে জিনগত তথ্য সংরক্ষিত হবে, প্রাকৃতিক প্রজাতির মধ্যে অন্তর্জাতীয় সংকরকরণ এড়ানো সম্ভব হবে এবং বিশুদ্ধ প্রজাতি সংরক্ষণ সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো হালদা নদীর শুশুকের জীবন-রহস্য উদঘাটনের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত ভবিষ্যত গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হবে। এই জিনোমিক তথ্যসমূহ সিন্দু ও গঙ্গা নদীর দুই উপপ্রজাতির তুলনামূলক জিনোমিক গবেষণায় সহায়তা করবে এবং একইসাথে মিঠাপানি, লবণাক্ত পানি ও স্থলের স্তন্যপায়ীদের জীনগত পার্থক্যে ভবিষ্যত গবেষণায়ও সাহায্য করবে। ডলফিনের ক্রম-হ্রাসমান সংখ্যা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে হালদা নদীতে অভিযোজনের ক্ষেত্রে দায়ী জীনসমূহ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ জিনোম বিন্যাস তথ্য উপাত্ত প্রদান করবে।

এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট জিনসমূহের গবেষণা উৎসাহিত হবে এবং অদূর ভবিষ্যতে এ গবেষণার ফলাফল এ বিপন্ন প্রজাতিকে সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। অত্যাধুনিক এনজিএস পদ্ধতিতে এসএনপি মার্কার শনাক্তকরণের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও উন্নত প্রজাতির মাছের মান সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

অদূর ভবিষ্যতে জিনোম ডাটাবাসের সংশ্লিষ্ট তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে হালদা নদীর বিভিন্ন প্রজাতির কার্প মাছের ডিম, রেনু, পোনা, প্রাপ্তবয়স্ক মাছের জেনেটিক সনদ প্রদান করার মাধ্যমে তাদের বাণিজ্যিকীকরণ করা সম্ভব হবে। এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হালদা থেকে উচ্চমানের মৎস্য সম্পদ আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

গবেষক দলের অন্যতম প্রধান ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বাসস’কে বলেন, ‘চট্টগ্রামের হালদা নদীর কার্প মাছকে আমরা এতোদিন ওয়াইল্ড ফিশ হিসেবে জেনে এসেছি। এসব মাছ সম্পর্কে আমাদের গবেষণালব্ধ কোনো জ্ঞান ছিল না।

এখন জীবন-রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে আমরা হালদার মাছকে আলাদা করে চিনতে পারবো। ভবিষ্যতে আরো গবেষণায় এ প্রজাতিকে আরো উন্নত প্রজাতিতে উন্নীত করা হয়তো সম্ভব হবে। বিশ্বব্যাপী এর ব্রান্ডিং-এর সুযোগও তৈরি হয়েছে।’

 

সূত্র: বাসস (১৬ নভেম্বর, ২০২১)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *