ঈদুল আজহা

ঈদুল আযহা বা কুরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যার ভিত্তি পবিত্র কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত । নিচে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এর ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো।

কুরআনে কুরবানির নির্দেশনা পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে কুরবানির নির্দেশ ও তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে: ·

সরাসরি আদেশ: সূরা আল-কাওসারে আল্লাহ বলেন, “অতএব আপনি আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি করুন।” (১০৮:২) । এই আয়াতে নামাজের পাশাপাশি কুরবানিকে একটি প্রধান ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। · উম্মতের জন্য বিধান: সূরা আল-হজে আল্লাহ বলেন, “প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমরা কুরবানির বিধান দিয়েছি, যাতে তারা স্মরণ করে আল্লাহর নাম সেসব চতুষ্পদ জন্তুর উপর যা তিনি তাদের রিজিক হিসেবে দিয়েছেন… সুতরাং তোমরা তাঁ(আল্লাহ)রই কাছে আত্মসমর্পণ কর।” (২২:৩৪) ।

এটি প্রমাণ করে কুরবানি সব যুগের মুমিনদের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। · আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছায় তাকওয়া: সূরা আল-হজের অন্য আয়াতে আল্লাহ পরিষ্কার করে দিয়েছেন: “ওগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, তবে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও আন্তরিকতা)।” (২২:৩৭) । এ আয়াতটি আমাদের শিক্ষা দেয় কুরবানির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আনুগত্য ও আত্মোৎসর্গ, নিছক একটি পশু জবাই করা নয়। · আল্লাহর নিদর্শন: মহান আল্লাহ বলেন, “আর উট ও গরুকে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছি।” (২২:৩৬) । কুরবানির পশু আল্লাহর অনুগত হওয়ার একটি প্রতীকী নিদর্শন।

হাদিসে কুরবানির গুরুত্ব ও নিয়মাবলি হাদিসে কুরবানির গুরুত্ব, পদ্ধতি ও নিয়মাবলি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: · ইব্রাহিম (আঃ)-এর সুন্নাহ: সাহাবাগণ একবার জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, এই কুরবানি কী?” জবাবে তিনি বললেন, “এটি হচ্ছে তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আঃ)-এর সুন্নাহ।” । এই হাদিসটি কুরবানির শিকড়কে হযরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আঃ)-এর ত্যাগের মহিমান্বিত ঘটনার সাথে যুক্ত করে দেয়। · সামর্থ্যবানের জন্য গুরুত্ব: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যার কাছে সামর্থ্য আছে অথচ সে কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।” । এই কঠোর হাদিসটি ইঙ্গিত দেয় যে, যার সামর্থ্য আছে তার জন্য কুরবানি ছেড়ে দেওা উচিত নয়। হানাফি মাজহাবের অনুসারীদের জন্য এটি ওয়াজিব (আবশ্যক) এবং অধিকাংশ আলিমের মতে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ) ।

কুরবানির সময়: রাসূল (সা.) বলেন, “সব তাশরিকের দিন (১০, ১১, ১২ জিলহজ) কুরবানির দিন।” । অর্থাৎ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করা যায়। তবে প্রথম দিন কুরবানি করা সবচেয়ে উত্তম । · পশুর বয়স ও স্বাস্থ্য: পশুর নির্দিষ্ট বয়স হতে হয়; যেমন ছাগল-ভেড়া এক বছর বা ৬ মাস (যে দাঁত পড়ে গেছে), গরু ২ বছর এবং উট ৫ বছর হতে হবে । পশুকে অবশ্যই শারীরিকভাবে সুস্থ, খোঁড়া না হওয়া এবং দুর্বল না হওয়াসহ ত্রুটিমুক্ত হতে হবে । · মাংস বণ্টন ও দান: কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব: এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের জন্য এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য । তবে কুরবানির চামড়া বা কোনো অংশ বিক্রি করা জায়েজ নেই; বরং তা দান করে দেওয়া বা নিজে ব্যবহার করা উত্তম । · ঈদের দিন রোযা রাখা নিষেধ: রাসূল (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা这两个 দিন রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। হযরত ওমর (রা.) বর্ণনা করেন যে রাসূল বলেছেন, “ঈদুল আযহা হচ্ছে সেই দিন যখন তোমরা তোমাদের কুরবানির গোশত খাবে।” ।

শিক্ষা ও তাৎপর্য কুরবানি আমাদেরকে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ)-এর সেই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে পিতার স্নেহ ও সন্তানের প্রাণের মায়া ছেড়ে দিয়ে তারা উভয়েই আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পশু এসে ইসমাইল (আঃ)-এর স্থান নেয় এবং সেটিই কুরবানি হিসেবে গৃহীত হয় ।

আমাদের জন্য এর শিক্ষা হলো, কুরবানি শুধু গোশত বিতরণের উৎসব নয়, বরং এটি আমাদের প্রিয় জিনিস আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করার মানসিকতা তৈরি করে। তাই কুরবানির মাধ্যমে আমরা তাকওয়া অর্জন এবং ইব্রাহিম (আঃ)-এর মতো আল্লাহর অনুগত হওয়ার চেষ্টা করি ।

১. কারো কাছে কোরবানির পশুর দাম জিজ্ঞেস করবেন না। কোরবানির পশুর কোনো দাম হয় না। কারণ কোরবানির পশু কোনো পণ্য নয়। এটি পরম করুণাময়ের নির্দেশ পালনের একটি অনুষঙ্গ মাত্র।

২. ‘আমি … টাকা দিয়ে কোরবানি দিলাম’−নিজেকে জাহির করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। শুধু কোরবানির ক্ষেত্রে নয়, যাকাত/ সদকার পরিমাণ উল্লেখ করা থেকেও বিরত থাকুন।

৩. কোরবানির পশুর দাম ও আকার নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসুন। কেউ পশুর দাম জানতে চাইলে বলুন, ‘আল্লাহ যা সামর্থ্য দিয়েছেন তার মধ্যেই কেনার চেষ্টা করেছি’।

৪. কোরবানির গোশতের ওজন ও পরিমাণ নিয়ে কথা বলবেন না।

৫. আল্লাহর নির্দেশনার সাথে পূর্ণ একাত্মতার জন্যে কোরবানির পশু বাস্তবে দেখে ও ভালোভাবে বুঝে কিনুন । অনলাইনে কিনতে গেলে আপনি ঠকে যেতে পারেন।

৬. কোরবানির পশু কেনার পর বাজারদর যাচাই করে এ নিয়ে অহেতুক আলাপে যাবেন না। ‘দামে ঠকে গেছি’−এ ধরনের আফসোস করবেন না।

৭.কোরবানির গোশত যথাযথভাবে বিতরণ করুন। কোরবানির গোশত সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ফ্রিজ কেনার ভ্রান্ত মানসিকতা পরিহার করুন।

৮. কয়দিন পর কোরবানি করব−এই ভেবে কোরবানির পশুকে অযত্নে-অবহেলায়-অনাহারে রাখবেন না।

৯. কোরবানির পশুর সাথে সেলফি তুলবেন না। এটি একটি ভ্রষ্টাচার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ-সম্পর্কিত প্রচার থেকে পুরোপুরি বিরত থাকুন।

১০. খাদ্য-উৎসবে মেতে উঠবেন না। খাবারে পরিমিতি বজায় রাখুন।

১১. আপনার কোরবানির পশুর রক্ত ও বর্জ্য নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার করুন। এ-ক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষের পরিচ্ছন্নতা বিধি মেনে চলুন ও এ কার্যক্রমে যথাসম্ভব সাহায্য করুন।

১২. ঈদের ছুটিতে পরিবারকে সময় দিন। টিভি ইন্টারনেট ফেসবুক ইউটিউব আসক্তিসহ সব ধরনের ভার্চুয়াল আসক্তি থেকে মুক্ত থাকুন।