জীবনের সুখ ও বরকত দুটোই নষ্ট হবে। তাই আপনি সঠিক কাজটিই করছেন। যা কিনতে হয় উপার্জন করে কিনবেন, ঋণ করে নয়। ঋণ করে ভোগ্যপণ্য কেনাটা আত্মমর্যাদাবোধের চরম অবমাননা। এতে করে আপনি কনজ্যুমার থেকে ঋণদাসে রূপান্তরিত হবেন। পুঁজিবাদের নিয়মই হচ্ছে এটা। তখন সুদ দিতে গিয়ে গুণতে হবে অতিরিক্ত অনেকগুলো টাকা। দিতে না পারলে গালি অপমান মামলা সবই জুটবে। এই পণ্যঋণ একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় আজাব।
ব্রিটেনের বৃহত্তম সামাজিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চের সমীক্ষা অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে প্রতি বছর এক লাখেরও বেশি মানুষ ঋণের ধকল সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
আমেরিকায় বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ ঋণ। ঋণকে মার্কিন সমাজবিজ্ঞানীরা তাই বলছেন, সম্পর্কের ঘাতক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান ব্যবসা ও অর্থনীতি বিষয়ক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির গবেষণা প্রতিবেদনে (৬ নভেম্বর ২০২৫) দেখা গেছে, ৫৪% মানুষ মনে করেন, বিবাহবিচ্ছেদের একটি বড় কারণ হলো সঙ্গীর ঋণ।
আমেরিকান ব্যাংক্রাপ্টসি ইনস্টিটিউটের মতে, ঋণের কারণে ব্যক্তি তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকেও মুখ লুকিয়ে চলে। ফলে তারা পরিবারের সদস্যসহ আপন মানুষগুলোর কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের দাম্পত্য জীবনে দেখা দিতে পারে হতাশা, বিষণ্নতা ও মানসিক চাপ। এই চাপে সম্পর্কে ঘটতে পারে বিচ্ছেদও। অর্থাৎ ঋণ শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, ঋণ মানুষের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর পেছনে একটি বড় কারণ। ঋণের কারণে দাম্পত্য কলহ থেকে শুরু করে ডিভোর্স পর্যন্ত হতে পারে।
নরওয়ের প্রখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেন-এর লেখা নাটক আ ডলস হাউস বা পুতুলের সংসার। এটি বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত ও মঞ্চস্থ নাটকগুলোর একটি। নারীর স্বাধীন সত্তার গুরুত্বকে সার্থকভাবে তুলে ধরার জন্যে বিখ্যাত হলেও নাটকটির মূল বিষয় ছিল পণ্যাসক্তি এবং ঋণ। এর মূল চরিত্র নোরা কিন্তু ঋণ করেছিল কোনো মৌলিক প্রয়োজনে নয়, বরং মানুষকে দামি উপহার দিয়ে নিজের স্ট্যাটাস বাড়াতে কিংবা বিদেশ ভ্রমণের মতো বিলাসী চাহিদা মেটাতে। একপর্যায়ে সে ঋণশোধের চাপ, স্বামীর মানসিক নির্যাতন ও সম্মানহানির ভয়ে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহত্যা করার কথাও ভাবে। শেষ পর্যন্ত তিলতিল করে গড়া সংসার ফেলে চলে যেতে হলো তাকে। নাট্যকার ইবসেন তাই বলেছেন, ঋণ যে পরিবারে ঢোকে, সে পরিবারের সুখ এবং শান্তি সবই বিনষ্ট হয়ে যায়।
আরেকটি দিক হলো, ঋণ যারা দেয়, তারা মূলত তাদের লাভের জন্যেই দেয়। আপনার স্ত্রী যেমন লোন নিয়ে গাড়ি কিনতে বলছেন, তেমনি ঋণদাতারাও গাড়ির চাবিটা আপনার সামনে ঝুলিয়ে রাখবে। পারলে তৎক্ষণাৎ জামাই আদরে গাড়ির চাবিটা আপনাকে দিয়ে দেবে তারা। কারণ ঋণ দিতে পারাটা তাদের জন্যে লাভজনক। কিন্তু গ্রহীতার ভোগান্তি তো শুরু হয় কিস্তি দিতে গিয়ে এবং কোনো কারণে ঋণশোধ করতে না পারলে।
ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্যই হচ্ছে, বিলাসী পণ্যসামগ্রী বাকিতে কিনতে অভ্যস্ত করা। কারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর জন্যে কাউকে ঋণের দ্বারস্থ হতে হয় না। ঋণ সবসময় দেয়া হয় বিলাসী ভোগ্যপণ্য (স্মার্ট টিভি, স্মার্টফোন, হোম থিয়েটার, এসি, স্মার্ট ডোর সিকিউরিটি সিস্টেম, গেমিং ল্যাপটপ, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি) কেনার জন্যে, যাতে সামর্থ্য না থাকলেও ক্রেডিট কার্ডে তা বাকিতে কেনা যায় এবং কিস্তি শোধ করতে মূল দামের কয়েকগুণ বেশি টাকা দিতে হয়।
সুদ-সর্বস্ব ঋণ এবং কিস্তির এই চক্র সবসময় মানুষের সর্বনাশ করে। কারণ ঋণের চক্রটাই এমন যে, তা কখনো শেষ হতে চায় না। মহাজনী ঋণ হোক বা ক্ষুদ্রঋণ, বন্ধকী ঋণ হোক বা ফ্ল্যাট-গাড়ির ঋণ—কোনো ঋণেই ‘আসল’ সহজে শোধ হতে চায় না; শুধু সুদ গুণে যেতে হয় দীর্ঘদিন ধরে।
কীভাবে? ধরুন, ১ জানুয়ারি আপনি ৫০ হাজার টাকা দামের একটা ওয়াশিং মেশিন কিনলেন, ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট করলেন। ক্রেডিট কার্ডের নিয়ম হচ্ছে, গ্রেস পিরিয়ডের মধ্যে পুরো টাকা শোধ করে দিলে কোনো সুদ নেই। গ্রেস পিরিয়ড ১৫—৪৫ দিন ব্যাংকভেদে ভিন্ন হয়। ধরা যাক, গ্রেস পিরিয়ড ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত। এই পিরিয়ডে এক টাকা বাকি থাকলেও ৩১ জানুয়ারি থেকে প্রতিদিনের সুদ হিসাব হবে।
মানুষের একটা সাধারণ স্বভাব হচ্ছে, না চাইলে আমরা পাওনা টাকা পরিশোধ করতে চাই না। এখানে ক্রেডিট কার্ডের মহাজনরা তো আসল টাকা চাইবেও না, বরং ওরা চায় শুধু সুদ। বলবে যে, টেনশনের কিছু নেই। গ্রেস পিরিয়ডে পুরো টাকা পরিশোধের চাপ নেই। আপনি মিনিমাম এমাউন্ট পে-এবল বা মিনিমাম ডিউ পলিসিতে ধীরে ধীরে দাম পরিশোধ করবেন। মাসে ৫% দিলেই হবে। কোনো স্ট্রেস নেই আপনার! কিন্তু নিখুঁতভাবে হিসাব করলে বুঝবেন এই মিনিমাম পে-এবল অ্যামাউন্ট/ ডিউ পলিসিতে আপনার কাছ থেকে কমসে কম দ্বিগুণ টাকা তারা আদায় করে নেবে!
কীভাবে? তারা বলবে, প্রথম মাসে ৫০ হাজার টাকার ৫% (মিনিমাম), মাত্র ২,৫০০ টাকা জমা দিতে হবে। আপনি ভাবছেন ৫০,০০০/২,৫০০ = ২০ মাসে টাকা শোধ করে ফেলব। এই ২০ মাস তো আমি পুরোদমে ওয়াশিং মেশিনটা ব্যবহার করব। এটা মোটেই এত সরল হিসাব নয়! বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার প্রতিষ্ঠান ভেদে সাধারণত বছরে ১৮%-২৭% পর্যন্ত হয় (APR= Annual Percentage Rate)। আমরা হিসাবের সুবিধার জন্যে ২৪% ধরি! এই সুদ আবার প্রয়োগ হয় দৈনিক হিসাবে! ২৪% বার্ষিক সুদ ধরে হিসাব করলে দৈনিক ০.০৬৫% সুদ! গ্রেস পিরিয়ড মিস করলে পণ্য ক্রয়ের দিন থেকেই সুদ ধরা হবে।
অর্র্থাৎ প্রথমেই ২,৫০০ টাকা থেকে ওই মাসের সুদ কেটে নেবে (৫০,০০০ ঢ ০.০৬৫% ঢ ৩০) = ৯৭৫ টাকা। এই সুদের ওপর সরকারি ট্যাক্স (১৫%) আলাদাভাবে যোগ হবে। ব্যাংকের আরো যা যা চার্জ আছে, বিভিন্ন ব্যাংকের পলিসি অনুযায়ী সেগুলোও কিন্তু এটার মধ্যে থাকবে। আমরা হিসাবের সুবিধার জন্যে শুধু সরকারি ট্যাক্স ধরি। (৯৭৫ + ৯৭৫ ঢ ১৫%) = ১,১২১.২৫ টাকা সুদ কেটে নিলে আসল শোধ হবে (২,৫০০-১,১২১.২৫) = ১৩৭৮.৭৫ টাকা মাত্র।
পরের মাসে (৫০,০০০-১৩৭৮.৭৫) = ৪৮,৬২১.২৫ টাকার ওপর আবার মিনিমাম ৫% কাটবে ২,৪৩১.০৬৩ টাকা। যার মধ্যে ১৫% ভ্যাটসহ সুদ{(৪৮,৬২১.২৫ ঢ ০.০৬৫% ঢ ৩০) = ৯৪৮.১১ + ৯৪৮.১১ ঢ ১৫%} = ১০৯০.৩৩ টাকা।
দ্বিতীয় মাসে আসল কাটবে (২৪৩১.০৬৩-১০৯০.৩৩) = ১,৩৪০.৭৩ টাকা। এভাবে সুদ দিতে দিতে মূল টাকা শোধ করতে আপনার লেগে যাবে ৮/১০ বছর। আর সুদ-সহ এসময় আপনাকে শোধ করতে হবে আসল মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ টাকা!
আরো একটা ফাঁদ হচ্ছে কিস্তি বা EMI। লেখা থাকবে ০% EMI, পরিশোধ করুন ৬/১২ মাসের কিস্তিতে। যেগুলোতে ১২%-১৫% EMI লেখা থাকে, সেগুলোতে আপনি তো বুঝবেন যে, প্রতি কিস্তিতে একটা নির্দিষ্ট পার্সেন্ট সুদ নেবে। যেগুলোতে বলা হয় ০% EMI, সেটা কিন্তু একটা ফাঁদ। কারণ প্রতি কিস্তিতে ব্যাংকের প্রসেসিং ফি আছে, সেই ফি-এর ওপর আবার ট্যাক্স আছে। হিসাব করলে দেখা যাবে ০% EMI-তে নিলে ক্যাশ দিয়ে নেয়ার চেয়ে কয়েক হাজার টাকা বেশি যাচ্ছে। এগুলো আপনি প্রতি কিস্তিতে ভাগে ভাগে দিচ্ছেন। কিন্তু দোকানদার আপনাকে বলবে, ক্যাশে নিলে ডিসকাউন্ট দিয়ে এত টাকা! কার্ড পেমেন্টে এত টাকা! এই ডিসকাউন্ট আসলে ওই সুদটুকুই!
তো কী করবেন? আগে উপার্জন করবেন। পুরো টাকা জমিয়ে তারপর কিনবেন। কিস্তি বা ক্রেডিটে কিনবেন না। মহাজনদের ফাঁদে পা দেবেন না! নিজের জন্যে বা স্ত্রী/ সন্তানের কোনো ইচ্ছাপূরণের জন্যেও কখনো ঋণ করবেন না। কারণ আপনার ঋণের জবাব আপনাকেই দিতে হবে।
রত্নাকর দস্যুর ঘটনা তো জানেন—তিনি ডাকাত থেকে বাল্মীকি হলেন কীভাবে? যখন ঋষি তাকে বললেন, তুমি যে ডাকাতি করছ, তোমার পরিবার কি তোমার এই পাপের ভাগী হবে? রত্নাকর বলে যে, কেন হবে না? আমি তাদের ভরণপোষণের জন্যে এটা করছি। ঋষি বললেন, যাও, তাদেরকে জিজ্ঞেস করে এসো। এর পরের ঘটনা হলো—তাকে বিস্মিত করে দিয়ে তার পরিবার বলল, আমরা কেন তোমার পাপের ভাগী হবো? তোমার পাপ তোমার। আমাদের ভরণপোষণ করা তো তোমার কর্তব্য। তুমি কীভাবে কর্তব্য পালন করবে সেটা তোমার বিষয়।
অর্থাৎ কেউ আপনার পাপের বোঝা বহন করবে না। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘(মহাবিচার দিবসে) কেউ কারো পাপের বোঝা বইবে না। কারো পাপের বোঝা ভারী হলে, সেই বোঝা বহন করার জন্যে কাউকে ডাকলেও সে এগিয়ে আসবে না, এমনকি কোনো নিকটাত্মীয়ও না।’ (সূরা ফাতির : ১৮)
অতএব উপার্জন না করে সুদী ঋণের পাপে জড়াবেন না, পরিবারে অশান্তি ডেকে আনবেন না। যে জীবনে ঋণ এবং কিস্তি ঢুকবে, সেই জীবন নষ্ট হয়ে যায়, যেমন করে ঘুণ একটা কাঠকে নষ্ট করে ফেলে। তবে এটাও খেয়াল রাখবেন যে, স্ত্রীকে কখনো রাগের মাথায় ‘না’ বলতে হয় না।
