পেশাজীবনের মহাশত্রু জবস্ট্রেস : মোকাবেলায় যা করবেন

স্ট্রেস- ছোট্ট, কিন্তু বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। পেশাজীবন আর স্ট্রেস যেন সমার্থক হয়ে উঠেছে। যদিও আমরা প্রায়ই চ্যালেঞ্জের সাথে স্ট্রেসকে গুলিয়ে ফেলি।

জবস্ট্রেস কী?
জবস্ট্রেস হচ্ছে একধরণের শারীরিক মানসিক প্রতিক্রিয়া, যা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব এবং কর্মীর সক্ষমতার মধ্যে সংঘাত হলে সৃষ্টি হয়। এখানে কাজটি সম্পন্ন করার জন্যে দরকারী সহযোগিতা না পাবার বিষয়টিও জড়িত।

পেশাগত জীবনে “মহাসত্য লাভ” বা সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর পর সেই স্টেজ ম্যানেজ করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। এখানে কিছু কৌশল দেওয়া হলো যা আপনাকে এই পর্বটি সফলভাবে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে:

১.নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছানোর পর নতুন চ্যালেঞ্জ খুঁজুন, অন্যথায় স্থবিরতা আসতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য ঠিক করুন, যেমন নতুন স্কিল শেখা, মেন্টরশিপ দেওয়া বা ব্যবসা প্রসারিত করা।

২. নম্রতা বজায় রাখুন
সাফল্য কখনই অহংকারের কারণ হওয়া উচিত নয়। নম্রতা আপনাকে শেখার ও বেড়ে উঠার সুযোগ দেবে।
সাফল্যের কৃতিত্ব দল, পরিবার বা মেন্টরদের সাথে শেয়ার করুন।

৩. ভালো কাজে বিনিয়োগ করুন
জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা সম্পদ দিয়ে অন্যদের সাহায্য করুন (মেন্টরশিপ, চ্যারিটি, সোশ্যাল প্রজেক্ট)।
এতে আপনার প্রভাব ও সন্তুষ্টি দুটোই বাড়বে।
কাজকে সমস্যা সমাধানের মানসিকতা নিয়ে দেখুন আপাত কঠিন কোন কাজের দায়িত্ব এলে ভয় না পেয়ে সেটিকে সমস্যা সমাধানের সুযোগ বলে গ্রহণ করুন। সমস্যাটি কী, সম্ভাব্য সমাধান, কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তাভাবনা এবং যে সমাধানটিকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে নির্দিষ্ট করা হলো তার ফলাফল কেমন হতে পারে তা যাচাই বাছাই করা। এসবই চাপের পরিবর্তে কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলবে।

৪. শেখা চালিয়ে যান
সাফল্য মানেই শিক্ষার শেষ নয়। নতুন ট্রেন্ড, টেকনোলজি বা দক্ষতা নিয়ে গবেষণা করুন।
অন্যান্য সফল ব্যক্তিদের কাছ থেকে শিখুন।

৫. সুস্থ ও ব্যালেন্সড লাইফস্টাইল বজায় রাখুন
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন (ব্যায়াম, মেডিটেশন, পর্যাপ্ত ঘুম)।
পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটান—সাফল্য তখনই অর্থবহ যখন তা শেয়ার করা যায়।
সুস্থ জীবনাচার মেনে চলুন এবং সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, ভালো সঙ্গ বজায় রাখলে হাজারো চাপ মনের উপর কুপ্রভাব ফেলতে পারে না।

৬. সমালোচনা ও ফিডব্যাক গ্রহণ করুন
সাফল্যের পরও সমালোচনা আসবে। এটিকে ইতিবাচকভাবে নিন এবং উন্নতির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করুন।
কাছের মানুষদের কাছ থেকে নিয়মিত ফিডব্যাক নিন।

৭. পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকুন
মার্কেট, টেকনোলজি বা চাহিদা পরিবর্তনের সাথে নিজেকে এডাপ্ট করুন। কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে নতুন রিস্ক নিন।

৮. আধ্যাত্মিক বা ফিলোসফিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলুন
সাফল্যের অর্থ কী—এ নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন। এটি আপনাকে ভারসাম্য ও শান্তি দেবে।
মাইন্ডফুলনেস বা সেলফ-রিফ্লেকশন প্র্যাকটিস করুন।
নিয়মিত মেডিটেশন করুন। স্ট্রেস এবং টেনশনের শ্রেষ্ঠ দাওয়াই হলো মেডিটেশন। জবস্ট্রেস যদি হয় ‘বুনো ওল’, মেডিটেশন হবে ‘বাঘা তেঁতুল’! কারণ যে মনে মেডিটেশন আছে সেখানে স্ট্রেস থাকার সুযোগই নেই!

৯. লেগাসি তৈরি করুন
এমন কিছু করুন যা আপনার পরেও অবদান রাখবে (বই লিখুন, প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলুন, জ্ঞান শেয়ার করুন)।

১০. আনন্দ করুন!
কঠোর পরিশ্রমের ফল উপভোগ করতে ভুলবেন না। নিজেকে রিওয়ার্ড দিন এবং জীবনের ছোট সুখগুলো উদযাপন করুন।
আনন্দ নিয়ে কাজ করুন। অধিকাংশ মানুষই কাজ করেন অভ্যাসবশত, বিরক্তি নিয়ে। বিরক্তি সামান্য বিষয়কেও অসহনীয় করে তোলে। তখন খুব সহজ কাজও কঠিন মনে হয়। আর যদি কাজকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করা যায়, সমস্যার অর্ধেক সেখানেই সমাধান হয়ে যায়।

১১. চাপ নয়, ভাবুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন!
পাশ্চাত্যে স্ট্রেস প্রসঙ্গে একটা কথা প্রচলিত আছে- Stress should be a powerful driving force, not an obstacle. কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলে যে-কোনো চাপই ‘পজিটিভ স্ট্রেস’-এ রুপান্তরিত হয়।

১২.মনোযোগ দিন
মনোযোগ বিক্ষিপ্ততার কারণে মানুষ অল্পতেই স্ট্রেস অনুভব করে। কী হয়েছিল, কী হবে, আমি পারবো না- এসব নেতিবাচক চিন্তার চক্র থেকে বের হতে হবে। কাজটি আমি পারব এবং করব- এই ভাবনায় মনকে স্থির করতে হবে। মনোবিদরা একে বলেন ‘মাইন্ডফুলনেস’।
১৩. নীরব ঘাতক
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরী অফ মেডিসিন-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প বয়সে যারা কর্মক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে স্ট্রেস বা চাপের মুখে পড়েন তাদের অবসন্নতা, উদ্বেগ এবং মারাত্মক ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

১৪.জব-স্ট্রেসের শারীরিক ক্ষতিও কম নয়!
প্রকৃতিগতভাবেই যে-কোনো চাপের মুখোমুখি হলে আমাদের শরীর ও স্নায়ু টানটান হয়ে ওঠে। যেটিকে আমরা ‘ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স’ নামি জানি। এসময়টাতে দেহে নিঃসৃত হয় স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসোল’।

সাফল্য একটি যাত্রা, গন্তব্য নয়। এটিকে টেকসই করতে হলে নিয়মিত উন্নতি, আত্ম-সমালোচনা এবং অন্যদের সাহায্য করার মানসিকতা প্রয়োজন।

দায়িত্বের চাহিদা বা চাপ যত বেশি, পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কাও ততখানি, যা কর্মীর উপর স্ট্রেস তৈরি করে। ক্রমাগত এধরণের পরিস্থিতি চলতে থাকলে যে-কোনো পেশাজীবীর ক্ষেত্রে জবস্ট্রেস ক্রনিক আকার ধারণ করতে পারে. যা শরীর, মন দুই’য়ের জন্যেই চরম ক্ষতিকারক।

প্রতিদিন এই অবস্থার মুখোমুখি হলে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াতে সমস্যা তৈরি হয়। কারণ অতিরিক্ত কর্টিসোল নিঃসরণ মানব দেহের অটো-ইমিউন সিস্টেম বা স্বয়ংক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। যা বহু ধরণের অসুস্থতা, হৃদরোগ, এমনকি আলঝেইমার হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

ক্রনিক জবস্ট্রেস মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা, এমনকি আকৃতিতেও পরিবর্তন ঘটায়। যার ফলে ব্যক্তির আচরণ, মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিচার-বিশ্লেষণ এবং সামাজিক যোগাযোগ ক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে অবধারিতভাবে কর্মক্ষেত্রে পারফরম্যান্স খারাপ হয়। যা কর্মীর ক্যারিয়ার তো বটেই, এমনকি পুরো প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে।

তবে সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, ক্রনিক স্ট্রেস আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক-মানসিক সমস্যা বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হতে পারে! অর্থাৎ, বাবা-মায়ের স্ট্রেসের পরিণতি বইতে হতে পারে সন্তানকেও!

আসলে আপনি স্ট্রেসের কাছে হার মানবেন, নাকি স্ট্রেসকেই কুপোকাত করবেন তা নির্ভর করছে আপনার মেন্টাল ফিটনেসের ওপর। আর আধুনিক স্ট্রেসপূর্ণ সময়ে মেন্টাল ফিটনেস বাড়াতে মেডিটেশনকে অগ্রাহ্য করার কোনো উপায় নেই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *