শিশুর হাতে প্রযুক্তিপণ্য : নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ দেশে দেশে

আন্তর্জাতিক সংস্থার সুপারিশ ও তথ্য

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্সসহ ৪০ শতাংশ শিক্ষাব্যবস্থা এখন কোনো না কোনোভাবে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ইউনেস্কোর (UNESCO) প্রতিবেদন মোতাবেক, ২০২৩ সালের শেষে বিশ্বের মাত্র ৩০ শতাংশ শিক্ষাব্যবস্থায় এ ধরনের আইন বা নীতি ছিল, যা ২০২৪ সালের মধ্যে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে (৭৯টি শিক্ষাব্যবস্থায়) ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পরামর্শ অনুযায়ী, ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনো ধরনের স্ক্রিন টাইম না করার এবং ২ বছরের শিশুদের দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টার কম স্ক্রিন টাইমে অভ্যস্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সংস্থা ৩-৪ বছর বয়সীদের দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন টাইম না করার পরামর্শ দেয় ।

ইউরোপের অন্যান্য দেশের উদ্যোগ

ইতালি:
গত ২০২৪ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধের পর এবার ইতালি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, উচ্চ মাধ্যমিক (হাই স্কুল) স্তরেও এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, স্মার্টফোনের ক্ষতিকর প্রভাব বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এই কঠোর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে ।

নেদারল্যান্ডস:
দেশটির অনেক স্কুলের ক্লাসরুমে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ডাচ সরকার ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে একটি জাতীয় নির্দেশনা জারি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এতে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বেড়েছে এবং ক্লাসের পরিবেশ শান্ত হয়েছে। শিক্ষকদের মতে, মোবাইল ফোনের অনুপস্থিতিতে ক্লাসরুমের সময় আরও কার্যকরীভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে ।

পর্তুগাল:
২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির ৭৯ শতাংশ স্কুলে এবং পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির ৪১ শতাংশ স্কুলে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নকারী স্কুলগুলোতে বুলিং, শারীরিক সংঘাত কমেছে এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণ বেড়েছে ।

পোল্যান্ড:
২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, শিশুরা ইন্টারনেটের ওপর কতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ।

সুইডেন:
শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অগ্রণী দেশ সুইডেন এবার স্মার্টফোন নিষিদ্ধের পথে হাঁটছে। আগামী শিক্ষাবর্ষের শরৎকাল থেকে দেশটির স্কুলগুলোতে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধের পরিকল্পনা করা হয়েছে ।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো

ব্রাজিল:
প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি আইন স্বাক্ষর করেন, যার ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলোতে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনগণ এই আইন সমর্থন করে ।

চিলি:
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সংসদে পাস হওয়া একটি আইনের মাধ্যমে প্রাক-বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোবাইল ফোন ও স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এই পদক্ষেপকে ‘বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এর মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো ।

ওশেনিয়া অঞ্চলের উদ্যোগ

নিউজিল্যান্ড:
২০২৪ সালের এপ্রিলে স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করে সরকার। এক বছর পর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন ফোন নিষিদ্ধ করায় পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানোর সুযোগ হয়েছে এবং মানসিক স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে ।

পূর্ববর্তী দেশগুলোর হালনাগাত তথ্য

যুক্তরাষ্ট্র:
শেষ খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫টি অঙ্গরাজ্যে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা কার্যকর হয়েছে। নিউইয়র্কসহ ১৮টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন, ডিসিতে স্কুলের ভেতরে পুরো দিন ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে ।

যুক্তরাজ্য (ইংল্যান্ড):
যুক্তরাজ্যের শিক্ষা বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি ঠেকাতে প্রায় সব স্কুলেই মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৯৭ শতাংশ শিশু ১২ বছর বয়সের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার শুরু করে, যা এই সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ।

দক্ষিণ কোরিয়া:
দেশটির পার্লামেন্ট সম্প্রতি একটি বিল পাস করেছে, যার ফলে ২০২৬ সালের মার্চ থেকে স্কুলের ক্লাসরুমে মোবাইল ফোন ও স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে। জরিপে দেখা গেছে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের ৪৩ শতাংশ তাদের মোবাইল ফোনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল ।

শেষ কথা

বিশ্বজুড়ে শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ইউনেস্কোর তথ্য বলছে, মাত্র এক বছরে নিষেধাজ্ঞা প্রবর্তনকারী শিক্ষাব্যবস্থার সংখ্যা বেড়েছে ১৯টি। এই ধারা সম্ভাব্য ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সঠিক বাস্তবায়ন ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতার মাধ্যমে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।